চিন ভারত পাকিস্তান প্রসঙ্গ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৭, ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

সুখরঞ্জন দাশ গুপ্ত


চিনের অন্যতম প্রদেশ সিজিয়ানে সদ্য সমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলনে ভারত কূটনৈতিকভাবে সাফল্য পেয়েছে। সম্ভবত নরেন্দ্র মোদির ৪০ মাসের শাসনে এই প্রথম ব্রিকস সদস্য দেশগুলি ভারতের প্রস্তাব মেনে নিয়ে পাকিস্তানে অধিকৃত কাশ্মীরের লস্কর এ তৈবা ও জইশ এ -মহম্মদকে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এর আগে গত বছর ভারতের গোয়ায় এই ধরনের প্রস্তাব ভারত আনলেও চিনের আপত্তিতে তা গ্রহণ করা হয়নি। এমনকী রাশিয়াও সেদিন এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তাই কূটনৈতিক মহল মনে করছে চিনে ব্রিকসের মঞ্চে এটা বড় সাফল্য। এমনকী জাতিসঙ্ঘে কয়েক বছর আগে পাকিস্তানের দুটি সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী বলা হলে চিন তাতে ভেটোও দিয়েছিল। সূচনা হয় ২০১৩ বেজিং-এ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ও চিন কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটা চুক্তিতে বলা হয়েছিল, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্লাগ মিটিং করে মিটিয়ে ফেলবে।
সিকিম সীমান্তে ডোকালাম থেকে ভারত-চিন সেনা সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় আপাতত খানিকটা ভারমুক্ত হয়েই চিনের ব্রিকস সম্মেলনে যেতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে চিনের কাটা এখনও বিঁধেই রয়েছে ভারতে গায়ে। প্রথমত বেজিঙের সঙ্গে পাঞ্জা কষার আগে সাতপাঁচ ভেবে এগোনোর শিক্ষা পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তাছাড়া ডোকালাম সমস্যা আপাতত মিটলেও, অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখে যে আবার নতুন করে অশান্তি শুরু হবে না তার গ্যারান্টি দেয়া যাচ্ছে না। সাউথ ব্লক তা সব রকম সতর্কতামূলক ব্যবস্থাই বহাল রাখতে চাইছে।
তবে আপাতত ডোকালাম সমস্যা মিটে যাওয়ায় বিদেশন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, কংগ্রেসের গুলাম নবি আজাদ, আনন্দ শর্মাসহ বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতাকে ফোন করে ধন্যবাদ দিয়েছেন, ডোকালাম ইস্যুতে কেন্দ্রের পাশে থাকার জন্য। তবে সীতারাম ইয়েচুরি বিদেশমন্ত্রীকে বলেছেন, ছাতি ঠুকে আস্ফালনের বদলে কূটনৈতিক পথে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় তাঁরা সব সময়ই স্বাগত জানাবেন। ডোকালাম ইস্যু একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তার ফাঁকফোকড়গুলিও দেখিয়ে দিয়েছে। ডোকালাম নিয়ে বিতর্ক গত জুন মাসে হঠাৎ শুরু হয়নি। শিলিগুলি করিডরকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরেই রাস্তা বানাচ্ছিল চিন। ভারত যে ব্যাপারে রা কাড়ছে না তাও তাদের নজরে ছিল। এমনকী ভারতের দুটি ফাঁকা বাঙ্কার উড়িয়ে দেয়ার পরও তার জবাব দিয়ে বিস্তর সময় লাগিয়েছে ভারত। বর্তমানে ডোকালাম থেকে সেনা সরালেও চিন জানিয়েছে, তারা ওই এলাকায় নজরদারি চালিয়ে যাবে।
বিস্তর টানবাহানার পর উত্তেজনার অবসান হয়েছে ভারত-ভূটানের সীমান্তের ডোকালামে। ভারত ও চিন উভয় দেশই বিবৃতি দিয়ে ওই বিতর্কিত এলাকাটি থেকে সেনা সরানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। চলতি সপ্তাহের সোমবার থেকে শুরু হয়েছে চিনে ব্রিকস’র বৈঠক। সেখানে যোগ দিতে যাবে না ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার আগেই সেনা সরাতে রাজি হয়েছে দুটি দেশ। ভারতের সেনা সূত্রে জানানো হয়েছে, সেনা সরানোর কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছে।
ভারতের সিকিম এবং ভূটান ও চীন সংলগ্ন ভূখণ্ড ডোকালাম। জুনের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা নিরসনে একমত হলেও পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দু’রকম ভাষা দিয়েছে দুটি দেশ। ভারতের বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, দুই দেশই সেনা সরাতে সম্মত হয়েছে। তবে ভারত সেনা সরাচ্ছে জানার পরেও চিন সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। চিনের বিদেশমন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে যথাযথ মর্যাদা দেয় চিন। তবে সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতেও ভূমিকা পালন করে চলবে চিনের সরকার।
গত ১৬ জুন থেকে ভারত ও চিনের মধ্যে ডোকালাম ঘিরে উত্তেজনা শুরু হয়। সে সময় ভারতীয় সেনা চিনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দেয়। ডোকালামের অবস্থান চিন-ভূটান সীমান্তে। ভূটানের অভিযোগ, চিন যে রাস্তা তৈরি করছে তা দু’দেশের ১৯৮৮ ও ১৯৯৮’র চুক্তিকে লঙ্ঘন করেছে। দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে না বলে ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল।
ভূটানের বিদেশমন্ত্রকের পক্ষ থেকে ওই নির্মাণে আপত্তি জানানো হয়। এরপরে ভূটানের অনুরোধে ভারতীয় বিতর্কিত এলাকায় প্রবেশ করেছে বলে ভারতের সেনা জানায়। ভারতের সিকিম ডোকালামের কাছে। বস্তুত কাশ্মীর থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত ৩৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-চিন সীমান্তের ২২০ কিলোমিটারই সিকিমে। ভারত প্রায় সাড়ে তিনশো সেনা পাঠিয়েছিল ডোকালামে। অন্যদিকে চিনের দাবি- ডোকালামে তারা যে রাস্তা তৈরি করছে তা তাদেরই ভূখণ্ডে।
১০ সেপ্টেম্বর সেনা সরানোর কথা বলে ভারত জানিয়েছে, দু’দেশই নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। সেই সূত্রেই সেনা সরানো সম্ভব হচ্ছে।
ভারতকে দুষে ফের একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে চিন। উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহের গোড়াতেই ডোকালাম প্রশ্নে শান্তির বাণী শোনা গিয়েছিল চিনের মুখপাত্রের গলায়। কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বর তারা আবার জানিয়েছে, ভারত যা করছে তাতে ডোকালাম ইস্যুতে কোনো সমাধানসূত্র বের হওয়াই সম্ভব নয়। এবার তাদের আক্রমণের লক্ষ্য, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় সড়কপথ তৈরি করা।
প্যাংগং লেকের কাছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক পথ তৈরি করছে দিল্লি। ১০ সেপ্টেম্বর একটি রিপোর্টে চিন দাবি করছে, ওই প্রকল্প চলতে দিয়ে দিল্লি আসলে নিজের গালেই চড় মারছে। চিনের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র হুয়া চুনইং ১০ সেপ্টেম্বর বলেন, চিনের সড়কপথ তৈরিকে অনুকরণ করছে ভারত। তাতে একটি কথাই প্রমাণ হয়েছে। ভারত বলে এক আর করে এক্- তাঁর বক্তব্য, ভারত-চিন সীমান্তের পশ্চিম অংশ এখনও নিশ্চিত নয়। দু’পক্ষই কিন্তু রাজি হয়েছিল, যতদিন না ডোকালাম সঙ্ঘাত মিটছে, সীমান্ত নিয়ে শান্তি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে। কিন্তু ভারত সড়ক পথ তৈরি করতে গিয়ে শান্তি ও শৃঙ্খলাভঙ্গ করছে।
এদিকে আফগানিস্তান নীতি ঘোষণা করতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে একহাত নিয়েছিল। স্পষ্ট ভাষায় তারা বলেছে, গোটা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানের দাবি ছিল আমেরিকার আফগান-নীতির সঙ্গে যুক্ত করা হোক জম্মু-কাশ্মীরকেও। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে কাশ্মীর নিয়ে মাথা গলাবে না ওয়াশিংটন। তারা আগের মতোই এখনও চায় ভারত ও পাকিস্তান আলোচনার টেবিলে বসে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করুক। আফগান নীতির সঙ্গে কাশ্মীরকে যুক্ত করার প্রশ্নই ওঠে না।
৫ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তান নীতি ঘোষণা করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ভারত ও পাকিস্তানের নামোল্লেখ করেছিল। ট্রাম্প একদিকে সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্য করার জন্য পাকিস্তানকে তুলোধনা করেছিলেন। সেই সঙ্গেই নতুন আফগানিস্তান গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভারতের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে ভারতকে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ট্রাম্পের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, আফগানিস্তানের পুনর্গঠনের আরো সদর্থক পদক্ষেপ নিক ভারত।
ট্রাম্পের এই ভারত- স্তুতির পর থেকে আফগান-নীতিতে কাশ্মীরকেও যুক্ত করার দাবি জানাতে থাকে পাকিস্তান। তারা বলে কাশ্মীর নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ না কাটা পর্যন্ত আঞ্চলিক সুস্থিতি ফিরবে না। উল্লেখ্য, এর আগেও আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলিতেও কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলার চেষ্টা করেছিল পাকিস্তান।
কিন্তু হোয়াইট হাউসের বিদেশ দপ্তরের এক মুখপাত্র স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আমেরিকার কাশ্মীর নীতি কোনোভাবেই বদলায়নি। তারা আগেও যেমন চাইত, এখনও তেমনই চায়। ভারত ও পাকিস্তান আলোচনার টেবিলে বসে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করুক।
লেখক: জেষ্ঠ্য সাংবাদিক ( কলকাতা)