ছোটোগল্প বিচ্ছু

আপডেট: জানুয়ারি ৩, ২০২০, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

শরীফ উদ্দীন


স্বাস্থ্য দেশী মুরগীর মতো। ওজন কম, শক্তি বেশী। কথা শেখার পর থেকেই কোনো কিছুর বায়না ধরলে, না নিয়ে ছাড়ত না। কথায় ভুলিয়ে ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করলে ধরে ফেলত। এজন্য প্রথমে মা আদর করে ডাকত বিচ্ছু। মায়ের দেখাদেখি চাচা-চাচি, আত্মীয়-স্বজন। এক সময় খেলার সাথীরাও বিচ্ছু নামে ডাকা শুরু করে।মায়ের দেয়া নামটি বিচ্ছু অবজ্ঞা করেনি বরং আনন্দচিত্তে মেনে নিয়েছে। ক্লাসের প্রথম দিন আমি তার নাম জিজ্ঞাসা করলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই উত্তর দিয়েছিল, ‘আমার ডাক নাম বিচ্ছু। ভাল নাম মো. তবিবুর রহমান।’ দ্বিতীয় ক্লাসে উপলব্ধি করলাম, মায়ের দেয়া বিচ্ছু নামটি বৃথা যায় নি। অন্যদের খাতায় টিক চিহ্ন দিয়ে পার পেলেও বিচ্ছুর বেলায় উপায় নেই। তার ক্লাস খাতায় প্রতিদিন নম্বর দেয়ার পাশাপাশি মন্তব্য লিখতেই হবে। এ বিষয়ে বিচ্ছু নাছোড় বান্দা। আজ অবধি আমার কোনো সহকর্মী বিচ্ছুর খাতায় মন্তব্য না লিখে একদিনের জন্যও পার পেয়েছে এমন কথা কানে আসেনি। আমি নিশ্চিত, আসবেও না। এক সময় ছাত্রদের শখ ছিল ডাক টিকিট সংগ্রহ করা। এখন ছাত্ররা ইন্টারনেট গেম সংগ্রহ করে কিন্তু আমার ধারনা বিচ্ছুর প্রধান ও একমাত্র শখ ক্লাস খাতায় শিক্ষকের মন্তব্য সংগ্রহ করা। তা ভালো হোক, আর মন্দই হোক। তাতে বিচ্ছুর কিছু এসে যায় না। ক্লাসে যে বিষয়ের সংজ্ঞা লিখতে দিয়েছি তার উত্তর আমার কাছে খালি চোখে তো দূরের কথা, চশমা চোখেও ঝাপসা। যাকে বলে মহা ঝাপসা। কারো খাতায় টিক চিহ্ন না দিয়ে চোখ বুলিয়েই ফেরত দিচ্ছি। এবার সামনে খাতা হাতে বিচ্ছু। বিচ্ছুর খাতা বলে কথা! টিক চিহ্ন, নম্বর, মন্তব্য সবটাই নিয়ে ছাড়বে। বিচ্ছুর উত্তর পড়া মাত্র আঁৎকে উঠলাম। একবার খাতার দিকে, আরেকবার বিচ্ছুর মুখের দিকে তাকাচ্ছি। আমার দেরি দেখে বিচ্ছু বলল, ‘স্যার, তাড়াতাড়ি করেন। ছুটির ঘণ্টা দিয়ে দিবে।’ বিচ্ছু ছুটির কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই মনে মনে বললাম, ‘বাঁচিয়ে দিলি, বাপ।’ ছুটির ঘণ্টার অপেক্ষায় বিচ্ছুর বাবার নাম, চাচার নাম, দাদার নাম ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে সময় নষ্ট করতে শুরু করলাম। সোম, মঙ্গল, বৃহস্পতি এই তিন দিন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ ক্লাস। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ক্লাস। আমি ওস্তাদ আর আমার ছাত্ররা সাগরেদ। আমরা ওস্তাদ-সাগরেদ মিলে দশ মিনিট সময় চুরি করে ক্লাসটি পয়ত্রিশ মিনিট করে নিয়েছি। পয়ত্রিশ মিনিট পার হলেই বই ব্যাগে ভরে চুরি করা দশ মিনিটে সবাই মহানন্দে জীবনের পাঠশালার চেনা পথের অচেনা গলিতে ঘুরে বেড়াই। আমরা এই দশ মিনিটের ক্লাসের নাম দিয়েছি যাযাবর। পয়ত্রিশ মিনিটের ক্লাসের দুর্বলদের অনেকেই এই যাযাবর ক্লাশে তুখোড় ছাত্র হয়ে উঠে। একদিন যাযাবর ক্লাসে জব্বার জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার, সিআইপি কাদেরকে বলা হয়?‘ আমার উত্তর শুনে জব্বারের পাশ থেকে রাহাত উঠে দাঁড়িয়ে মন্তব্য করল, ‘স্যার, অনেক সময় বড় বড় গার্মেন্টসের মালিকরাও সিআরপি উপাধি পেয়ে থাকেন। তাহলে যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিন্দু বিন্দু ঘামের বিনিময়ে মিলিয়ন মিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তাঁদেরকেও সম্মান জানিয়ে একটা উপাধি দেয়া উচিত।’ রাহাতের কথায় ক্লাসের সবাই বলে উঠল, ‘অবশ্যই উপাধি দেয়া উচিত।’ গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতি ফোঁটা ঘামকে স্বর্ণের ন্যায় দামি সম্মান দিয়ে ওরা নিজেরাই গার্মেন্টস শ্রমিকদের উপাধি দিল, ’গোল্ড কয়েন’।

যে মেয়েটি ক্লাসে সব সময় চুপচাপ থাকে, যাকে কোনদিন ইস্ত্রি করা ড্রেসে দেখিনি সেই রাবেয়া সেদিন আনন্দে লাফিয়ে উঠে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ’স্যার, আমার মা তাহলে গোল্ড কয়েন?’ এরপর বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আনন্দে এরা আমাদের দেশের কৃষকদের উপাধি দিল গ্রীন চাইল্ড, বন্ধু আনিসের বাবার মত প্রবাসী শ্রমিকদের নাম রাখল হীরক কণা। রাবেয়ার মায়ের প্রমোশন হয়নি, বেতন বাড়েনি, রাবেয়ার নতুন ড্রেস হয়নি শুধু সহপাঠীরা ওর মায়ের পেশাকে সম্মান দিয়েছে তাতেই রাবেয়ার চোখে সে কি আনন্দ! আমাদের ছেলে-মেয়েরা কত অল্পতে খুশী! এ ক্লাসে বিতর্কের দুটি দল আছে। একটি দলের দলনেতা সৌমিক। অপরটির ওবায়দুল্লাহ। সৌমিক যখন যুক্তি খণ্ডন করে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় তখন নাকি ওবায়দুল্লাহর মনে হয় ভীমরুলে হুল ফুঁটাচ্ছে। তাই ওবায়দুল্লাহ বন্ধু সৌমিকের নাম দিয়েছে ভীমরুল। আমিও ক্ষেত্র বিশেষে, ভীম নামে ডাকি। সৌমিক প্রথমে শুরু করল, “স্যার, সুশীল শব্দের বিপরীত শব্দ কী?’ আমি গতানুগতিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলাম, ‘সুশীল শব্দের বিপরীত শব্দ হচ্ছে কুশীল অর্থাৎ অসভ্য, কুৎসিত, অসুন্দর।’ আলামত ভালো না। সৌমিক জানা প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞাসা করছে। বুঝতে পারছি, ও এখন সৌমিক থেকে ভীম হবে। উত্তর জানা সত্ত্বেও সৌমিকের দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘স্যার, বরিশালের আরজ আলি মাতুব্বর দ্বিতীয় শ্রেণি অবধি পড়েছেন। তিনি শিক্ষিত নাকি অশিক্ষিত?’ সৌমিকের মতিগতি টের পেয়ে ওবায়দুল্লাহ সৌমিককে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আরজ আলি মাতুব্বরের লেখা ‘সত্যের সন্ধানে’ বইটির ইংরেজি ভার্সন

‘ Question of the truth’ বিশ্বের নামকরা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। এখন তুই আমাদের বল, আরজ আলি মাতুব্বর শিক্ষিত না-কি অশিক্ষিত?‘ ওবায়দুল্লাহর পাল্টা প্রশ্ন করার ধরন দেখে কয়েকজন হেসে উঠল কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সৌমিক বলে চলল, ‘আজকাল টিভিতে টকশোর অনেক বক্তা প্রায়ই কথায় কথায় ‘আমরা যারা সুশীল সমাজে বাস করি’ বলে নিজের কথা শুরু করেন। মাঝে মাঝে সুশীল সমাজের সমাবেশ ও মত বিনিময় সভা হতে দেখি।’ তারপর একটু থেমে আমাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার, সমাজের এক অংশ যদি সুশীল সমাজ হয় তাহলে অপর অংশ নিশ্চয় কুশীল সমাজ?’ সৌমিক এখন ভীম। আমি বললাম, ’ ভীম, তুই বলে যা।’ সৌমিক আবারও শুরু করল, ‘ উনারা তো সুশীল সমাজ। আমার প্রশ্ন, কুশীল সমাজ কারা?’ সৌমিক আমাকে গ্যাঁড়াকলে ফেলে দিয়েছে । সৌমিকের প্যাঁচে পড়ে কি উত্তর দিব ভাবছি।
আমাকে নিরুত্তর দেখে ওবায়দুল্লাহ সাহায্য করতে এগিয়ে এসে বলল, ’তাহলে কি স্যার, কুশীল বলতে তাঁতী, জেলে, দোকানদার, কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিকভ’ ওবায়দুল্লাহ গার্মেন্টস শ্রমিক শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে রাবেয়ার চোখে আমার চোখ পড়ল। রাবেয়া করুণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে ইশারায় না না বলছে। রাবেয়ার করুণ চোখের আর্তিতে নিজের চোখ ঝাপসা না হয়ে যায় সেই ভয়ে রাবেয়ার চোখের সবটুকু ভাষা না পড়ে শুষ্ক ঠোটে স্নেহের হাসি দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।

ওবায়দুল্লাহকে ধমক দিয়ে বললাম, ‘কি আবোল-তাবোল বকছিস?‘ আমার ধমক খেয়ে ওবায়দুল্লাহ বসে পড়ল। আমার ছাত্ররা যে রাবেয়ার মা, মতিনের দাদা, আনিসের বাবার ঘামকে সম্মান জানিয়ে গোল্ড কয়েন, গ্রীন চাইল্ড, হীরক কণা উপাধি দিয়েছে তাঁরা কখনো কুশীল সমাজ হতে পারে না। এদেরই শরীরের ঘাম আমাদের দেশকে ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এ উন্নীত করেছে। উচ্চপদস্থ অফিসারের মাকে রেল স্টেশনে ফেলে যাওয়ার খবর পড়েছি। চলৎ শক্তিহীন মাকে প্রতি সপ্তাহে ডালিতে করে মাথায় নিয়ে সাত কিলেমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে উপজাতি যুবকের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ছবি পেপারে দেখেছি। অনুভব করলাম, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ঢোকার পূর্বে সুশীল-কুশীলের কিম্ভূত গলিতে একবার আমাকে একাই ঘুরে আসতে হবে। অন্যথায়, হোঁচট খেয়ে উল্টে পড়ে এদের সামনে বেইজ্জত হবার ঝুঁকি আছে। এজন্য আমার সময় দরকার। বাড়িতে এ বিষয়ে পড়ালেখা করতে হবে। সুশীল-কুশীলের আলোচনা থামিয়ে দেয়ার উছিলা খুঁজে বের করলাম। সবাইকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর মুখে বললাম, ‘কুশীল সমাজ বলতে কাদের বোঝায় সে ফায়সালা পরে হবে। এখন সুশীল সমাজ সম্পর্কে তোদের নিজেদের যার যেমন ধারণা তার আলোকে সুশীল সমাজের সংজ্ঞা লিখে আমাকে দেখা।’
বিচ্ছুর দাদার বংশের ইতিহাস জেনে নানা বাড়িতে যাওয়ার পথে ছুটির ঘণ্টা পড়ল। সবাই ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উশখুশ করছে কিন্তু বিচ্ছু নির্বিকার। ’স্যার, নম্বর দিয়ে মন্তব্য লিখবেন, না?’- বিচ্ছুর প্রশ্ন। বিচ্ছুকে কথা দিলাম, আগামি ক্লাসে ওর খাতায় মন্তব্য লিখব। ছাত্রদের চলে যেতে বলে আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার জীবনে এই প্রথম বিচ্ছু মন্তব্য বাকি রাখতে রাজি হলো। গত তিন দিন অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার অনুর্বর মস্তিষ্ক ফরাসি, রুশ, চীন, কিউবা বিপ্লব কিংবা লুঙ্গি পরে অস্ত্র হাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের উদ্দেশ্যের সাথে সুশীল-কুশীলকে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হল। দুদিন পর আবার যাযাবর ক্লাস। হয়ত উল্টা-পাল্টা বুঝ দিয়ে সুশীল-কুশীলের আলোচনা ধামাচাপা দিয়ে দিব কিন্তু বিচ্ছু? বিচ্ছুর খাতায় কি মন্তব্য লিখব? বাল্যকালে মাথা চুলকিয়ে বুদ্ধি বের করে মাকে অনেক মিথ্যা অজুহাত দিয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগল না। মাথা চুলকানোর সাথে সাথে সারা শরীর চুলকিয়ে ঘা করে দিলাম কিন্তু বিচ্ছুর জন্য কোনো মন্তব্য মাথায় এলো
না। আমি জানি, আগামি ক্লাসে বিচ্ছু তার খাতা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে, ‘স্যার, মন্তব্য?’ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিচ্ছুর খাতা বিচ্ছুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলব, ‘আমি পারলাম না। তুই আমাকে মাফ কর, বিচ্ছু।’ নিজের ধারণার আলোকে সুশীল সমাজের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিচ্ছু খাতায় লিখেছিল, ‘মেহনতি মানুষের শরীরের ঘামের গন্ধের ভয়ে যারা নাকে রুমাল দেয় তারাই হচ্ছে সুশীল সমাজ।’