ছোটদের শীতের হাট

আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০১৭, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

কে.এইচ. মাহাবুব



ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। সুজলা সুফলা ফুলে ফলে ভরা আমাদের এই বাংলাদেশ। পাখপাখালির ডাক আর মুয়াজ্ঝিনের সুমধুর আযানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গে সবার। তাইতো লেখা হয়েছিলো: ‘এমন দেশটা কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/ সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’।
হেমন্ত ঋতুর শেষ না হতেই উত্তরের ঠা-া শীতল হিমেল হাওয়া গায়ে হালকা শীতের চোট লাগিয়ে আগাম জানিয়ে দেয় শীত ঋতুর কথা।
শীত ঋতুর কথা না বলেই নয়। এ ঋতুর সব থেকে জনপ্রিয় খেজুর গাছের রস। খেজুর গাছের রসে হয় হরেক রকমের পিঠা পুলি, আর সে সব পিঠা  পুলি খেতে কার না ভাল লাগে! বাড়ির সামনের ছোট যে খাল সে খালের পানি শুকিয়ে গেছে। এখন আর কোথাও কোন পানি নেই। বর্ষা ঋতুতে এ খালে পানি থাকলেও নৌকা চলেও শীত ঋতু এলে এ খালের কোথাও পানি থাকে না। আছে কিছু ঝোঁপঝাড়। আছে কিছু ঢেঁকি শাক, আছে কিছু কলমি গাছ। সেসব কেটে ফেলে এখানটা পরিষ্কার করেছে এক দল দুষ্ট ছেলে। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলো, এই এখানে তোরা এই সাত সকালে কী করিস?
ওরা বলল, আমরা এখানে হাট বসাবো।
হাট! কিসের হাট?
গরুর হাট।
এখানে দাঁড়িয়ে শীতের সকালের সূর্য ওঠা দেখা যায়। এখানে থেকে শীতের সকালে গায় মিষ্টি রোদ মাখানো যায়। শুনেছি আবার এই সকালের রোদে নাকি ভিটামিন থাকে- যা শরীরের জন্য খুবই দরকারি। এ গ্রামে কলাই শাক আর মুড়ি এই শীতের সকালে সবারই খুব প্রিয়। শীতের  সকালের রোদ গায়ে লাগিয়ে কলাই শাক আর মুড়ি খেয়েই বড়রা সবাই ক্ষেতের কাজে যায়। তাইতো এখানে দূর দূর থেকে প্রতিবারই দুষ্ট ছেলের দল এসে জোটে। শীতের সকালে মিষ্টি রোদ কার না ভাল লাগে! গাছি খেজুর গাছ কাটলেই সেখান থেকে খুঁজে নেয়া হবে পছন্দ মতো সুন্দর সুন্দর বাইল। গ্রামের ভাষায় খেজুর গাছের ডালকে বাইল বলা হয়। খেজুর গাছের বাইল দিয়ে সে সব দুষ্ট ছেলে সুনিপুণ কারুকাজ তৈরি করবে ছোট বড় ইন্ডিয়ান দেশি বিদেশি হরেক রকমের গরু। আর তাতে লাল নীল হলুদ কালো সব রকমের রং লাগিয়ে সে সব গরুকে অপূর্ব সাজে সাজানো হবে।
তাদের কেনা বেচা করার জন্য কাগজকে বানানো হবে টাকা। কাগজের সাইজ অনুযায়ী হবে সে সব কাগজের টাকার মান। আবার কখানো সিগারেট এর খোসা দিয়েও হয় টাকা। এখানে এক এক রকমের সিগারেট এর খোসার মান এক এক রকম টাকার মতো। যাদের সিগারেট-এর খোসা নেই কিংবা কাগজের টাকা নেই তারা আবার সত্যিকার টাকা দিয়েও সেসব গরু কিনে নিয়ে যান। আর  ছোটদের সে সব গরু রান্না বান্নার কাজের জন্য অনেক বড় মানুষ ও কিনে নিয়ে যান। এ গ্রামে খুব ভোরে মসজিদে আরবি পড়ানো হয়। শুধু এই গ্রামেই নয়, গ্রামের সব মসজিদেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আরবি পড়ানো হয়। এখানে যারা খুব সকালে আসে তারা অনেকেই আবার আরবি পড়া বাদ দিয়ে মসজিদ ফাঁকি দিয়ে এখানে এই গরুর হাটে এসেছে। আবার কেউ কেউ আরবি পড়া শেষ করে এসেছে। খালের কূল ঘেঁসেই মানুষের হাটার রাস্তা। এ পথ দিয়েই মসজিদে আরবি পড়ান যে ইমাম তিনি তার বাড়িতে যাবেন। যারা আরবি পড়া ফাঁকি দিয়েছিলো সেসব ছেলে মসজিদে আরবি পড়ানো ইমামকে দেখে দৌড়ে পালায়। তখন তাদের পালাতে দেখে ইমাম সাহেব জোড় গলায় বলেন, আজকে দেখে গেলাম, কালকে পড়তে না গেলে মাইর একটাও মাটিতে পরবে না। কালকে পড়তে না গেলে তোদের  সবাইকে  ধরে নেয়া হবে। এই রাজু সাজু তোরা সবাই কালকে বেতের লাঠি বানিয়ে নিয়ে যাবি। আমি দেখবো কার লাঠি সব থেকে ভাল হয়, কার লাঠিতে সব থেকে বেশি ব্যথা পাওয়া যায়। যার লাঠিতে যতো বেশি ব্যথা তার জন্য ততো বেশি বিস্কুট। মনে থাকে যেনো!
আচ্ছা  হুজুর মনে থাকবো।
মসজিদের ইমাম সাহেব চলে গেলেন। আজকের আরবি পড়া শেষ করে এলো যারা, তারা, যারা যায়নি তাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে একে অপরকে বলতে লাগলো, আমাগো পুকুরপাড় বড় বড় আডাইলা গাছ আছে তাও আবার অনেক মোটা মোটা। আমি গিয়ে এখনই একটি লাঠি বানাবো ।
আরেকজন বলল, আমাগো বাড়িতেও আছে। আমিও বানাবো।
আরেকজন বলল, আমিও বানাবো, দেখি কারটা কতো ভাল হয়? দেখবো কারটাতে কতো ব্যথা পাওয়া যায়।
ঠিক আছে তবে তাই হবে।
ঠিক আছে।
গ্রামে আঠাইলা গাছ একটি অতি দরকারি গাছ। এ গাছ দিয়ে কবিরাজরা অনেক কবিরাজি চিকিৎসা করে থাকেন। এছাড়াও গ্রামে অতি পুরনো একটি প্রচলন এখনও বিদ্যামান আছে। কারো বাড়িতে শিশু জন্ম নিলে এই আঠাইলা গাছ কেটে নিয়ে ঘরের বেড়ায় আটকে রাখা হয়, তাতে নাকি শিশুর রোগ ব্যাধি কম হয়। তা যা-ই হোক, পৃথিবীর সকল গাছেরই কোন না কোন গুণ তো অবশ্যই আছে, এটা কেউ বিশ্বাস না করলেও আমি শত ভাগ বিশ্বাস করি।
পড়তে যাওয়া সেসব ছেলের কথা শুনে অন্য ছেলেরা তখন বলে উঠলো, এক মাঘে শীত যায় না। দিন কিন্তু আরো আছে, সেদিন কিন্তু আমরাও তেমনি বড় বড় মোটা মোটা লাঠি নিয়ে হুজুরের কাছে যাবো। তোরা যেমন লাঠি নিবি আমরাও ঠিক তেমন লাঠি নেবো।
ওদের কথা শুনে পড়তে যাওয়া ছেলেরা তখন একে অপরকে বলল, আমরা এমন লাঠি নেবো যেনো জোরে বাড়ি দিলেই একটু ও ব্যথা না লাগে, ব্যথা পাওয়া না যায়। হুজুরকে বলবো হুজুর এর থেকে ভাল লাঠি পাওয়া যায়নি।
ওরা আসলে এমন করেই একে অপরকে বাঁচিয়ে নেয়। কারণ ওরা জানে, যে কোন একদিন যখন আমরা পড়তে যাবো না, তখন তো আমাদেরও হুজুর এমনি করে মারবে, তখন আমরা কি করবো। তার থেকে আমরা সবাই মিলে যাই। মিলে যাই সবাই সবার প্রাণে প্রাণে।
এখনো আছে দিন। এখনো আছে রাত। এখনো আছে শীতের সকাল। এখনো নিয়ে আসে সূর্য-সকালের মিষ্ট রোদ। নেই শুধু মানুষের মনুষত্ব। দিনে দিনে মানুষের অর্থ সম্পদের লোপ বাড়ছে। কারো সময় নেই এক মিনিট ফেলে দেয়ার। গাছিরা এখন আর খেজুর গাছ কেটে সময় নষ্ট করতে চায় না। দুষ্ট ছেলের দল গুলো তাইতো শীতের সকালে মিষ্টি রোদে গরুর হাট বসানো ভুলেই গেছে। সেসব আজ শুধুই স্মৃতি।