ছড়ায় ছড়ায় স্বাধীনতা

আপডেট: মার্চ ২৫, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

রুমান হাফিজ



‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনল যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না’। মার্চ মাস! এক আগুন ঝরার মাস। স্বাধীনতা অর্জনের মাস। লক্ষ প্রাণের আত্মত্যাগের মাস।
অনেক সাধনা ও সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালে আমরা একবার স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম। কিন্তু সেই স্বাধীনতা আমরা সঠিকভাবে পাইনি। স্বাধীনতা পেয়েও আমরা আমাদের অধিকারগুলো অর্জন করতে পারিনি। আমাদের যারা মূল শাসক ছিল তারা আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে, আমাদের ন্যায় নিষ্ঠ অধিকার হরণ করেছে। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা যে সত্যিকারের স্বাধীনতা ছিল না তা আমাদের বুঝতে খানিক সময় লেগেছিল।
অবশেষে আমরা বুঝতে পারলাম এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম শুরু করলাম। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর। মধ্যখানের ৯টি মাস ছিল গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ। সত্যিকারের স্বাধীনতা পেতে আমাদের একটু সময় লেগেছিল। যুদ্ধ, রক্ত, সংগ্রাম আর বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা। এই লাল সবুজের পতাকার মূল্যও তাই এতো বেশি।
স্বাধীনতার ছোঁয়া আমাদের সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। সাহিত্য রচনা ও চর্চায় নতুন-এর চিন্তা চেতনার জন্ম দিয়েছে বটে। ছড়া-কবিতা,গল্প- উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ সহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় এ চেতনাকে তুলে ধরেছেন আমাদের কবি সাহিত্যিকগণ। আলোচ্য নিবন্ধে স্বাধীনতার প্রভাব নিয়ে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কয়েকজন ছড়াকারের ছড়া তুলা ধরা হলো:
পরাধীনতার শৃঙ্খল গুড়িয়ে দিয়ে বাংলার বীর সেনারা রক্ষা করে দেশের স্বাধীনতা। সেই বিজয়ের চিত্রকে দুই বাংলার জনপ্রিয় ছড়াকার অজিত রায় ভজন তুলে ধরেছেন এভাবে-
উড়লো নিশান খুশীর দিনে
আনলো বিজয় মূল্য বিনে।
দেখলো জগৎ হাসলো সবে
এমন বিজয় ঘটলো ভবে।
লক্ষ হাজার মায়ের সোনা
কত্ত বোনের স্বপ্ন বোনা।
আশার স্বপন হারিয়ে গেল
স্বস্তি যে এই মুক্তি এলো।
বীরের জাতি বাঙালিরা সব সময়ই ছিল স্বাধীনচেতা। কিন্তু পাক শাসকেরা আমাদেরকে তাদের কেনা গোলামের মতো ভাবতে শুরু করলো। ছড়া জগতের আলোকিত মুখ ছড়াকার আহাদ আলী মোল্লার উচ্চারণ তেমনি-
আমরা যেন কেনা গোলাম
পাক শাসনে গেলাম মলাম
প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হলাম
ছড়ালো তার রেশ,
তখন কেবল কিশোর ছিলাম
অস্ত্র হাতে তুলে নিলাম
পাক বাহিনী হটিয়ে দিলাম
স্বাধীন হলো দেশ।
দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ছাত্র-যুবক, কৃষক-মজুর, জেলে-তাঁতি, কামার-কুমার তথা আপামরজনসাধারণ অংশ নেয় অস্ত্র হাতে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে। ছড়াকার সিরাজ উদ্দিন শিরুলের ছড়ায় স্বাধীনতার দোলা লক্ষ করা যায় এভাবে-
মিছিল ছিলো লাল সবুজের
মিছিল ছিলো যুদ্ধকালীন,
মিছিল ছিলো মায়ের বোনের
নিজের ঘরেই রুদ্ধকালীন।
মিছিল ছিলো রাজপথেতেই
মিছিল ছিলো স্বদেশ জুড়ে,
মিছিল ছিলো স্বাধীন হওয়ার
উঠলো জেগে জোয়ান বুড়ে।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশ। সন্তানহারা হাজারো মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে আজও ভারি হয়ে উঠে বাংলার আকাশ-বাতাস। প্রতিশ্রুতিশীল লেখক প্রত্যয় হামিদের স্বাধীনতার ছড়ায় সেই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাইÑ
একটা ছড়া স্বাধীনতা
যেই না ভাবে দরকার,
অমনি আরো হিংস্র হলো
মত্ত পাকি সরকার!
ছড়া জানে, ওদের সাথে
সুর বাঁধা আর যায় না,
রোদের মতই পষ্ট তখন
সুর তারা নয়- হায়না!
হায়েনাদের করতে নাশ
গর্জে ওঠে ছড়া,
শত্রুরা সব বুঝল এবার
জবাব পাবে কড়া!
যুদ্ধ শেষে সেই ছড়াটাই
বাংলা মাটি মায়া,
শব্দ-সুরে ছন্দ ছড়ায়Ñ
মায়ের শীতল ছায়া!
২৫ মার্চ গভীর রাতে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালিদের উপর অতর্কিত হামলা চালায় পাক বাহিনী। ইতিহাসের জঘন্যতম এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করে সেদিন। ছড়াকার রোদেলা শিশির তার স্বাধীনতার ছড়ায় অনুভূতিটা ব্যক্ত করেন তেমনিভাবে-
সেদিন ছিল পঁচিশে মার্চ
গভীর কালো রাত্রি,
মায়ের কোলে ঘুমিয়েছিলো
দামাল ছেলের যাত্রি।
২৬শে মার্চ সারা দেশে
তুমুল শোকের ঝড়ে,
শূন্য হৃদয় খাঁ খাঁ করে
বাংলা মায়ের ঘরে।
পাক শাসকেরা আমাদেরকে একরকম খাঁচা বন্দি করে রেখেছিল। জনপ্রিয় ছড়াকার লুৎফুর রহমান-র ছড়ায় সেই চিত্রটাই উঠে এসেছে-
খাঁচায় পাখি নাচ্ছিলো
স্বাধীনতা চাচ্ছিল,
গাছের উপর পাখ ছিল
কিচির মিচির ডাক ছিল।
পাক বাহিনী নামলো
সকল কিছু থামলো,
দেশের ছেলে জাগলো
পাক হানারা ভাগলো
দেশটা স্বাধীন হতেই তবে
দীর্ঘ নমাস লাগলো।
স্বাধীনতা অর্জন ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিলনা তখন। কাক্সিক্ষত সেই স্বাধীনতা পেয়ে বাংলার আপামর জনতা যে সুখ অনুভব করেছিল সেই চিত্রকে ছড়াকার আবু সাইদের ছড়ায় প্রতিফলিত হয়েছে এরকমÑ
ওই যে পাখি উড়ছে দেখ
নীল আকাশের বুকে,
উড়ছে তারা ইচ্ছে মতো
স্বাধীনতার সুখে।
মায়ের ভাষায় বলছি কথা
ভরছে হৃদয় বুক,
এই আমাদের স্বাধীনতা
এই আমাদের সুখ।
তরুণ লেখিয়ে মুয়াজ বিন এনামের স্বাধীনতার ছড়ায় দেখতে পাই-
স্বাধীনতা আমাদের
খুব জানি চাওয়া ছিলো,
ঘাতকের হাতে কতো
শত মার খাওয়া ছিলো।
বিধাতার কাছ থেকে
বড় কোন পাওয়া ছিলো,
বিষাদের সুরে গান
গুঙ্গিয়ে গাওয়া ছিলো।
মা-বোনের চোখে পানি
সর্বদা বাওয়া ছিলো,
রক্তের ঘ্রাণে ঘ্রাণে
বিজয়ের হাওয়া ছিলো।
তানিশা চৌধুরী লিখেছেন-
স্বাধীনতা স্বাধীনতা
এর সাথে যে মনে পড়ে
একাত্তরের কথা।
কেউ হারালো বাবা,মা আর
কেউ হারালো ভাই,
সব হারিয়ে নিঃস্ব কেহ
কেউ বেঁচে আর নাই।
কত্ত মানুষ রক্ত দিলো
প্রাণ দিলো আর কতো,
দেশকে যারা করলো স্বাধীন-
শ্রদ্ধা অবিরত।
নবীন লেখিয়ে জাহিদ সজলের ভাবনা এরকম-
স্বাধীনতা আমার দেশের
একটি তাজা ফুল,
রক্ত দিয়ে,জীবন দেয়াÑ
সতেজ আঁকা তূল।
স্বাধীনতা বাংলা মায়ের
চোখের দামী জল,
শহীদ ভাইদের বিসর্জনের
শাশ্বত ফলাফল।
স্বাধীনতার অর্থ শুধু স্বাধীনভাবে চলাই নয়,বরং আত্মমর্যাদার সাথে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার নামই স্বাধীনতা।
এই দেশকে আমরা বহু ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন করেছি। আর এই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা যেন আমাদের এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ভুলে না যাই। সবাই মিলে আমাদের এই লাল সবুজের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। বিশ্বের বুকে আমাদের দেশের সম্মান আরও বৃদ্ধি পাবে। দেশটা হোক অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা। স্বাধীনতার মাসে এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।