চিন্তাসূত্র সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ : কবি অনীক মাহমুদ

আপডেট: জানুয়ারি ২১, ২০২২, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

এস এম তিতুমীর


শিল্প-সংস্কৃতি যার চর্চাতে লেগে আছে বোধ ও বিদগ্ধ জাগরণের বার্তা। মুক্তচিন্তা আর বিবেকের সজীবতা নিয়ে মানুষ তার সম্মুখের
পথ খুঁজে নেয়। দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, প্রতিবাদ, সংগ্রাম, অধিকার আদায় এসব ভাষাতেই মিশে আছে কবিতা। মননের মন্দ্রিত অভিসম্পাতে আলোড়ন তুলতে পারে বলেই কবিতা অপন হয়ে উঠে সবার কাছে। আর এ স্বাধীনতার কাছে নতজানু নয় বরং শিরদাঁড়া উঁচু করে মানুষ থাকে শিল্প-সংস্কৃতির আশ্রয়ে। যে কোন প্রাপ্তিই সার্থকতা এনে দেয় শ্রমের। তবে যদি তা প্রদানের আড়ম্বরতা থাকে তাহলে তার আনন্দ বেড়ে যায় বহুগুণ। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ওয়েবম্যাগ ‘চিন্তাসূত্র’ এবছর প্রবর্তন করেছে ‘চিন্তাসূত্র সাহিত্য পুরস্কার-২০২১’। প্রবন্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবার এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বিশিষ্ট
কবি-প্রাবন্ধিক-গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. অনীক মাহমুদ। বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তাঁর উজ্জ্বল পদচারণা। ১৯৫৮
সালের ২১শে নভেম্বর রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মচমইল গ্রাম তাঁর জন্ম। বাবা: মরহুম খন্দকার মজিবর রহমান, মা: মানজা বেগম এর তিনি সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। অনীক মাহমুদের পিতৃপ্রদত্ত নাম খন্দকার ফরহাদ হোসেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ১৯৭৭ সাল থেকে তিনি অনীক মাহমুদ এই লেখকনামে লেখালেখি করে আসছেন। ১৯৯৪ সালে লেখকনাম সংক্রান্ত একটি এফিডেভিট তিনি সম্পাদন করেছেন। ১৯৭৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে বাণিজ্য
বিভাগে চতুর্থ স্থান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ১৯৮১ সালে অনার্স ও ১৯৮২ সালের এম.এ. উভয় পরীক্ষাতেই তিনি
প্রথমশ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.ফিল. ও পিএইচ.ডি. ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তাঁর কর্মজীবন  শুরু হয় ১৯৮৫ সালে ‘নিজেরা করি’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থায় ‘কর্মসূচী সংগঠক’ হিসেবে। ১৯৮৮ সালের ১৪ই জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে তিনি যোগদানকরেন। ১৯৯১ সালের ১৪ই জানুয়ারি সহকারী অধ্যাপক, ১৯৯৫ সালের ৫ই অক্টোবর সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০০ সালের ৩০শে মে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ২০০৬ সালের ১৬ই মে অনীক মাহমুদ বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রফেসর পদে উন্নীত হবার আগেই তিনি একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সভাপতি, শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ, কলা অনুষদের ডিন, বাংলা গবেষণা সংসদের সভাপতি প্রভৃতি পদে তিনি নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
কবি অনীক মাহমুদের লেখালেখির হাতেখড়ি হয় স্কুলজীবন থেকে। “পরীক্ষাগার” শীর্ষক একটি পদ্য স্কুলের বার্ষিক নাট্যানুষ্ঠানের আগে মঞ্চে পাঠ করেছিলেন এই দিয়েই কাব্যচর্চা শুরু। প্রথম লেখা ছাপা হয় ১৯৭৭ সালে দৈনিক বার্তায় ‘কিশোর কুঁড়ির মেলা’ নামে পাতায়। লেখাটির নাম ছিল ‘ছড়া’। তারপর থেকে দেশ-বিদেশে বহু পত্র-পত্রিকা প্রথিতযশা জার্নালে কবির গল্প-কবিতা-ছড়া-প্রবন্ধ-ভ্রমণকাহিনী- স্মৃতিকথা-আত্মবচন প্রকাশিত হয়েছে। ‘বাংলা কথাসাহিত্যে শওকত ওসমান’ ও ‘আধুনিক বাংলা কাব্যে সাম্যবাদী চেতনা’ এই নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। এছাড়াও তাঁরি নবিড় তত্ত্বাবধানে অনেক শিক্ষার্থী গবেষণায় উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সাহিত্যের বিচিত্র শাখায় লেখালেখিতে অনীক মাহমুদ বিশেষ ব্যূৎপত্তির পরিচয় দিয়েছেন।
‘প্রেম বড় স্বৈরতন্ত্রী’, আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা, থেকে এই কাব্যগ্রন্থটি বেরিয়েছিল ১৯৯৫ সালে। তারপর ‘একলব্যের ভবিতব্য’
বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা, বের হয় ১৯৯৭ সালে। এর পাঁচ বছর পর আসে ‘এইসব ভয়াবহ আরতি’ পরী প্রকাশন থেকে ২০০৪ সালে এরপর এক এক করে আসে ‘আসন্নবিরহ বিষণ্ণবিদায়’ ‘বৃহন্নলা ছিন্ন করো ছদ্মবেশ’ ‘দীর্ঘদংশন নীলজ্বালা’ ‘সুমিত্রাবন্ধন’ ‘চৈতিচাঁদে রাহুর লেহন’ ‘হৃৎখৈয়ামের রুবাইয়াৎ’ ‘শঙ্খিল সপ্তমিকা’ ‘কান্তবোধি কবিতিকা’ ‘ভদ্রলোকসংহিতা’ ‘বনসাই রূপবন্ধ’ ‘কালিন্দী-আকাশ কংসগহ্বর’ ‘দিনযাপনের গ্লানি’ ‘অসংবৃত অন্ধকার’ ‘নৈঃশব্দ্যের শব্দারতি’ ‘ ইতরস্য পত্রমিদম’ ‘জে জে আইলা তে তে গেলা’ ‘গনিমিঞা-সম্ভাষণ’ ‘দূরান্তের সন্নিধান নৈকট্যের নিগড়’ ‘আপ্তবচন হার্দ্যসন্দীপন’। এছাড়া তিনি ‘নষ্ট জ্যোৎস্নার
ক্যারাভান’ নামে কাবনাট্য প্রকাশ করেন ২০০৬ সালে। তারপর দুটি গানের গ্রন্থ বের হয় প্রথমটি ‘মাধবী রাতের গান ’ পরী প্রকাশন ঢাকা থেকে ২০০৬ সালে আর দ্বিতীয়টি ‘তখনো বৃষ্টি ঝরছিলো’ সুচয়নী পাবলিশার্স, ঢাকা থেকে ২০১৫ সালে। কবি অনীক মাহমুদ ছয়টি শিশুতোষ : ছড়াগ্রন্থ লিখেছেন সেগুলো হলো ‘ভরদুপুরে আমার মাকে’ ‘দুলকি ঘোড়া চাবুক কড়া’ ‘শেয়াল মামার খেয়াল’ ‘নানুর বাড়ি কানুপুরে’ ‘আকাশ গাঙে তারার ভেলা’ ‘জন্মভূমি জননী তুমি’। এসবের সাথে কবি ২০১৮সালে লিখেছেন ‘সন্ধ্যার মেঘমালা’ নামে একটি উপন্যাস। আর ২০১৯ সালে লিখেছেন ‘ফেরারি চাঁদের হাতছানি’ নামে একটি ছোটগল্প।
কবির কিশোরগল্পগুলো হলো- ‘বিড়ালবতী রাজকন্যে’ ‘গাজীমামার গল্পসল্প’ ‘গাজীমামার বৈঠকি গল্প’ ‘গাজীমামার সরসগল্প’
‘গাজীমামার আষাঢ়ে গল্প’ ‘গাজীমামার ঐতিহাসিক গল্প’ ‘গাজীমামার খোশগল্প’ ‘গাজীমামার আদর্শগল্প’ ‘গাজীমামার
নীতিগল্প’ ‘শান্তির দেশ, অনার্য’ ‘নতুন স্বপ্নের আলপনা, ‘গাজীমামার স্বপ্নলোকের গল্প’ ‘গাজীমামার মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ ‘গাজীমামার ক্ষুদে গল্প’ ‘গাজীমামার বিচিত্রগল্প’ ‘গাজীমামার একুশের গল্প’ ‘গাজীমামার ভ্রমণগল্প’ ‘দোলনের একদিন’ ‘প্রজাপতি’ ‘তেপান্তরের গল্প’ ‘তিন ফুলের পাপড়ি’। ১৯৮৯ সালে তিনি লিখেছেন ‘জীবনের কবি ফররুখ আহমদ’ নামে কিশোরজীবনী। আর কিশোর প্রবন্ধগুলো হলো- ‘ছোটদের কবিতা লেখার নিয়ম-কানুন’ (যৌথ) লিখেছেন ‘চেনা-অচেনার মণিবন্ধ’ নামে স্মৃতিকথা।
জীবনীগ্রন্থগুলো হলো- ‘আলোর দ্যুতি আসাদুজ্জামান’ ‘রাজা কৃষ্ণেন্দ্র রায়’ ‘আতাউর রহমান’। প্রবন্ধ-গবেষণাগ্রন্থগুলো- ‘জসীম
উদ্দীনের কাব্যে বিষয়বৈচিত্র্য ও শিল্পরূপ’ ‘বাংলা কথাসাহিত্যে শওকত ওসমান’ ‘আধুনিক বাংলা কাব্যে সাম্যবাদী চেতনা (১৯২০-১৯৪৭)’ ‘আধুনিক সাহিত্য : পরিপ্রেক্ষিত ও প্রতিকৃতি’ ‘সাহিত্যে সাম্যবাদ থেকে মুক্তিযুদ্ধ’ ‘রবীন্দ্র-ছোটগল্পে জীবনবোধ ও
চরিত্রচিত্রণ’ ‘চিরায়ত বাংলা : ভাষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সাহিত্য’ ‘সাহিত্য-সংস্কৃতির রূপ-রূপান্তর’ ‘বাংলার গণজীবন ও যুগবোধের
সাহিত্য’ ‘বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী : তন্নিষ্ঠপাঠ ও শিল্প- সন্দর্শন’ ‘বাংলা উপন্যাসে চিত্তবৈভব : ফিরে দেখা, সময় ’ ‘রবীন্দ্রনাথ : ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ ‘সিদ্ধির শিখর: কবির অভিযাত্রা’ ‘চেতনার রঙ মননের রেখা’। এছাড়া সম্পাদনা করেছেন সাতটি ছোটকাগজ। বহুসংখ্যক সাহিত্য-সংস্কৃতি : সাময়িকপত্রও সম্পাদনা করেছেন। সাহিত্য বিকাশ ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ‘অক্টোপাস’ নামে একটি ফোল্ডার পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তিনি মুদ্রিত পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। এর আগে ১৯৭৮ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাঠকক্ষের বারান্দায় হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। পত্রিকার নাম ছিল ‘অনীক মাহমুদের একক খবরাখবর’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাহ্নপা সাহিত্য চক্রের মুখপত্র রুদ্র’র তিনি প্রধান সম্পাদক ছিলেন। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত কবি ও কবিতা

বিষয়ক অনিয়মিত পত্রিকা ‘পা-ব’ তাঁর সম্পাদনায় বেগবান হয়ে উঠে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের গবেষণা পত্রিকা ‘সাহিত্যিকী’র ৩৮তম সংখ্যাটি ও ‘গবেষণা পত্রিকা’ কলা অনুষদের ভল্যুম ২০, ২০১৪-২০১৫, ভল্যুম ২১, ২০১৫-২০১৬ তিনি খন্দকার ফরহাদ হোসেন নামে সম্পাদনা করেছেন। সাহিত্য সাধনার জন্য তিনি দেশের নানা প্রতিষ্ঠান থেকে চৌদ্দটিরও অধিক সংবর্ধনা, সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত প্রথম শ্রেণির একজন গীতিকার। শব্দ ও শব্দবদ্ধ চিত্রকল্পের মিশেলে কবির অনুভব ধারণ করে কবিতা, পরবর্তীকালে তা-ই হয়ে ওঠে তার সময়যাপন ও
ভাবনালয়ের অনুপম স্বাক্ষর। জীবন ও জগতের নিবিড় পর্যবেক্ষণ যেমন কবির অন্বিষ্ট, ঠিক তারই সাথে বোধ ও ভাবের সারাৎসারও হয়ে যায় কবিতা। এভাবেই যুগে যুগে কবিতা হয়ে গভীর অন্তর্লোকের চেতনা-সঙ্গী। জীবন ও সমাজ-সাহিত্যের একাগ্র সাধনায় নিমজ্জিত অন্তঃপ্রাণ সত্তা তাঁর অবলোকন আরশিতে এঁটে নেন চলমান চিত্র। দিন যতোই এগিয়ে যায় সে চিত্র ততোই পরিণত হতে থাকে। কবি অনীক মাহমুদ কাব্যসত্তার অপূর্ব সম্মিলনে চিত্রায়িত করে চলেছেন প্রাণের নানা অনুষঙ্গ, অপ্রাণের লুকানো বর্ণিল প্রতিচ্ছবি। বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক সৃজনসত্তার অধিকারী কাব্য চেনায় সুবিন্যস্ত হয়ে আছেন বহুস্তরে। চলমান নানবিধ মিডিয়ার দৌরাত্ম ও আনুকল্য এসব এড়িয়েও কবির আপন যোগ্যতা ও কর্মবলে দীপ্যমান অনুধ্যান সতত সমৃদ্ধ করে চলেছে সাহিত্য জগৎ। চিন্তার বামনতা আর বৈকল্যের মলিনতা ভরা চারপাশের দীর্ণতাকে পদদলিত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রয়াস লেখক জীবনকে আলোকিত করে। যারা কট্টর সমালোচনা করে তারাও নত হয় সত্য বচনের কাছে। মানবিক মূল্যবোধ নীতিনৈতিকতার চর্চা ও শঠতার আগ্রাসী আক্রোশ এসবের অভ্যন্তরে ঝেঁকে কবি তার  ন্তরগত
আরোকটুকু তুলে আনেন। কবি অনীক মাহমুদ সীমার মাঝে থেকেই অসীমের আরতি করেছেন। আরাধনায় এনেছেন জীবনযাপনের বহু ছবি, যা হয়তো অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। আমরা তা দেখেও দেখি না, এমন ছবি স্পষ্ট হয়েছে লেখনিতে। আলিঙ্গন করেছেন চিন্তার কালজয়ী আবাহনকে, অনেক চিন্তায় এঁকেছেন আগামীর রূপরেখা। আবার অনেক লেখায় বর্তমান এমনভাবে বিধৃত যে তাও যেন চিরনতুন আর সম্মুখের ছবি। ‘চিন্তাসূত্রে’র এ সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তি
কবিকে অনেক অনেক প্রাণিত করবে। সতত সাহিত্যাঙ্গন থাকবে
¯্রােতময়।