ছাই

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২১, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল হাসান:


ছাই আর আমার মধ্যে পার্থক্য কী? দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটের ফিল্টারে বৃদ্ধাঙ্গুলের নখ দিয়ে টোকা মেরে প্রশ্ন করলো সাদেক। ভেতর থেকে উত্তর আসে, ছাই তবু জমির উর্বরতা বাড়ায়। আর আমি? আমি কি শুধু মাটির উর্বরতা ধ্বংস করে চলছি? মরার পরে আমার লাশটা কি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করবে না? তা, তুমি মরার পরে। আর তাছাড়া তোমার লাশ যে মাটিতেই পুতে দেয়া হবে এ নিশ্চয়তাই বা কে দিয়েছে তোমাকে? এমনও তো হতে পারে, তুমি মারা গেলে কোনো অগ্নিকা-ে, তখন তোমার লাশ হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না, খুঁজে পাওয়া যাবে না তোমার শরীরের কোনো চিহ্ন। তাছাড়া নদীতে ডুবেও তুমি মরতে পারে; তখন হাঙ্গরের খাদ্য হিসেবেই তোমাকে পাওয়া যাবে। হ্যা, পাওয়া যাবে এ জন্য বলছি যে শেষমেষ সবকিছুই মাটির সাথে মিশে যাবে। যেহেতু মাটি থেকে সৃষ্টি, তাই তোমাকে মাটিতেই ফিরে যেতে হবে। আরবিতে একটি প্রবাদ আছে, সকল কিছুই মূলের দিকে ধাবিত হয়, তুমিও হবে। হয়তো হাঙ্গরের পরিত্যায্য দেহবর্জ্য হিসেবে তুমি নদীর তলদেশে পাতলা আস্তরণ তৈরি করে শুয়ে থাকবে। হয়তো ¯্রােতের টানে তোমার ক্ষুদ্র পরমাণু ভেসে যেতেযেতে কোনো জমিতে পড়বে। হ্যাঁ, তখন হয়তো তুমি মাটির উর্বরা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারো। কিন্তু এর জন্য যে ঢের সময় দরকার। হ্যাঁ, পুড়ে গেলেও তুমি ফিরে আসবে। এই মাটির বুকেই আসবে। হয়তো তোমার দেহপোড়া ছাই কেউ মাঠে দেবে না সার হিসেবে; কিন্তু বাতাস তোমাকে উড়িয়ে নেবে, ঠিকই ফেলবে কোনো প্রান্তরে। সেখান থেকে হয়তো তুমি মাটির প্রাণরস বৃদ্ধি করতে পারবে কিছুটা। কিন্তু কথা সেটি নয়। কথা হচ্ছে, তোমার তো একটি মানবজীবন আছে। জীবদ্দশায় তুমি কী কী করেছো সেটিই হচ্ছে আসল কথা। আমি… আমি… Ñবলতে বলতে তার হাতের সিগারেটটা নিভে যায়। আজ তেইশ দিন হয় বন্দী হয়ে আছে সাদেক। ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে পুলিশ আসাতে। তা না হলে জনতা তাকে হয়তো পিটিয়েই মেরে ফেলতো।
সাদেক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে। কী কুক্ষণেই যে বের হয়েছিলো সেদিন বাড়ি থেকে! খুব বেশি দূর যেতে পারে না। চল্লিশ পঞ্চাশগজ যাওয়ার পরেই আসলামের ফোন আসে। হ্যালো সাদেক, তুই কই? আমি তো বের হইছি, তুই কোথায়? পাবনায়, তুই চলে আয়। আসতেছি আমি। সাদেক ফোনটা রাখে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। তার বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয় পাবনা। এই চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিটের পথ। পথ যেনো ইকারুস উড়তে থাকে। জায়গাটির নাম তারাই পাবনা দিয়েছে। আসলে এটি দুগ্রামের মাঝখানে একটি পোড়ো ভিটে। শীর্ণ খালটির পাড়ে কোন আমলে আব্দুল গণি খাঁ এখানে বাড়ি করেছিলেন এবং চোর ডাকাতের অত্যাচারে থাকতে না পেরে এই মাঠের মধ্যখান থেকে বাস উঠিয়ে অচিনপুরে যাত্রা করেন। গণি খাঁর পরিবারের খোঁজ আর কেউ পায় না। অনেকে মনে করেন, সপরিবারে গণি খাঁকে তার ভিটিতেই পুতে রেখেছে ডাকাতেরা। সেই থেকে এ বাড়িটি শূন্য পড়ে থাকে। শত বছরের বিলীনতায় নিজের অস্তিত্ব হারাতে হারাতে প্রায় মাঠের সমতলে নেমে এসেছে তার বুক। তবুও বুকজুড়ে বেঁধে রেখেছে তমাল তাল হিজলের শিকড়, লতাগুল্ম-ঝোঁপঝাড়, উঁই পোকার ঢিবি আর বিষধর ভয়ানক সাপ। তাই কেউ সেখানে আর
যায় না। গ্রামের কিছু উৎশৃঙ্খল যুবক ইদানিং, হ্যাঁ, অতি অধুনা সময়ে সেখানে বসে আড্ডা দেয়, রাতবিরেতেও বসে, নেশা-ভাঙ করে, মাতাল হয়ে পড়ে থাকে। তাই তারা এ জায়গাটির নাম দিয়েছে পাবনা। মানসিক হাসপাতাল, বুঝলি, ই-ই-টা হইলো মানসিক হাসপাতাল, আর আমরা সবাই পাগল; হো হো করে হেসে উঠে আসলাম। সাদেক আসলামের হাত থেকে ফয়েলটা নেয়, সুঁই লাগানো দেশলাইটা চাবিতে চেপে মোমের শিখায় ধরে। একবিন্দু আগুনের ত্যাজে ভাজি হতে থাকে তার মোমরঙা বিস্কুট। একসময় সেটি গলতে শুরু করে। গলতে গলতে নিজের স্থান পরিবর্তন করে গড়াতে থাকে নিচে। একটি বাষ্পের মতো সাদা ধোঁয়া বাতাসের ধাক্কায় উড়ে যাবার আগেই নতুন পাঁচ টাকার নোটটি মুড়িয়ে বানানো পাইপে তা টেনে নেয় সাদেক। মুখের ভেতর থেকে সেভেনআপের ছিপিটা বের করতে করতে বলে, হ্যা, ঠিকই বলছো। শহরের উপকণ্ঠে তাদের গ্রাম, গ্রামের নাম নোলকপুর। নোলকপুরের অধিকাংশ মানুষ ভদ্র ও সামাজিক। তবু ফুলের মধ্যেও কীট থাকে, আর জ্যোৎ¯œার মধ্যেও থাকে কলঙ্ক। কোন ফাঁকে যেনো এ গাঁয়ের ছয়-সাতজন উঠতি যুবক নষ্ট হয়ে গেলো, তা যেনো তাদের বাবা-মায়েরও অজানা। এখানে নিয়মিতই আসে তারা। সাদেক আসে, আসলাম আসে, তৌফিক, তুহিন ও সোহরাবও আসে। কিবরিয়া এবং জয়নাল মাঝে মাঝে আসে। প্রতিবেশি গ্রাম থেকে আসে যুবায়ের ও তরুণ। তরুণ এসবের নাটের গুরু। গুটিগুলোর সাপ্লাই ও-ই দেয়। প্রথম প্রথম দুয়েকদিন বিনে পয়সায় খাইয়েছে। এখন অবশ্য প্রত্যেকেই টাকা নিয়ে আসে। আর টাকা ছাড়া দেয়ও না তরুণ। তার এক কথা, মাদক লইয়া কোনো টেরিবেরি নাই। সুতরাং ফেলো টাকা গলাও মোম। টাকার জন্য তাই যুবকগুলো ভুল পথে যেতে থাকে। নিজের ঘরের মধ্যে ছোটখাটো চুরি করার পর আজ তারা স্বপ্ন দেখছে বড় কোনো দাও মারার। পরিকল্পনা করে, মাঠের ওপাশের ত্বলহা গ্রামে তারা
হামলা চালাবে। বুঝলি ভাই, এই পথ ছাড়া আমাদের আর গতি নাই। এহন টাকার ব্যবস্থা ত একটা করতেই হইবো। ঝিম মেরে পড়ে থাকে সাদেক, হা না কিছু বলে না। আসলাম আবার সুর উঁচায়, মাল তো শেষ; কি করাম আমরা? তুহিন, তৌফিক সায় দেয়, সুর মেলায় সোহরাব ও যুবায়ের। তরুণ পারে তো তখনই উঠে পড়ে। চল্ধসঢ়;, অস্ত্রশস্ত্র সব রেডি আছে। তুহিন সাদেকের হাত ধরে টানে। না, আমি যাব না, জবাব দেয় সাদেক। তুহিন সাদেকের কাঁধে এক গাঁট্টা মেরে বলে, আরে উঠতো শালা, এতো ন্যাকামি করিস না। সাদেক উঠে না, জড়ানো গলায় বলে, আজ যে আম্মুর পার্স থেকে দুই হাজার টাকা আনছিলাম, তা কি শেষ হয়ে গেছে? আসলাম বলে, কয় হাজারে দুই হাজার হয়, এ্যাঁ? আজ যে দুই হাজার টাকা আনছিলাম..আজ যে দুই হাজার টাকা আনছিলাম্ কথাটাকে সে কয়েকবার ভেঙচিয়ে বলে। তারপর বলে, শোন, ওই দুই হাজর টাকায় মাত্র চৌদ্দটা গুটি পাওয়া যায়, বুঝলি, চৌদ্দটা। আমরা এহানে মানুষ সাতজন। কয়টা করে পড়লো, ক? সাদেক কোনো কথা বলে না। তরুণ বলে, বুঝছি, এইভাবে কাজ হইবো না। অই শালারে ধর, হাত-পাও বাইন্ধা জঙ্গলের মধ্যে ফালাইয়া রাখ্। বিষাক্ত সাপ পোকার কামুড়ে হালায় রাতের মধ্যেই মারা পড়বো, ব্যাস্, আমাদের কাজের আর কোনো সাক্ষীও থাকবো না। অগত্যা উঠে আসে সাদেক। রাত দশটার দিকে তারা নদী-জঙ্গল-মাঠ পেরিয়ে রওয়ানা দেয় ত্বলহা গ্রামের দিকে। দলের মধ্যে অন্য সবাই পালিয়ে আসতে পারলেও ধরা পড়ে যায় সাদেক। উত্তমমধ্যমের এক পর্যায়ে শোনা যায় তার চোখ উপড়ে দেয়া হবে। যাই হোক, গ্রামে ডাকাতের আবির্ভাব টের পেয়ে যে মানুষটি সবচেয়ে প্রথম পুলিশকে ফোন করেছিলো, সেই মূলত বাঁচিয়ে দেয় সাদেককে।
পুলিশ এসে তাকে আধমরা অজ্ঞান অবস্থায় উদ্দার করে। থানায় এনে দুদিন চিকিৎসার পর তার জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারে তার বাবা-মাকে খবর দেয়া হয়েছিলো, তারা বলেছেন, এমন কুলাঙ্গার সন্তানের জন্য তারা আসবেন না। তো, পুলিশের মামলায় সাদেকের কারাবাস হয়। ছয় মাসের জেল। আজ তেইশ দিন। এই তেইশদিনে সাদেক একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছে, তার ভেতর কে যেনো কথা বলে। নিভৃত সময়গুলো সে তার নিজের ভেতরের মানুষটার সাথে কথা বলে কাটায়। বাবা-মা অবশ্য এসেছিলো, জেলগেইটে। গত পরশু দিন। তার কার্ডে কিছু টাকা রেখে গেছে। সাদেক সেখান থেকে ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে এটা-ওটা কিনে খায়। খুব সাধ হয় তার ইয়াবা খেতে, পুরান নেশা মাথার ভেতর চাঙর দিয়ে উঠে। কিন্তু এই চারদেয়ালে বন্ধি সে ইয়াবা টেবলেট পাবে কোথায়? আর পাওয়া গেলেও যা দাম! একজন বলেছে, ম্যাটকে বলিস, সে ব্যবস্থা করে দেবে। অবশ্য টাকাটা একটু বেশি নেয় সে। এক নম্বার চম্পা সুপার সাতশো টাকা পড়বো। দাম শুনে সাদেকের নেশার সাধ জিভেই মরে যায়। তার কার্ডে আছে বোধয় সর্বসাকুল্যে বারো শ’ টাকার মতো। বাবা মা আবার কবে আসে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। তবুও নিজের নেশার কাছে আরেকবার সে পরাজিত হয়। আজ বিকেলে গঙ্গাসেলের ম্যাটকে সে বিষয়টি আকারে ইঙ্গিতে জানায়। ম্যাট বলে, রাত বারোটার পরে দেখা করিস। দেখা হলে তারা দু’জন বেরিয়ে যায় পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে। অথবা পুলিশের সাথে ম্যাটের গোপন যুগসূত্র থাকায় পুলিশ হয়তো তাদেরকে কিছুই বলে না। ম্যাট তাকে নিয়ে কারাপুকুরের উত্তর পাড়ে নির্জন জায়গাটাতে বসে। খচ করে ম্যাচের কাঠি জালিয়ে দু’জনে মিলে শেষ করে একটি ইয়াবা ট্যাবলেট। খাওয়া শেষে বোনাস হিসেবে ম্যাট তাকে গাঁজার স্টিক থেকে কয়েকটান খাওয়ায়। বেশ ভালোই ধরেছে সাদেকের। মাথাটা কেমন যেনো ঝিমঝিম করছে। চারপাশের সবকিছু কেমন যেনো নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। সাদেক পকেট থেকে দুটো সিগারেট বের করে একটি এগিয়ে দেয় ম্যাটকে। অপরটি নিজে জ্বালিয়ে টানতে থাকে দুন্ধুমার। ছাই ফেলার সময় হয়, দু আঙ্গুলের ফাঁকে আটকে থাকা ফিল্টারটিতে টোকা দিয়ে সে নিজেকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা, আমার আর ছাইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?