চোখের ছানি অপারেশন ও লেন্স রহস্য

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২০, ১১:২২ অপরাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু


মানব দেহের চোখ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল ও ভীষণ অনুভূতিসম্পন্ন একটি অঙ্গ। চোখের বিভিন্ন সমস্যা ও অসুখ বিসুখ হয়। এর মধ্যে ছানিপড়া রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। চোখে ছানিপড়া বয়স্কদের একটি রোগ। তবে সব বয়স্কদের নয়। বেশকিছু বয়স্ক নারী-পুরুষ আছে যাদের ৪০-৫০ বছর বয়স থেকেই সাধারণত চোখের মণির উপরে এক ধরনের আবরণ পড়া শুরু করে এবং দৃষ্টি অস্বচ্ছ হতে থাকে। এটাকেই ছানি রোগ বলা হয়। কারো এক চোখে পড়ে, কারো দুই চোখেই পড়ে- একসাথে আবার কারো পর্যায়ক্রমে দুই চোখেই ছানি পড়ে। একসময় দৃষ্টিশক্তি হারায়। ছানিজনিত কারণে দৃষ্টিশক্তি হারালে অস্ত্রপোচারের মাধ্যমে ছানি অপসারণ করে একটি লেন্স পরিয়ে দেয়া হয়। চোখের জন্য এটি বড় অপারেশন হলেও অপারেশনের ৬ ঘণ্টা পরে রোগীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। তখন পূর্বের মতই দৃষ্টি ফিরে পায়।
প্রায় ৫০ বছর ধরে দেখে আসছি দিনাজপুর গাউসুল আজম চক্ষু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষের আহ্বানের সাড়া দিয়ে সেখানে চক্ষু শিবিরের মাধ্যমে বিনা পয়সায় চোখের ছানি অপসারণ করতে। আজো ওই হাসপাতালটি চোখের ছানি অপসারণের জন্য নিবেদিত। তবে বছর দশেক থেকে তারা মাঠ পর্যায়ে চক্ষুশিবির করে না। রোগীদের নিরাপত্তাজনিত কারণে ও স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ নির্দেশের প্রেক্ষিতে। এখন তারা মাঠ পর্যায়ে ছানি রোগী বাছাই করে যায়। সেই রোগীদের দিনাজপুর গাউসুল আজম হাসপাতাল নিয়ে যেতে হয়। সেখানেই ছানি অপসারণে অস্ত্রপোচার করে। কিন্তু তাই নয়, তারা চার বেলা রোগীকে খেতেও দেয়। এখন দিনাজপুর গাউসুল আজম হাসপাতালের মতো বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। তারাও বিনে পয়সায় ছানি অপসারণ করে দিচ্ছে। সরকারি হাসপাতালেও বিনে পয়সায় ছানি অপসারণ করা হয়। তবে সেটা সংখ্যায় কম।
ছানি রোগী ও তাদের অস্ত্রপোচার নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা পাঠকদের সাথে শেয়ার করছি। একটি বেসরকারি সংস্থা ‘চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্রের’ সভাপতি হিসেবে ৮ বছর দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে ৬টি চক্ষু শিবিরের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। আমরা দিনাজপুর গাউসুল আজম হাসপাতালের প্রোগ্রাম অফিসার হামিদুল হকের সাথে যোগাযোগ করে একটা তারিখ নিতাম- সেই তারিখে ছানি রোগীদের সমবেত করার জন্য মাইকিং, পোস্টারিং ও মসজিদে মসজিদে মুসল্লিদের অবহিত করতাম। ৬টি চক্ষু শিবিরেই সহস্রাধিক পুরুষ-নারী চক্ষু রোগী সমবেত হতো। নির্দিষ্ট তারিখে উল্লিখিত হাসপাতালের ডাক্তারগণ আসতেন এবং সর্বোচ্চ ১২০ জন ছানি রোগী বাছাই করতেন। আরো ছানি রোগী চিহ্নিত হলেও তাদের পরবর্তী ক্যাম্পের জন্য অপেক্ষা করতে বলতাম। বাছাইকৃত এই ছানি রোগীদের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে বাস ভাড়া করে দিনাজপুর হাসপাতাল পৌঁছাতাম। পরের দিন তাদের অপারেশন করে আবার তাদের বাসে করে পুনরায় ফিরে এসে রোগীদের অভিভাবকদের হাতে তুলে দিতাম। ২০-২৫ দিন পরে আবারও ওই অপারেশনকৃত রোগীদের সমবেত করতাম ফলোআপ করার জন্য। দিনাজপুরের ডাক্তাররা এসে ফলোআপ করতেন। আমার জানামতে অস্ত্রপোচারের পরে কোনো রোগী চোখের জটিলতায় ভুগেন নি। বরং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবার পর আমাদের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করেছেন। প্রতিটি ক্যাম্পে আমাদের খরচ হতো প্রায় ১ লাখ টাকা। যা স্থানীয় গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করতাম। রোগীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার অর্থ নেয়া হতো না। আমি জেনেছিলাম গাউসুল আজম চক্ষু হাসপাতালে জার্মানের একটি সাহায্য সংস্থা চক্ষু রোগীদের জন্য লেন্স পাঠায় প্রতি বছর। তেমন করে দেশের অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোও এখন আমেরিকা ও ফ্রান্স সহ বিভিন্ন দেশ থেকে লেন্স সাহায্য পেয়ে থাকে। একজন অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদককে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি যেসব লেন্স সাহায্য হিসাবে বিদেশ থেকে আসে তার দাম সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা।
যাহোক, বিভিন্ন চক্ষু হাসপাতালে প্রতি বছর কয়েক লাখ রোগীর বিনে পয়সায় ছানি অপসারণ করা হয়। কিন্তু ছানি রোগীর সংখ্যা কমছে না বরং বেড়েই চলেছে। এছাড়া যাদের আর্থিক সামর্থ আছে তারা বেসরকারি হাসপাতালে ও ক্লিনিকে ছানি অপসারণ করিয়ে নেন। যারা বিনে পয়সায় ছানি অপারেশনকে পাইকারি অপারেশন মনে করেন তারা অর্থ ব্যয় করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে অপারেশন করিনে নেন বলে তারা যে বেশি দেখতে পান তা কিন্তু মোটেও নয়। অথচ মফস্বল শহরের কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে ছানি অপারেশনের জন্য কোনো রোগী গেলে বলা হয়- তিন ধরনের লেন্স আছে। যথা- সাড়ে ৫ হাজার, সাড়ে ৬ হাজার, সাড়ে ৭ হাজার। রোগী বলেন- যেটা ভালো হবে সেটাই করে দেন। ডাক্তার বলেন- সবই ভালো, আপনি যেটা বলবেন সেটাই করা হবে। শেষে রোগী যেটা পছন্দ করে ডাক্তার সেই অনুযায়ী অস্ত্রপোচার করে লেন্স লাগিয়ে দেয়। রোগী যখন বিভাগীয় শহরে কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যান তখন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করে ছানি অপসারণ করে আসেন। আবার কোনো রোগী যখন ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতাল, পপুলার হাসপাতাল সহ বড় বড় হাসপাতালে যান তখন তারা লেন্সের দাম হাকেন ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আমার সংগঠনের মাধ্যমে যাদের একটা চোখের ছানি অপসারণ করা হয়েছে তাদের মধ্যেকার ২/৩ জন ও আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে পাওয়া উপরোক্ত অভিজ্ঞতা। আরেক বন্ধু নেপাল থেকে ছানি অপারেশন করে এসেছেন ৫০ হাজার টাকা খরচ করে।
কোথায় বিনে পয়সার লেন্স- কোথায় ৫০ হাজার টাকার লেন্স, এই বিশাল তারতম্য সম্পর্কে কয়েকজন এমবিবিএস ও একজন সিভিল সার্জনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন- বড় বড় শহরে তাদের ক্লিনিকের বা হাসপাতালের এস্ট্যাব্লিসমেন্ট খরচ, ডাক্তারদের ফি, তেমনি তাদের দামী লেন্স যার ফলেই এই তারতম্য। প্রশ্ন রেখেছিলাম চোখের মত অনুভূতিসম্পন্ন একটি অঙ্গের জন্য ভালমন্দ বা কম ভালো, ভালো, বেশি ভালো লেন্স তৈরি করা কি কোনো মানবিক কাজ? বা এর পিছনে বিশেষ কী যুক্তি থাকতে পারে? উত্তরে তারা বলেছিলেন- লেন্সগুলি বিদেশ থেকে আসে। এ ব্যাপারে চক্ষু বিশেষজ্ঞরা ছাড়া কেও বলতে পারেনা। তাছাড়া ভালোমন্দ বা বেশি ভালো বা কম ভালো না হলে দামই বা কমবেশি হবে কেন। তাছাড়া রোগীকে বিশ্বাস করেই গ্রহণ করতে হবে যা ডাক্তার বলবেন। একজন অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এই ব্যাপারে বলেন, কারো চোখের বিশেষ সমস্যার কারণে ভিন্ন ধরনের বা বিশেষ ধরনের লেন্স তৈরি বা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু ছানি অপারেশনের জন্য যে লেন্স ব্যবহার হয় তার দাম দেশ ভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার উপরে নয়। যেসব ডাক্তাররা ছানি অপারেশনের নামে লেন্সের পার্থক্য দেখিয়ে অধিক ফি আদায় করেন তারা অন্যায় করেন। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি নন। তারা বলেন, এটি প্রযুক্তিগত ব্যাপার। এটা আপনি বুঝবেন না। আমি আরো শুনেছি বিদেশ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত লেন্সগুলি চোরাপথে বিক্রি হয়।

এসব প্রশ্ন উদয় হবার কারণ হচ্ছে আমাদের সংগঠনের মাধ্যমে যারা বিনে পয়সায় এক চোখের ছানি অপারেশন করেছিলেন তাদের কয়েকজন চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডাক্তারের কাছে ছানি অপারেশন করতে গিয়ে ৭ হাজার টাকা দিয়েছেন। আরো কয়েকজন রাজশাহী গিয়ে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ছানি অপারেশন করে এসেছেন। আবার কেও ঢাকা গিয়ে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে চোখের ছানি অপারেশন করিয়ে এসেছেন। তাদের মুখ থেকেই শুনেছি বিনে পয়সায় ছানি অপারেশন এবং ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছানি অপারেশনের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। অহেতুক অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে ছানি অপারেশনের জন্য যদি একই ধরনের ও দামের লেন্স ব্যবহার করা হয় তাহলে ফি বাবদ রোগীদের কাছ থেকে গলাকাটা অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছানি অপারেশনের খরচ নেয়া কোনোভাবেই মানবিক কাজ নয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যে, ডাক্তার চক্ষু শিবিরে বিনে পয়সায় অপারেশন করছেন সেই ডাক্তারই তার চেম্বারে গলাকাটা ফি আদায় করছেন। এছাড়া তাদের কথা অনুযায়ী ভালো খারাপ লেন্সের দামের যে তারতম্য বা গুণাগুণ সম্পর্কিত জনসাধারণ্যে জানানো হয়না। এটা রহস্য হিসেবেই থেকে গেছে। এই রহস্যভেদের জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞদের আহ্বান রইলো। তারা সব ধরনের তথ্য প্রমাণ সহ কোনো পত্রিকায় যেন প্রকাশ করেন।
চোখ নিয়ে আরো কথা আছে যেমন- গত অক্টোবর ১০ তারিখে বিশ্বব্যাপি ওয়ার্ল্ড সাইট ডে পালিত হলো। এর উদ্দেশ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিকারযোগ্য অন্ধত্ব শতকরা ০.৫% নামিয়ে নিয়ে আসা। আন্তর্জাতিক অন্ধত্ব নিবারণ সংস্থার জন্ম হয় ২০০০ সালে ১৫০টি দেশের মধ্যে এক স্মারক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে। দেশের হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা এই দিনটি পালন করছে ১৮-১৯ বছর ধরে। আর সরকারিভাবে এ দিবসটি পালিত হয়েছে প্রথম ২০১৯ সালে। যাহোক স্বাস্থ্য বিষয়ক জার্নাল বলছে ৮০% চক্ষু রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারযোগ্য হলেও প্রতি ৫ সেকেন্ডে একজন করে মানুষ অন্ধত্ব বরণ করছে, প্রতি মিনিটে ১ জন শিশু অন্ধ হচ্ছে এবং ৫ জন অন্ধের মধ্যে ৪জনই সীমাহীন গরিব। অন্যদিকে আমাদের দেশে ২ লাখ মানুষের জন্য ১ জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না। যেখানে আমেরিকায় ৫০ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে ১ জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। সুতরাং অন্য কোনো উন্নত দেশে অন্ধত্ব নিবারণ ০.৫% নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও আমাদের দেশে অন্ধত্ব নিবারণে সরকারের কোনো কর্মসূচি নেই। আর বেসরকারি পর্যায়ে অন্ধত্ব নিবারণ কর্মসূচির যে গতি তাতে আমাদের দেশে ওই পর্যায়ে নিয়ে আসা অসম্ভব।
এদিকে ক্ষীণদৃষ্টি বা দৃষ্টি স্বল্পতা নামে একটি চক্ষু সমস্যা দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে। চোখের প্রথম ৪টি রোগের মধ্যে এটি একটি রোগ। যারা কাছের বস্তু ভালো দেখতে পান কিন্তু দূরের বস্তু ঝাঁপসা দেখেন তারাই মূলত এই রোগে ভুগেন। সবুজের বা প্রকৃতির সাথে যাদের সম্পর্ক নেই। ঘরের মধ্যেই যারা বেশিক্ষণ থাকেন। দিন রাতে ৪-৫ ঘণ্টা টিভি দেখেন, কম্পিউটার, স্মার্টফোন ব্যবহার করেন- তাদের মধ্যে এই দৃষ্টিস্বল্পতা সমস্যাটি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০ ভাগ ছেলে ও বুড়োদের চশমা ব্যবহার করতে হবে। চোখের এই ধাবমান সমস্যার সমাধান কি করতে পারবে আমাদের দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ?
লেখক: কলাম লেখক ও সাংবাদিক