চিকনগুনিয়া আতঙ্কে রাজশাহী ।। সতর্ক থাকার পরামর্শ চিকিৎসকদের

আপডেট: জুলাই ৫, ২০১৭, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজশাহীতে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে চিকনগুনিয়া। ঢাকা থেকে আগত বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে রাজশাহীতেও এডিস মশা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া রাজশাহী অঞ্চলে ভাইরাসজনিত রোগ জ্বর, সর্দি, শরীর ব্যথা বেশি হচ্ছে।
তবে চিকিৎসকরা বলছেন, রাজশাহী অঞ্চলে এই রোগের প্রভাব এখনো দেখা না গেলেও সর্বত্রই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এডিস মশার কামড়ে কোনো মানুষ জ্বর, শরীর ব্যথা অনুভব করলে তিনি চিকনগুনিয়া হয়েছে বলে আতঙ্কিত হচ্ছেন। জ্বর হলেই রোগি মনে করছেন তার চিকনগুনিয়া হয়েছে।
কিন্তু রাজশাহীর চিকিৎসকরা বলছেন, রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত চিকনরগুনিয়া রোগে আক্রান্ত রোগি হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। যারা ভর্তি হয়েছে বা চিকিৎসা নিয়েছেন তারা সবাই বাইরের। বিশেষ করে ঢাকায় চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন এ ধরনের রোগির সংখ্যা আট থেকে দশজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, এডিস মশার কামড়ে মূলত চিকনগুনিয়া রোগ হয়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে একটি এডিস মশা কামড়ানোর পর ওই মশা যদি অন্য আর একজন সুস্থ মানুষকে কামড় দেয় তাহলে সে ব্যক্তিও চিকনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় এই রোগের ব্যাপক প্রাদূর্ভাব দেখা দিয়েছে। কিন্তু রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত রোগির সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনি বিভাগের কয়েকজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে আট থেকে দশজন চিকনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে অনেকেই এখন সুস্থ। ভর্তি রোগির সবগুলোই ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন।
চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত তেমনি এক রোগি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলভি। তিনি ঢাকায় থাকা অবস্থায় চিকনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হন। সেখানে তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। অবশেষে তিনি ঢাকা থেকে রাজশাহীতে আসেন। তার বাড়ি নগরীর চণ্ডিপুর এলাকার ঝাউতলায়। পরে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নেন। এখন তিনি সুস্থ রয়েছেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জানান, গত মে মাসে তার মেয়ে অসুস্থ হয়ে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়। এসময় তিনি ঢাকার রাজাবাজারে রাজশাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে অবস্থান করছিলেন। ১৪ মে তিনি বুঝতে পারেন জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। এসময় তার ডান পায়ের আঙুলে প্রচণ্ড ব্যথা ছিলো। তার এক নিকটাত্মীয় চিকিৎসক তাকে প্যারাসিটামল খাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর তিনি রাজশাহী ফিরে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দেখান। রাজশাহী পপুলার থেকে ঢাকায় তার রক্ত পাঠানো হয়। সেখান থেকে রিপোর্ট পাওয়া যায় তার চিকনগুনিয়া পজিটিভ। এরপর পপুলারের চিকিৎসকদের চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে রামেক হাসপাতালের মেডিসিনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান খান বাদশা বলেন, মূলত এডিস মশার কামড়ে যে রোগের সৃষ্টি হচ্ছে সেটিই চিকনগুনিয়া নামে পরিচিত। এটি ছোঁয়াচে রোগ নয়। তবে চিকনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো মশা যদি কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ায় তাহলে সেই ব্যক্তির শরীরে এই রোগ হবে। এক বেডে ঘুমালে বা পাশাপাশি থাকলে এই রোগ হবে না। তিনি বলেন, রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত এই রোগ দেখা দেয়নি। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যেহেতু রাজশাহীতে অবস্থান করছেন ও চিকিৎসা নিচ্ছেন সেহেতু চিকনগুনিয়া রাজশাহীতে ছড়ানোর আশংকা রয়েছে। সতর্ক না হলে ঢাকার মত রাজশাহীতেও এই চিকনগুনিয়া রোগ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত চিকনগুনিয়া রোগে যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তারা সবাই রাজশাহীর বাইরের। মূলত তারা ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত চেম্বার ছাড়াও রাজশাহীতে আট থেকে দশজন ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। ঢাকা থেকে যেসব যানবাহন বিশেষ করে ট্রেন, বাস, ট্রাক, কার ও মাইক্রোবাসের মাধ্যমে এডিস মশা রাজশাহীতে চলে আসতে পারে। এব্যাপারে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
চিকুনগুনিয়ার উপসর্গের মধ্যে রয়েছে অতি মাত্রায় জ্বর, মাংসপেশিতে ব্যথা ও মাথা ব্যথা। আর এই এডিস মশার আক্রমণ থেকে বাঁচতে বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় পরিস্কার, টবে পানি জমলে তা পরিস্কারসহ পরিবেশ নষ্ট হয় এমন বিষয়ের দিকে নজর রাখর পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া চিকুনগুনিয়ার বিশেষ কোন চিকিৎসা নেই। এ জন্য এ রোগের কারণ এডিস মশার প্রজনন স্থল নির্মূলে সকলকে সচেতন হতে হবে।
প্রসঙ্গত, দেশে চিকুনগুনিয়া রোগি প্রথম শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে রাজশাহীর পবা উপজেলায়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ