‘জঙ্গি আস্তানায়’ ৭ জনের খুলি, বিস্ফোরণে মেঝেতে গর্ত

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ঢাকার মিরপুরে দুদিন ধরে ঘিরে রাখা জঙ্গি আস্তানায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণের পর ধ্বংস্তূপে তল্লাশি চালিয়ে সাতজনের খুলি ও পোড়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাওয়ার কথা জানিয়েছে র‌্যাব।
সোমবার রাতের ওই বিস্ফোরণের কারণে ছয় তলা ভবনটির পঞ্চম তলার মেঝেতে সৃষ্টি হয়েছে চার বর্গফুট মাপের একটি গর্ত, যেখান দিয়ে চতুর্থ তলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে ওই ভবনে তল্লাশির পর র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বিকালে সাংবাদিকদের সামনে এসে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ছয়তলা ভবনটির নিচ থেকে তল্লাশি চালিয়ে পঞ্চম তলা পর্যন্ত পৌঁছেছে র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, ডগ স্কোয়াড ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা।
“জঙ্গি আবদুল্লাহ যে বাসায় ছিল, সেখানে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সাতটি স্কাল দেখে আমরা মনে করছি, সাতজনের লাশ সেখানে রয়েছে। জঙ্গি নিজেই বিস্ফোরণ ঘটায় এবং তাতে তারা নিহত হয়।”
র‌্যাবের ধারণা অনুযায়ী, ওই সাতজন হলেন সন্দেহভাজন জেএমবি সদস্য আবদুল্লাহ, তার দুই স্ত্রী নাসরিন ও ফাতেমা, তিন থেকে নয় বছর বয়সী দুই ছেলে ওমর ও ওসামা এবং আবদুল্লাহর দুই কর্মচারী, যাদের নাম জানা যায়নি।
বেনজীর বলেন, সাতটি খুলি দেখে শনাক্ত করা গেলেও অধিকাংশের দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কারও কেবল হাড় দেখা যাচ্ছে।
এসব মৃতদেহ থেকে ডিএনএ ও নমুনা সংগ্রহ করে ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান।
তিনি বলেন, ওই ফ্ল্যাটে পেট্রোল ও একটি কার্টন পাওয়া গেছে; সেখানে আরও বোমা থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে আবার অনুসন্ধান শুরু হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।
সকালে তল্লাশি শুরুর পর পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যান।
আত্মসমর্পণের প্রতিশ্রুতি, তারপর ‘আত্মঘাতী’
টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় সোমবার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ‘জেএমবির জঙ্গি’ দুই ভাইকে ড্রোন ও দেশীয় অস্ত্রসহ আটকের পর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেদিন মধ্যরাতে মিরপুরে এই অভিযান শুরু করে র‌্যাব।
মাজার রোডের পাশে বর্ধনবাড়ি ভাঙ্গা ওয়ালের গলির ২/৩-বি হোল্ডিংয়ে ছয় তলা ওই ভবনের ২৪টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২৩টি থেকে ৬৫ জনকে সরিয়ে নেয় র‌্যাব। মঙ্গলবার ভোরেই ভবনের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার সারাদিন র‌্যাবের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করে আবদুল্লাহকে আত্মসমর্পণে রাজি করানোর চেষ্টা চলে। সন্ধ্যায় জানানো হয়, আবদুল্লাহ রাজি হয়েছেন এবং রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করবেন বলেছেন।
কিন্তু সন্দেহভাজন ওই জঙ্গি র‌্যাব সদস্যদের আরও আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখেন। রাত পৌনে ১০টার দিকে ভবনটিতে বিকট শব্দে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। পরে আরও কয়েকটি ছোট বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ পাওয়া যায়।
বিস্ফোরণের পর ছয়তলা ভবনের পঞ্চম তলায় ‘জঙ্গিদের’ ফ্ল্যাটে আগুন ধরে যায়। আগুনের কুণ্ডলিতে আশপাশের এলাকা আলোকিত হয়ে ওঠে; এলাকাবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
র‌্যাবের চারজন সদস্য ওই সময় স্প্লিন্টারে বিদ্ধ হন। তবে তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে রাতেই জানান মুফতি মাহমুদ।
কক্ষ এখনও তপ্ত
বুধবার বিকালে সাতজনের দেহাবশেষ পাওয়ার পর র‌্যাব মহাপরিচলক বেনজীর আহমেদ ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
তিনি জানান, প্রথম যে বড় বিস্ফোরণটি ঘটানো হয়, তাতে পঞ্চম তলার মেঝেতে দুই ফুট বাই দুই ফুট আকারের গর্ত সৃষ্টি হয়। ওই গর্ত দিয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে।
“এসিড, পেট্রোল ও বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি ওই বোমার বিস্ফোরণ ছিল ভয়াবহ। থাই গ্লাসগুলো ভেঙে স্প্লিন্টারের মত ছিটকে গেছে। আমরা যে নিরাপদ দূরত্ব ঠিক করেছিলাম, তা পার হয়ে আরও পাঁচশ মিটার স্প্লিন্টার ছড়িয়েছে।”
বেনজীর জানান, বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ডের কারণে পাঁচ তলার ওই ফ্ল্যাটের কক্ষগুলো বিকাল ৪টা পর্যন্ত তপ্ত হয়ে ছিল। তখনও তাপমাত্রা ছিল ৫৫ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানি দিয়ে তাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আলামত নষ্ট হয়ে যাবে বলে কিছু জায়গায় পানি দেওয়া যাচ্ছে না।
“পাঁচ ও চারতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফ্ল্যাট দুটো আর ব্যবহার করা যাবে কিনা তা প্রকৌশলী দিয়ে দেখিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
ফায়ার সার্ভিসের উপ পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বুধবার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাতে ওই বিস্ফোরণের পর আগুন নেভাতে তাদের আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ধরন দেখে তাদের মনে হয়েছে ওই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে রাসায়নিক ব্যবহার করে।
রাত সোয়া ২টার দিকে ওই ভবনে আবারও দুটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। পড়ে থাকা কোনো বিস্ফোরক উত্তাপে বিস্ফোরিত হওয়ায় ওই শব্দ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা দেন দেবাশীষ বর্ধন।
র‌্যাব মহাপরিচালক জানান, আবদুল্লাহ ওই বাড়ির ছাদে কবুতর পুষতেন। বিস্ফোরণে অনেক কবুতর মারা গেছে। যেগুলো জীবিত আছে, সেগুলোর পরিচর্যা করা হচ্ছে।
“নিরাপরাধ দুটো বাচ্চা ছিল, নারী ছিল, আমরা চেষ্টা করেছিলাম তাদের সেইফ করার জন্য। সে তো জঙ্গি ছিল আর এই জঙ্গিদের খুনি মানসিকতার কাছে সন্তানরাও নিরাপদ না।”
আত্মসমর্পণের জন্য বার বার সময় নিয়ে সেই সুযোগে আবদুল্লাহ বোমা বানিয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নে বেনজীর বলেন, “ওই বাসায় আগে থেকেই সে বিস্ফোরক মজুদ করে রেখেছিল।”
কে এই আবদুল্লাহ
র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘দুর্র্ধষ জঙ্গি’ আবদুল্লাহ ২০০৫ সাল থেকে জেএমবিতে জড়িত ছিলেন। মিরপুর মাজার রোডের ওই বাড়িতে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন দীর্ঘদিন ধরে।
স্থানীয়দের অনেকে তাকে চেনেন টিটু নামে। তারা বলছেন, আবদুল্লাহ আইপিএস ও ফ্রিজ মেরামতসহ বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির কাজ করতেন। পাশাপাশি ওই বাড়ির ছাদে কবুতর পুষে বিক্রি করতেন।
র‌্যাব প্রধান বেনজীর বলেন, জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের গ্রেপ্তার এক নেতার কাছ থেকে গতবছর তারা আবদুল্লাহর কথা জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু তার ঠিকানা জানা ছিল না।
“সে মূলত জঙ্গিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিত এবং অর্থ দিয়ে সাহায্য করত। এই বাড়ি বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।”
২০১২ সালে জেএমবির পুনর্গঠনের কাজে আবদুল্লাহ ‘খুবই সক্রিয় ছিলেন’ জানিয়ে বেনজীর বলেন, ওই জঙ্গি দলকে যারা নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন, সেই সারোয়ার জাহান, তামিম চৌধুরী, সোহেল মাহফুজের মতো বড় বড় জঙ্গিরা বিভিন্ন সময়ে আবদুল্লাহর বাসায় এসে থেকে গেছেন।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেছে, তাতে ৪৫ বছর বয়সী আবদুল্লাহ চুয়াডাঙ্গার মীর ইউসুফ আলীর ছেলে। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে আবদুল্লাহ ছাড়াও খোকা নামের এক ভাই এবং বোন মেহেরুন্নেছা ঢাকায় থাকতেন।
মঙ্গলবার ওই বাড়ি থেকে ৬৫ জনকে সরিয়ে নেয়ার সময় আবদুল্লাহর অনুরোধে মেহেরুন্নেছাকেও সরিয়ে নেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। তবে দুই স্ত্রী বা দুই সন্তানকে আবদুল্লাহ ছাড়েননি।
রহিম নামে স্থানীয় এক যুবক জানান, মাজার রোডে সূর্যের হাসি ক্লিনিকের দক্ষিণপাশে রাস্তার টং দোকানে বসে আব্দুল্লাহর সঙ্গে অনেকবার চা খেয়েছেন তিনি। রাজনীতি নিয়ে আব্দুল্লাহ কোনো আলাপ করতেন না।
রাবেয়া নামে পঞ্চাষোর্ধ্ব এক নারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আব্দুল্লাহ এলাকায় দান-খয়রাত করতেন। রাস্তা-ঘাটে তেমন কথা বলতেন না। তাকে দেখে ভালোই মনে হয়েছিল। তিনি যে ভেতরে ভেতরে জঙ্গিবাদে জড়িত তা একটুও বোঝা যায়নি।”
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ কমিশনার মাসুদ আহমেদ জানান, আবদুল্লাহ পুলিশের নির্ধারিত যে ভাড়াটিয়া ফরমটি পূরণ করেছিলেন, তারা সেটি পেয়েছেন। তবে সেখানে কি আছে, সে তথ্য তিনি প্রকাশ করেননি।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ