ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বক্তব্য কতোটা যৌক্তিক

আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০১৯, ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


এ কথা আজকে কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না যে, পাকিস্তানি দুঃশাসন বিরোধী সংগ্রামে ছাত্র রাজনীতিক ভূমিকা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসে তা লিপিবদ্ধও হয়েছে। আজকে জাতি সে আন্দোলন-সংগ্রামকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টে পাকিস্তান সৃষ্টির আট মাসের মাথায় ভাইসরয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ যিনি নিজেও উর্দুভাষী ছিলেন না, যার মাতৃভাষা উর্দু নয়, তিনিও ১৮৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা এসে ঘোষণা দেন, “একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” তার এই অগণতান্ত্রিক ঘোষণার প্রথম প্রতিবাদ বাঙালি ছাত্র ও যুব সমাজই জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র ও যুবকেরাই প্রথম জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। রফিক-জব্বার-সফিক-বরকত-এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষাকারী ছাত্র-যুবক। এঁদের আত্মদানের মধ্যে দিয়ে জাতীয়তা বোধের জাগরণের সূচনা ঘটে। সেখানে কোনো বৃদ্ধ-বুদ্ধিজীবী কিংবা রাজনীতিক ব্যক্তিত্বের তালিকা নেই। ছাত্রদের এই ভূমিকা একটি জাতির নবজাগরণের পথ উন্মুক্ত হয়। ত্যাগের এই পথ বেয়ে সৃষ্টি হয় শিল্প-সাহিত্য, যার পরিচয় একান্তই প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষতার আলোয় উজ্জ্বল।
সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন ছাত্র সমাজ। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সাম্প্রদায়িক শিক্ষা বিরোধী তুখোর আন্দোলন গড়ে তোলেন ছাত্র সমাজ। ধর্মান্ধ হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত শিক্ষনীতি বর্জনের ঘোষণা দিয়ে দেশময় আন্দোলন গড়ে তোলেন ছাত্র সমাজ। তাদের এই আন্দোলনে দেশব্যাপি সুস্থ ধারার রাজনীতি এবং শাসন ব্যবস্থার প্রতি জনমতও বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোও পাকিস্তানের মোহ ত্যাগ করে ছাত্র ও যুব সমাজকে নিয়ে এগোতে শুরু করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে এই ছাত্র ও যুব সমাজই ছিলো মূল চালিকা শক্তি। নির্বাচনে জনসমর্থন বৃদ্ধির জন্যে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইতিহাস বিবেচনা করেছে। ১৯৬৬-তে আওয়ামী লীগের ছয় দফা এবং ছাত্রদের এগারো দফার আন্দোলন জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দেন ছাত্র সমাজ। পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনের সূচনাকারী ছাত্র সমাজ। উনসত্তরে ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবির আন্দোলনে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। এই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আসাদ-মতিউরের জীবনের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সতীর্থদের নিয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হন। কারাগারে আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দি অবস্থায় সেনানিবাসে গুলি করে হত্যা করা হলে তাৎক্ষণিক ছাত্র ও যুব সমাজ রাজপথে নেমে আসেন। সেই আন্দোলনে জীবন বিসর্জন দেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক ড. শমসুজ্জোহা। সত্তরের নির্বাচনে এবং একাত্তরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ছাত্র ও যুব সমাজের অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এটা সত্যি, আজকে ছাত্র রাজনীতি ছাত্র স্বার্থ সংরক্ষণ বিমুখতার সমান্তরালে কল্যাণ-কর্ম বিরোধী হয়ে উঠেছে। অথচ ছাত্ররাই ছিলেন স্বাধীন দেশ সৃষ্টির সূতিকাগার নির্মাতা। তারা ছাত্র-স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও অবদান রেখেছেন। আজকে কেনো এমনটা হলো? বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনার সময়ও ছাত্র রাজনীতি এতোটা কলুষিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে ছাত্ররা পরীক্ষায় বই দেখে লিখেছে। পাসও করেছে ৯৮ শতাংশ। কিন্তু মাত্র দু’বছরের মধ্যে সেই ছাত্র বই দেখে লেখা তো দূরে থাক, তাদের পরীক্ষা হলে সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়নি। খাতায় লিখুক বা না লিখুক নকল সঙ্গে থাকলেই বহিস্কার করা হয়েছে। কারণ কারো কাছে লাইসেন্সবিহীন পিস্তল আছে, কিন্তু কাউকে গুলি করেনি, তারপরও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনহীন পিস্তল বহন করা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। অবিকল পরীক্ষা হলে প্রবেশপত্র আর কলম পরীক্ষার্থি সঙ্গে রাখবে, কিন্তু বইয়ের পাতা বা হাতে লেখা কোনো কাগজের টুকরো কেউ বহন করতে পারবে না। পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশের আগেই রক্ষি বাহিনী পরীক্ষার্থীদের দু’বার শরীর তল্লাশি করে সিটে বসার অনুমতি দিয়েছে। কাগজ রাখার সুযোগ কোথায়! পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর ক্ষমতা দখল করে জনবিচ্ছিন্ন সামরিক বাহিনী। আমাদের দেশের সামরিক-পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। অবশ্য বিশে^র অন্য দেশেও তা-ই। কিন্তু তারা মানবিক কর্ম ও জনগণের কথা বিবেচনা করে। জনবিচ্ছিন্ন কোনো শক্তি যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তখন তাদের সমর্থক জোগাড় করতে হয়। কী ভাবে? অর্থ ও পদ-পদবি দিয়ে। এ ভাবেই জিয়ার সমর্থক হন নষ্ট রাজনীতিকেরা। তিনি ছাত্র-যুবকদের হাতে বই তুলে দেয়ার বদলে অস্ত্র আর অর্থ তুলে বিতরণ করে। নষ্ট রাজনীতিকদের পদ ও পদবি দিয়ে দলভুক্ত করেন। আইয়ুব খান এনএসএফ গঠন করেছিলেন। তাদের খুনি বাহিনী ছিলো। সেই বাহিনীল অন্যতম ঢাকার পাঁচ পাত্তু। পাঁচ পাত্তুর নাম শুনলেই অনেকেই ভয় পেতো। তাকে তার সঙ্গীরাই খুন করে। রাজশাহী শহরে এ রকম অনেক পাঁচ পাত্তু ছিলো। তাদের হাতে অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জিয়াও মশিউর রহমান যাদু মিয়া, এসএ বারী এটি, শাহজাহান সিরাজ, আসম রব, যুদ্ধাপরাধী ফজলুল কাদের চৌধুরী, তার পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, শাহ্ আজিজ, খান-এ সবুর খান প্রমুখ। পাকিস্তান থেকে ডেকে নিয়ে আসেন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম, ডা. আলীম হত্যাকারী মৌলানা মান্নান, মতিউর রহমান নিযামী, আব্বাস আলী, সোলায়মান আলী, মুজাহিদ, সাঈদী প্রমুখদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। পুনর্বাসিত হয়ে তারা প্রচণ্ড শক্তিধর হয়। শুরু করে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন। হত্যা-নির্যাতন আর লুটপাট। পুকুর-নদী লিজ নিয়ে মাছ চাষ। নদী ও রেলওয়েসহ সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ। অভি-নীরুর মতো সন্ত্রাসী কারা সৃষ্টি করেছিলো? অথচ এই দু’জনই ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তাদের মেধা ভালো কাজে কারা ব্যবহার করতে দেয়নি? সামরিক শাসকেরা। সাম্প্রদায়িকতার সমান্তরালে বাঙালির যা কিছু গৌরবময় অর্জন, তার বিরুদ্ধে নানা অপ-প্রচারে লিপ্ত ছিলেন অভির বড়ো ভাই বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শ্রেণি কক্ষে পর্যন্ত তিনি “বঙ্গবল্টু” বলেছেন। এ রকম মেধাবী শিক্ষক বিশ^বিদ্যালয়ে অনেক ছিলেন এবং আছেন। তাঁদেরই কেউ কেউ ‘বঙ্গবন্ধু’ চেয়ারেও বসেছিলেন। ছিলেন ইতিহাসের বিকৃতির সঙ্গে যুক্ত। জেনারেল এরশাদ-বেগম জিয়া দেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে আঁতাত করে এবং জোট বেধে রাজনীতি করেছেন। এখনো বিএনপি তাদের সঙ্গেই একাত্ম হয়ে পেট্রোল বোমা হামলা, দেশজুড়ে বোমা বিস্ফোরণ, শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা, রাস্তার গাছ কেটে বিক্রি করা, ২০০১-এ জাতীয় নির্বাচন পর কারা দেশময় পাকিস্তানিদের কায়দায় হত্যা-ধর্ষণ, লুটপাট আর জ¦ালাও-পোড়াও করে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো? যারা সে সময় জিয়া-এরশাদ-বেগম জিয়ার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে দেশ বিরোধী অপকর্ম করেছিলো, তারাই ক্ষমতার হাত বদল হলে সদ্য ক্ষমতাসীনদের তাদের অর্জিত অবৈধ অর্থ দিয়ে সরকারি দলে আশ্রয় নিয়েছে। আজকে আবরার হত্যা পর ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এটা কোনো শুভবুদ্ধির কথা নয়। বরং দুর্বোধ্য এবং আপনাদের নিজেদের অযোগ্যতা। সরকারি দলের কতিপয় লোভী-অসৎ এবং দুর্বৃত্তের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই এমন প্রতিবাদী ঘটনা বার বার ঘটছে। টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি কিংবা বদলি, পদ-পদবি বাগানোর লক্ষ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ দেয়া-নেয়া সবই করে যারা ক্ষমতবান তাদের ইন্টারন্যাল অংশগ্রহণের ফলে। শরীরে অসুখ, মাথা কেটে ফেলা কি বুদ্ধিমানের কাজ, নাকি যুক্তিসম্মত? অসুখ নিরাময় করতে প্রয়োজন প্রয়োজনীয় অসুধ। সে অসুধ দিলে আপন হোক আর পর হোক অসুখ থেকে নিস্কৃতি মিলবে। জাতিও স্বস্তি পাবে। আজকে সে আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। “দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন”-এর সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে খানিকটা আক্ষেপ আর খানিকটা প্রতিবাদের সুরে লিখেছিলেন, ‘ডিসি অফিস বালাখানা, ডিআইজি লম্পট-লুটেরা, ওসি গণধর্ষণের নেতা!’ এ দেশের কোনো কোনো বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ও ঘুসখোর-ফেনসিডিলখোরের আড্ডাখানা, তার দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যে স্থাপিত হয়েছে বিশ^বিদ্যালয়গুলোয়। ডিসিসহ যারা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করছেন তারাসহ চিকিৎসক, প্রকৌশলী-শিক্ষক-পুলিশ বলুন কে নন অনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে সরকার যদি এদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন, বিচার সম্পন্ন হতে কতোদিন লাগবে। আবরারকে যারা হত্যা করেছে, তারা চিহ্নিত, নিজেরা খুনের সঙ্গে যুক্ত বলে স্বীকারও করেছে। এদের বিচার দ্রুততম সময়ে শেষ করা যায় কিভাবে সে পথ দেশের জ্ঞানী-গুণিজনেরা পরামর্শ দিন। ক্ষমতাচ্যুত করে শাস্তি দিন ওই দুর্বৃত্তদের, যারা ফোনে ঘুসের অঙ্ক নিয়ে দরকষাকষি করেন, তাদের। যারা নিজ কার্যালয়কে “বালাখানা”য় পরিণত করে দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আমলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মহসীন হলে ১৯৭৪ সালে সাতজন ছাত্র খুন হন। খুনি ও নিহতরা প্রত্যেকেই যুবলীগের ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় খুনিদের বিচার করেছিলেন। সফিউল আলম প্রধানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে ক্ষমতা দখল করে প্রধানকে কারামুক্ত করে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিতে যুক্ত করেন। তারপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শুরু হয় সামরিক সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের তাণ্ডব। মেধাবী ছাত্রদের জিয়া “হিজবুল বাহার”-এ নিয়ে যান। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের তিনি কি মন্ত্র পাঠ করিয়েছিলেন যে, গোলাম ফারুক অভি, নীরুসহ অনেক মেধাবী ছাত্র সন্ত্রাসী হয়ে যান। তাহলে আজকে আবরার হত্যা তো পাঁচ পাত্তু থেকে অভি-নীরু হয়ে বুয়েট পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ পেয়েছে। এটা কি আমাদের ছাত্র রাজনীতির কম প্রাপ্তি নয়! জনবিচ্ছিন্নরা এ ভাবেই রাজনীতি নষ্ট করে, পচন ধরায়। জিয়া-এরশাদ সে কর্মে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। রাবি’তে শাহ্জাহান সিরাজ, জিয়াবুল, ঢাকায় ডা. মিলন হত্যা সে কথাই মনে পড়ে।