চিন-তালিবান-পাকিস্তান ঐক্য দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিবে?

আপডেট: জুলাই ৩০, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

উইঘুর মুসলিমদের ওপর চিনের নিপীড়ন সম্পর্কে প্রতিপক্ষ দেশগুলো হইচই করলেও অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রই বিষয়টি নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তো বটেই কট্টর পাকিস্তানেও উইঘুরদের ব্যাপারে ন্যূনতম সহানুভূতি দেখায় নি। ভূ-রাজনীতি এমন জটিল মেরুকরণে নিজ নিজ দেশের ফায়দা হাসিলের ব্যাপারটিই এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে। মুসলিম সহানুভুতি এখন আর কোনো কাজে আসছে না।
বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর দ্বিধাবিভক্তি এবং স্বার্থের টানাপোড়েন এতোই ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী যে, তারা চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণরূপে জলাঞ্জলি দিয়ে বসেছে।
পাকিস্তান জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের প্রজনন ক্ষেত্র। দেশটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তকমা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে নি বা পাকিস্তান সেটা চায়ও নি। ফলে পাকিস্তান অনেকটাই অকার্যকর দেশরূপে পরিচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশটিকে এমন এক সঙ্কটের মধ্যে নিয়ে গেছে যে, দেশটির রাষ্ট্রযন্ত্র ইচ্ছে করলেও সহসাই সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। ফলে দেশটি অভ্যন্তরীণ কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে যেকোনোই সিদ্ধান্ত নেয় না কেন তা উগ্র ইসলামি জঙ্গিদের পক্ষেই যায়। তারা ইসলাম ধর্মের জন্য প্রাণাপাত করলেও উইঘুর সম্প্রদায়ের ওপর চিনের নির্যাতন নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। কেননা পাকিস্তান চিনের কাছে এতো বেশি পরিমাণ দায়বদ্ধ যে, প্রতিবাদ করার মত শক্তি ও অন্য নির্ভরতা তাদের নেই। এমনকি যে জঙ্গিবাদ পাকিস্তানকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করছে সেই তালিবানদেরকেই তারা আফগানিস্তানে ধমীয় উন্মাদনা ও দেশটিকে কব্জা করতে সমর্থন ও সহযোগিতা করছে। আমেরিকান সেনাবাহিনি আফগানিস্তান ত্যাগের ঘোষণার পর থেকেই আফগানিস্তানের রাজনীতিতে বড় ধরনের মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
সংবাদ মাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হচ্ছে যে, আফগান তালিবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালিবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার বুধবার (২৮ জুলাই) চিন সফরে গেছেন, আর সেখানে পৌঁছেই উত্তরাঞ্চলীয় তিয়ানজিং শহরে তিনি বৈঠক করেছেন চিনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে।
পাকিস্তানের মাধ্যমে বেশ কিছুদিন ধরেই চিন তালিবানের সাথে তলে তলে যোগাযোগ রক্ষা করছে, কিন্তু এই প্রথম এত উঁচু মাপের কোনো তালেবান নেতা চিন সফরে গেলেন। এবং এই সফর এমন সময় হচ্ছে, যখন কিছুদিন আগেই তালিবান চিনের সীমান্তবর্তী আফগান প্রদেশ বাদাকশানের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলো কব্জা করেছে।
তালিবান নেতার এই সফরের চারদিন আগে আফগান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতে চিনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণ করেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশীকে। চেংডু শহরে দুই মন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয় যে আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চিন ও পাকিস্তান যৌথভাবে কাজ করবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, তালিবানরা সাধারণ নাগরিক। তারা মোটেই জঙ্গি নয়। আফগানিস্তানে তালিবানদের সাহায্য করতে অন্তত ১০ হাজার পাক সেনা সেদেশে গিয়েছে, এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সে প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে এক টিভি সাক্ষাৎকারে এই কথা বলেন তিনি।
ইমরান যতই তালিবানদের ‘সাধারণ নাগরিক’ বলে দাবি করুন, মার্কিন সেনা সরতে শুরু করার পরই আফগানিস্তানকে রক্তাক্ত করতে শুরু করেছে তারা। দেশটির প্রায় চারশো জেলার মধ্যে দুশোটি দখল করেছে বলে দাবি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনটির। কান্দাহার ও হেরাতের মতো শহরগুলিতে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে জেহাদিরা। সাধারণ মানুষকে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। ।
আফগানিস্তানে তালিবানদের প্রত্যাঘাত করার চেষ্টা করছে আফগান সেনা। আর এই পরিস্থিতিতে জঙ্গি গোষ্ঠীর হাত শক্ত করতেই সেদেশে প্রবেশ করেছে বিরাট সংখ্যক পাক সেনা। সেই সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর সেদেশে ঘাঁটি গড়ে ফেলেছে বলে জানা গিয়েছে। কেবল লস্করই নয়, জইশ-ই-মহম্মদও ঘাঁটি গেড়েছে বলে দাবি। যদিও পাকিস্তান এই ধরনের দাবিকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তালিবানের সঙ্গে তাদের আঁতাত ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
নষ্ট রাজনীতির এই ধারা দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলে জঙ্গিবাদের বাড়বাড়ন্তে সহায়ক হবে সে আশংকা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। খুব স্বাভাবিকভাবেই এর বিরূপ প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে দেশগুলোতে পড়বে। সেটা হলে নতুন নতুন সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে দেশসমূহ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ