ছদ্মবেশী দাসপ্রথা এবং কাজের মেয়ের ফিরিস্তি

আপডেট: জুলাই ১৪, ২০১৭, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

শান্তা মারিয়া


বাংলাদেশে দাসপ্রথা নেই; মানুষ বেচাকেনা নিষিদ্ধ। কিন্তু এ দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির ঘরে ঘরে দেখা মেলে এই ‘প্রথা’র। ‘কাজের মানুষ’ নামের আড়ালে যারা আছে তাদের সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে আচরণ গৃহকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যরা করেন তা দাসপ্রথারই ছদ্মবেশী রূপ।
প্রায়ই গণমাধ্যমে ছবি আসে হাত-পা ভাঙা, চোখ ফুলে ওঠা, সর্বাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু শিশুর। কখনও কখনও তরুণীদেরও। এরা গৃহশ্রমিক। খুন্তির ছ্যাঁকা, রুটি বানানো বেলুনের বাড়ি, চুলটানা, সিগারেটের ছ্যাঁকা খাওয়া এদের জীবনে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কখনও কখনও ঘটে ধর্ষণ ও যৌননিপীড়ন। এদের কপালে জোটে ফ্রিজে রাখা বাসি খাবার, পরনে জোটে আধময়লা কাপড়চোপড় আর ঘুমানোর জায়গা হয় রান্নাঘরে কিংবা ডাইনিং স্পেসের মেঝেতে। এদের মধ্যে শিশু-কিশোরের সংখ্যাই বেশি। তাদের মধ্যে অধিকাংশই মেয়ে। কারণ, শিশুশ্রম সস্তা এবং মেয়েশিশুর শ্রম আরও সস্তা।
এদের পরিশ্রমের অর্থ তাদের হাতে দেয়া হয় না। দেয়া হয় অভিভাবকের হাতে। তা-ও একবারে নয়, মাসে মাসেও নয়, ভেঙে ভেঙে। কখনও সেই সামান্য অর্থও আটকে রাখা হয়, পাছে তারা চলে যায়। সাধারণত নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের বাড়িতে শিশু গৃহকর্মী রাখা হয়। উচ্চবিত্তের বাড়িতে রাখা হয় প্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মী। তারা বেশি বেতনে কাজ করেন এবং সাধারণত বেশি নির্যাতিত হন না। তবে প্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীও অনেক সময় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হন, উচ্চবিত্তের বাড়িতেও। তাদের আর্তনাদ চার দেয়ালের ভেতরেই থাকে। সেখানেও মানবতার অপমান ঘটে।
গ্রাম থেকে একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সন্তানরাই সাধারণত গৃহকর্মী হিসেবে বহাল হয় শহরের ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে। প্রথম পর্যায়ে অনেক সময় তাদের নামটিও বদলে ফেলা হয়। বিশেষ করে যদি তাদের নামে ওই পরিবারের কারও নাম থাকে। তারপর এই ‘পিচ্চি’রা ট্রেনিং পায় কাজকর্মের। অনেক সময় তাদের রাখা হয় বাড়ির ছোট শিশুর সঙ্গে খেলার জন্য বা তার দেখাশোনা করার জন্য।
একটি শিশু চোখের সামনে দেখে তার বয়সী বা তার চেয়ে ছোট একটি শিশু অনায়াসে তার মাথার উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে। ওই মনিব শিশুটিও জীবনের শুরুতেই শ্রেণিবৈষম্যের পাঠ পেয়ে যায়। পেয়ে যায় ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাদ। সে বুঝে যায় দুজনের খেলায় ন্যায়-অন্যায় আপন গতিতে চলবে না। চলবে অর্থের গতিতে। মনিব শিশুর সব অন্যায় আবদার মানতে বাধ্য ওই দরিদ্র শিশুটি। তারপর যখন ধনী শিশুটি স্কুলে যায় তখন গরিব শিশুটি তার ব্যাগ বহন করে নিয়ে যায় এবং ঘরের কাজকর্ম সারে।
প্রাসঙ্গিক একটি ঘটনা বলি। প্রতিদিন আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে প্রতিবেশী একটি শিশুকে স্কুলে যেতে দেখি। বছর ১২ বয়স হবে। বেশ হৃষ্টপুষ্ট। তার স্কুলের ব্যাগটি খুব ভারী। ওই ব্যাগ বয়ে নিয়ে যায় ১০-১২ বছরের একটি রোগা শিশু যে আকারে মনিব সন্তানের অর্ধেক। দৃশ্যটির অমানবিকতা প্রতিনিয়ত আহত করে।
অধিকাংশ শিশু গৃহকর্মী অপুষ্টির শিকার। সে খায় উচ্ছিষ্ট। আর চোখের সামনে দেখে তুলনামূলক ধনী শিশুটির আদর আহ্লাদ। ধনী শিশুটিকে পটিয়ে যদি কিছু সুখাদ্য পাওয়া যায় সেই চিন্তাতেই স্বাভাবিকভাবে ধাবিত হয় তার বুদ্ধি। এই দরিদ্র শিশুদের উপর যে কী অমানবিক সব নির্যাতন করা হয়, তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলো দেখলে টের পাওয়া যায়।
শিশু গৃহশ্রমিকের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের খবর এতটাই সাধারণ যে বিশেষ রকম নিষ্ঠুরতা না হলে এই জাতীয় খবরগুলো তেমন কোনো গুরুত্বই পায় না। গৃহকর্মী শিশুর মৃত্যুও তেমন কোনো বড় খবর নয়। এমনকি সেলিব্রিটির ঘরের গৃহকর্মী হলেও তা ধামাচাপা পড়ে যায়। ‘হত্যা’কে ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দেয়া হয় অনায়াসে। টাকার জোরে কিছুদিনের মধ্যেই অপরাধী বিচার প্রভাবিত করে ফেলে। হয়তো নিহত বা আহত শিশুর দরিদ্র অভিভাবককে টাকা দিয়ে কিনে ফেলা হয়। ফলে অনেক সময় মামলা হয় না। আর মামলা হলেও তা অগ্রসর হয় না। মিডিয়াতেও এসব খবর চাপা পড়ে যায় অন্য খবরের তলায়।
২০১৩ সালে আদুরী নামে একটি গৃহকর্মী শিশুর উপর অমানবিক নির্যাতনের খবর প্রকাশ হয়েছিল। সেই মামলার রায় ১৮ জুলাই প্রকাশ হবে বলে জানা গেল। তার মানে মামলা চলেছে চার বছর। এত দীর্ঘ সময় মামলা চালানো অধিকাংশ দরিদ্র শিশুর অভিভাবকের পক্ষে সম্ভব হয় না। অনেকের হয়তো মা-বাবা নেই। এতিম শিশুর হয়ে কে আর মামলা চালাবে।
দুর্বলতর শ্রেণির উপর অন্য শ্রেণির মানুষের দমন-পীড়নের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে কাজের মেয়ে নির্যাতনের ঘটনাপ্রবাহ। নিয়োগকর্তারও কিন্তু এদের বিরুদ্ধে নালিশের সীমা নেই। ‘চুরি করে খায়’, ‘ওদের কাছে রেখে যাওয়া বাচ্চাদের অযতœ করে’, ‘বাড়ির পুরুষদের মতিভ্রম ঘটায়’, ‘নোংরা’, ‘ফাঁকিবাজ’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
রোমের দাসমালিকরাও তাদের দাসদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলোই করত। গৃহকর্মীর হাতে খুনের মতো অনেক দাসমালিকও খুন হত ক্রীতদাসের হাতে। কারণ, চরম বৈরী সম্পর্ক নিয়ে, একজনকে চরমভাবে নিপীড়ন করে দিনের পর দিন তারই সঙ্গে এক ছাদের নিচে বসবাস করলে এই ঘৃণা ও পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ তো একদিন ঘটবেই। এ জন্য দায়ী অমানবিক সমাজব্যবস্থা।
আমাদের নিয়োগকর্তারাও যখন গৃহকর্মী বিষয়ে অভিযোগ তোলেন তখন তাদের অভিযোগের ভেতরে সেই দাসমালিকসুলভ মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অথচ অভিযোগগুলো করার আগে নিয়োগকর্তা একবারও ভাবছেন না যে, একটি শিশু বা বড় মানুষও যদি দিনরাত কাজ করে, অর্থাৎ তার শ্রমঘণ্টা যদি নির্ধারণ করা না থাকে তাহলে সে বিশ্রাম তো কখনও কখনও নেবেই। তাকে যদি পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো সমমানের খাবার দেয়া হত তাহলে তার চুরি করার প্রয়োজন পড়ত না।
মোট কথা তার সঙ্গে আচরণটি হবে অমানবিক অথচ ওই অশিক্ষিত, দরিদ্র মানুষটির কাছ থেকে আশা করা হবে দায়িত্বশীল কর্মীর আচরণ।
একটি শিশু জন্ম থেকে দেখে তার চারপাশে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ভয়াবহ রূপ। সমাজের বৈরিতার ভেতর দিয়ে তার চেতনার উন্মেষ ঘটে। সবার কাছ থেকে পায় শুধু অবিচার ও চূড়ান্ত অমানবিক ব্যবহার। তাহলে কীভাবে তার কাছ থেকে নিয়োগকর্তা আশা করেন যে শিশুটি রোবটের মতো পরিশ্রম করবে অথচ কাজে কোনো ভুল করবে না।
সম্প্রতি গৃহকর্মী নির্যাতনের একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে একটি নিপীড়িত অসহায় দরিদ্র শিশুকে। মারের চোটে তার চোখমুখ ফুলে গেছে। পাশেই এক সুসজ্জিত নারী। শিশুটির নিপীড়ক। এই ছবিটি যে আসলে আমাদের সমাজের শ্রেণিবৈষম্যের নির্মম বাস্তবতা তা কিন্তু কেউ তলিয়ে ভাবছে না। পাশাপাশি ভাবতে অবাক লাগে একটি রোগা অসহায় শিশুকে এভাবে প্রহার করা কীভাবে সম্ভব? এরা কি মানুষ? কতটা হিংস্র হলে মানুষ একটি শিশুর উপর নির্যাতন চালাতে পারে?
ভারতীয় উপমহাদেশে ‘গৃহদাস প্রথা’ ছিল একসময় জমজমাট। আর এই প্রথারই অবশেষ হিসেবে বহাল আছে ‘গৃহকর্মী প্রথা’। গৃহকর্মী রাখার প্রয়োজন হত না যদি ছোটবেলা থেকে প্রত্যেক শিশু নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস নিয়ে বেড়ে উঠত। ঘরের কাজ করার জন্য শ্রমিক রাখার প্রয়োজন হয়, কারণ, অনেক বাঙালি পুরুষ ঘরের কাজ করতে চান না। আর অনেক বাঙালি মধ্যবিত্ত নারীও (সবাই নয়) গৃহশ্রমবিমুখ।
যে মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরে এক গ্লাস জলও গড়িয়ে খায় না সেই কিন্তু বিদেশে গিয়ে ‘অড জব’ করে। তখন অন্যের শিশুর দেখভাল করে, ‘গারবেজ ক্লিন’ করে, রাস্তাও ঝাড়ু দেয়।
এ প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করছি। চিন আন্তর্জাতিক বেতারে কাজ করার সময় দেখেছি সেখানে কোনো পিয়ন বা অফিস অ্যাসিসটেন্ট নেই। নিজের ডেস্ক ও অফিস নিজেকেই পরিষ্কার রাখতে হয়। বিভাগের সম্মানিত পরিচালক পর্যন্ত তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে অফিস ঝাড়ু দেন। অফিস ফ্লোর মুছে পরিষ্কার রাখেন। চিন আন্তর্জাতিক বেতারের বিশাল ভবনে ক্লিনার আছে। কিন্তু সেই ক্লিনার মর্যাদায় মোটেই খাটো নন। তিনি ক্যান্টিনে মহাপরিচালকের সঙ্গেও এক টেবিলে বসে খেতে পারেন অনায়াসে।
চিনে ডোমেস্টিক হেল্পও পাওয়া যায়। যথেষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এরা আসেন। নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টা আছে। হয়তো দুই ঘণ্টার জন্য আসবেন। ঘরের কাজকর্ম করে দিয়ে চলে যাবেন। মর্যাদায় তারা নিয়োগকর্তার চেয়ে কিছু কম নন। কাজের শেষে হয়তো পাশের রেস্টুরেন্টে গিয়ে এক টেবিলেই খানাপিনা করছেন।
অথচ বাংলাদেশে গৃহকর্মীর সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাওয়ার কথা কেউ ভাবতেই পারে না। গৃহকর্মীকে মালিকের পাশে সোফাতেও বসতে দেয়া হয় না। এগুলো সবই গৃহদাস প্রথার অবশেষ। ‘কাজের মানুষ’ যেন ভিন্ন গ্রহের প্রাণী। তার হাতে রান্না করা খাবারে আমাদের আপত্তি নেই, কিন্তু সে ডাইনিং টেবিলে পাশে বসলেই আপত্তি। মানুষকে এইভাবে ঘৃণা ও তুচ্ছ করার মানসিকতাটা জাতি হিসেবে আমাদের কিন্তু ক্রমাগত পিছিয়ে দিচ্ছে। অপমান করছে মনুষ্যত্বকে।
“যারে তুমি নিচে ফেল, সে তোমারে টানিছে যে নিচে।”
দিনের পর দিন সমাজের এক অংশকে পায়ের নিচে চেপে রেখে সমাজ কি খুব বেশিদূর এগোতে পারবে? এখনও আমরা এ দেশ থেকে শিশুশ্রম দূর করতে পারছি না। স্কুলে পাঠানোর বদলে তার হাতে তুলে দিচ্ছি ঘর ঝাড়ু দেয়ার ঝাঁটা। শিশু গৃহকর্মী রাখার প্রথাটিই নিষিদ্ধ করে দেয়া দরকার কঠোরতর আইনের মাধ্যমে। আমাদের ‘শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইন’ রয়েছে। শিশু গৃহকর্মীর বেলায় সেই আইন প্রযোজ্য হওয়া দরকার। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ প্রণয়ন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এই নীতিমালা অবিলম্বে আইনে পরিণত হওয়া দরকার। শুধু আইন থাকলেই চলবে না, প্রয়োগও চাই।
গ্রামেই স্কুলে পড়ার পাশাপাশি আয়মূলক প্রকল্পে ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। একটি শিশুকেও যেন আর গ্রামে পরিবার ছেড়ে শহরে এসে ‘দাসের’ জীবন বেছে নিতে না হয়।
‘কাজের মেয়ের দোষের ফিরিস্তি’ গেয়ে আর কাজ নেই। বরং পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই যার যার কাজগুলো সে সে করুক। রান্নার মতো কাজগুলো ভাগ করে নিক সব সদস্য। প্রয়োজনে খ-কালীন গৃহশ্রমিক থাকতে পারে। কিন্তু দরিদ্র শিশুকে দিয়ে কাজ করানোর প্রবণতা বন্ধ হোক। বন্ধ হোক গৃহকর্মী নির্যাতন।
(বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম এর সৌজন্যে)
লেখক; সাংবাদিক।