চিকিৎসকদের সম্মানের অবনমন ঘটেছে ।। হৃতগৌরব চিকিৎসকেরাই ফেরাতে পারে

আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০১৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

দেশের স্বাস্থ্য খাত ওই অর্থে এখনো সেবামুখি হতে পােির নি। বরং একমাত্র অর্থের মাপকাঠিতেই  রোগির চিকিৎসামান কতটা উন্নত হবে সেটাই নির্ভর করে। অর্থাৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠির চিকিৎসাসেবা নেয়াটা অত্যন্ত বিড়ম্বনার, জটিল ও প্রতারণামূলক। এক ধরনের শোষণ নিষ্পেষণ তো আছেই। রোগিকে চিকিৎসার চেয়ে বরং তার কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে নিঃস্ব করে ফেলার একটা নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা আছে।
রাজশাহীতে এসে এ কথারই সাক্ষ্য দিয়ে গেলেন, স্বনামধন্য চিকিৎসক প্রফেসর ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত।
শনিবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে ‘চিকিৎসক-ডাক্তার সম্পর্ক’ বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি মন্তব্য করেন, চিকিৎসকরা যদি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন নেয়া বন্ধ করেন তাহলে রোগিদের চিকিৎসা ব্যয় ৪০ শতাংশ কমে আসবে। তিনি এটাও বলেছেন, কমিশন বিজনেসের জন্য চিকিৎসকদের সম্মানের অবনমন ঘটেছে। চিকিৎসকদের উচিত হবে কমিশন গ্রহণের মতো ‘ম্যালপ্র্যাকটিস’ থেকে বেরিয়ে আসা। তাহলে চিকিৎসকরা হারানো সম্মান পুনরায় ফিরে পাবেন। নীতি নৈতিকতা মেনে রোগিদের সাথে পেশাদারি সম্পর্ক গড়ে তোলারও আহŸান জানান তিনি।
অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক উগ্রতা যে চিকিৎসকদের মধ্যে আছে তার একটি বিশ্বাসযোগ্য পর্যবেক্ষণ এটি। চিকিৎসার মত মহতী পেশাও যে পেশাদারিত্বের অনুপস্থিতির কারণে নি¤œমুখি ধারণা মানুষের মধ্যে বিরাজিত হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চিকিৎসাসেবা নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা কিংবা কষ্টের কাহিনী নেই এমন লোকের সংখ্যা এ দেশে খুবই কম।
আমরা জানি, দারিদ্রের অর্থ অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবাও। সেবাখাত অবাধ বাণিজ্যিকিকরণের ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দুরহ হয়ে পড়েছে। যেখানে মানুষের দু’বেলা খাদ্য জোটে না তাদের চিকিৎসা ব্যয় মেটানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য ঝুঁকির সাথে কোন আপোষ করা যায় না। ফলে গরীব মানুষ সর্বস্ব বিক্রি করে হলেও চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ছাড়াও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে দুর্নীতি অনিয়মের ফলে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, সর্বস্ব হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশ সরকার, প্রতিবছরের মোট স্বাস্থ্যসেবা চাহিদার শতকরা ২৫-৩০ ভাগ পূরণ করতে পারে। ৭৫-৮০ ভাগ স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাত থেকে পূরণ করা হয়। এটা যত না সরকারের দুবর্ংলতাÑ তার চেয়ে অনেক বেশি দরিদ্র মানুষের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব। চিকিৎসা খাতের অধিকারিকরা মূলত এই দুর্বলতারই অন্যায় সুযোগ গ্রহণ করে থাকেন।
স্বাস্থ্য জনগণের মৌলিক অধিকার এবং সর্বজনিনভাবে স্বীকৃত মানব উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। স্বাস্থ্য সহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়: (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা।” এছাড়া সংবিধানের ১৮ (১) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন এবং জন স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন”।
এ ক্ষেত্রে আমরা মনে করি স্বাস্থ্যসেবায় দরিদ্র মানুষের অভিগম্যতা সৃষ্টি করাÑ যা সরকারের একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। আবার এটা যে সরকার রাতারাতি করতে পারবে তাও নয়Ñ সংবেদশীল চিকিৎসক যারা আছেন তাঁদেরও সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ দরকার। চিকিৎসা সেবা দিতে তাঁদের যে শপথ ও অঙ্গীকার তা-ই পেশাদারিত্বের মূল চালিকা শক্তি হওয়া উচিৎ। এর ব্যত্যয় মানে পেশার মর্যদাকে ক্ষুণœ করা এবং সেটিই হচ্ছে আমাদের দেশে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ