জনতা ব্যাংক স্থানান্তরের প্রচেষ্টা || প্রতিবাদে এলাকাবাসীর মানববন্ধন ও বিক্ষোভ

আপডেট: মার্চ ৬, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি



ঋণ খেলাপি নেই। নেই লোকসান। আছে আশানুরুপ গ্রাহক। তবুও দফায় দফায় স্থানান্তরের প্রচেষ্টা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকালে এলাকাবাসীর বাধার মুখে দ্বিতীয় দফায় স্থগিত হয় জনতা ব্যাংক গুরুদাসপুর শাখা স্থানান্তর কার্যক্রম। এসময় পরিস্থিতি উতপ্ত হলে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে ব্যাংক স্থানান্তরের প্রতিবাদে গতকাল রোববার সকাল দশটার দিকে ব্যাংকের সামনে থেকে গুরুদাসপুর থানা মোড় পর্যন্ত বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে কয়েক হাজার মানুষ। পরে ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে স্থানীয়দের আয়োজনে শুক্রবার বিকালে শহরজুড়ে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে এলাকাবাসী জনতা ব্যাংকে হিসাব নম্বর খোলার ঘোষণা দেন।
ওই ব্যাংককের গ্রাহক ব্যাবসায়ী রমজান আলী বলেন, তিনি লাখ লাখ টাকা লেনদেন করে থাকেন। তাছাড়া গুরুদাসপুর বাজারের পল্লী বিদ্যুতের সকল লেনদেন এখানেই হয়। সেই সঙ্গে উপজেলার প্রায় ৪০ টিরও বেশি ঋণ প্রদানকারী এনজিওর লেনদেন হয়ে থাকে এই ব্যাংকে। স্থানীয়রা সে সব এনজিওর কাছে অফিস ভাড়া দিয়ে লাভবান হচ্ছেন। ব্যাংকটি স্থানান্তর করা হলে এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন গুরুদাসপুরবাসী। তাই তিনি বাদী হয়ে আজ (গতকাল) নাটোরের আদালতে ব্যাংক স্থানান্তর বন্ধ চেয়ে মামলা দায়ের করবেন।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গুরুদাসপুর চাঁচকৈড় মিলে প্রায় ১৬ হাজার গ্রাহক রয়েছে জনতা ব্যাংকের এই শাখায়। ২০১৪ সালে ব্যাংকটি মুনাফা অর্জন করে ৫২ লাখ, ২০১৫ সালে ৩২ লাখ, ১৬ সালে ১৬ লাখ টাকা। সেই তুলানায় চলতি বছরের গতকাল ৫ মার্চ পর্যন্ত হিসাব স্থিতিশীল রয়েছে। এ কারণে চলতি বছর শেষ হতে হতে ব্যাংকটির লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই শাখায় মোট বাণিজ্যিক ঋণ দেয়া হয়েছে ২২টি। এর মধ্যে ২১টি রয়েছে পৌর সদরের চাঁচকৈড় বাজার ও আশপাশের। একটি মাত্র রয়েছে এই শাখার পাশে। তাও খেলাপি ঋণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবহেলিত চলনবিললের কৃষি-কৃষক ও ব্যবাসায়ীদের সমৃদ্ধ করতে ৫৪ বছর আগে গুরুদসপুর বাজারে জনতা ব্যাংকটি স্থাপন করা হয়। সেই সুবাদে নন্দকুঁজা নদীর তীরে অবস্থিত গুরুদাসপুর বাজার চলনবিল অঞ্চলের বৃহৎ হাটে পরিণত হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিয়ে এলাকার মানুষ বাণিজ্যিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। কালচক্রের বির্বতনে হাটটি পৌর সদরের চাঁচকৈড়ে স্থানান্তর করা হয়। সেসময় গুরুদাসপুর বাজারে জনসমাগম কমলেও ব্যাংক থাকায় বেরে যায় বাজারের গুরুত্ব। সময়ে সঙ্গে ব্যাংককে ঘিরে বাজারে গড়ে উঠে ছোট বড় অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় পাড়-গুরুদাসপুর, নারিবাড়ী, নারাণপুর, কর্মকার পাড়াসহ অনন্তত দশটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের। স্বাচ্ছন্দেই জীবিকা নির্বাহ করছিল এসব গ্রামের মানুষ। কিন্তু হঠাৎ করেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিনা নোটিশে প্রথম মাসখনেক আগে এবং পরে বৃহস্পতিবার (২মার্চ) বিকালে আসবাবপত্র নিয়ে ব্যাংকটি চাঁচকৈড় বাজারে স্থানান্তরের চেষ্টা করে। বিষয়টি বুঝতে পেরে ব্যবসায়ী কাজী মো. রেজাউল করিমের নেতৃত্বে স্থানীয় কয়েকশ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে। এসময় ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারিরা নিচে নামতে পারে নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক গুরুদাসপুর বাজারে একভ্যান পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ গিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপরে লাঠিচার্চ করে। এসময় পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয় ব্যবসায়ী কাজী রেজাউল করিমসহ স্থানীয় কয়েকজন। সাধারণ জনগণের বাধার মুখে দ্বিতীয় দফায়ও স্থগিত হয় স্থানান্তর কার্যক্রম।
ব্যবসায়ী কাজী মো. রেজাউল করিম বলেন, তিনি একজন ব্যবসায়ী। ব্যাংকের পাশেই তার কসমেটিকসকের দোকান। দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে ব্যবসা করছেন। এই ব্যাংকের কোন ঋণ খেলাপি নেই। তবুও একটা মহল চক্রান্ত করে ব্যাংকটি স্থানান্তরের অপচেষ্টা করছেন। তাছাড়া চাঁচকৈড় বাজারে অগ্রণী কৃষিসহ কয়েকটি ব্যাংক রয়েছে। সেখানে গিয়েও তারা লোকসানে পড়ছে। অথচ ওখানেই ব্যাংকটি স্থানান্তর করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী আনন্দ গোপাল কুন্ড (৮০), তিনি গুরুদাসপুর বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী। ব্যাংককে ঘিরে তার চোখের সামনে কতজনের কর্মস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এসব মানুষের কথা বিবেচনা না করে দফায় দফায় ব্যাংক স্থানান্তর করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের গুরুদাসপুর শাখা ব্যবস্থাপক মিনহাজুল আবেদীন জনান, ডিপোজিট অ্যাকাউন্টের ৯০ শতাংশই চাঁচকৈড় বাজার কেন্দ্রীক। সেখানকার গ্রাহকরা ব্যাংকটি স্থানান্তরের জন্য লিখিত আবেদনও করেছেন। কারণ প্রতিদিন এই শাখায় প্রায় ২ কোটি টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। তার বৃহৎ অংশ আসে চাঁচকৈড়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে। চাঁচকৈড় থেকে ব্যাংকের বর্তমান কার্যালয়ের এক কিলোমিটার পথ টাকা নিয়ে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
গুরুদাসপুরের বিশিষ্ট ব্যবাসায়ী প্রশান্ত সরকারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিয়াঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রভাষক মো. মোজাম্মেল হোসেন, অ্যাড. অতিকুর রহমান, অ্যাড. মোহাতাব সরকার, আবদুস সালাম রনি, ব্যবসায়ী কাজী রেজাউল করিম, পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মিলন প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ঋণ খেলাপি না থাকলেও একটা মহল ষরযন্ত্র করে ব্যাংকটি অন্যত্র স্থানান্তরের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গুরুদাসপুরবাসী তা মেনে নেবে না। ব্যাংক স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ