জনপ্রিয়তা রক্ষায় সচেতনতা প্রয়োজন

আপডেট: জুন ২১, ২০২২, ১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন বাহ্যত ভক্তি। সমাজে ভক্তিবাদী মানুষের সংখ্যা কম নয়। এদের অনেকের ভক্তিপ্রদর্শনে অতিরঞ্জন পরিলক্ষিত হলে মানুষের মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়। ভাবে এত আয়োজনের নিশ্চয় উদ্দেশ্য আছে। আর ভক্তের কর্মকাণ্ডের পরিণতির অভিজ্ঞতা থেকেই ‘অতিভক্তি চোরের লক্ষণ’ প্রবাদটির জন্ম। আবার স্নেহের আধিক্য প্রদর্শনে প্রশ্রয় দেয়ার পরিণতি সুখকর হয়না, তার নজির জগৎজোড়া।

লোভে অন্ধ ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারকারীরা নানা কৌশল অবলম্বন করে লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য। এর উদাহরণের জন্য বেশি পেছনে ফিরে যাওয়ার দরকার নেই। ধর্মভিত্তিক দেশভাগের পর আমাদের চলার পথরেখার পানে চেয়ে দেখলে সব স্পষ্ট হবে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পূর্ণভাবে আমাদের হাতে আসেনি। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম তালিম করাই ছিলো আমাদের শাসন-প্রশাসন। দেশের জনগণের প্রতি নজর দেয়ার অবকাশ আমাদের হয়নি, অবিলম্বে একটা কিছু লাভের লোভে।

মানবধর্ম মানুষকে অধিকার সচেতন করে। তা আমাদের ভাগ্যে জোটেনি। ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের বঞ্চনা করা হয়েছে। এর প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তরুণ-শিক্ষার্থীদের। তাঁদের জ্ঞানের তপস্যার পরিবর্তে সম্পদের বোচকার প্রতি প্রলুব্ধ করা হয়েছে। গদি অক্ষুণ্ণ রাখার কুমতলবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এনএসএফ।

এদের সহায়ক হয়েছেন প্রতিষ্ঠান প্রধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত। অলিখিত ক্ষমতা প্রাপ্তিতে এরা এমনি দুর্বিনীত হয়ে পড়েছে যে শান্তিকামী জনগণ এদের নির্মূল কামনায় বাধ্য হয়। ১৯৬৮/৬৯ এর দিকে এদের দৌরাত্ম প্রকট রূপ ধারণ করে। (এদের ছায়া আমাদের পিছু ছাড়েনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ আর বুয়েটে এ সবের ভয়ঙ্কর রূপ আমরা দেখেছি।) পাকিস্তানি কুশাসনের এরা ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কালক্রমে এদের অনেকে ভোল পাল্টিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সাজে আবার ৭৫ এর ঘৃণিত ঘটনার পর উড়ে এসে জুড়ে বসা ক্ষমতার অংশীদার হয়ে যায় কেউ কেউ। তার ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি। এতসব তেলেসমাতির যাওয়া-আসার অক্ষম সাক্ষী আমরা।

একটা সরকারকে অজনপ্রিয় করে তুলতে এতসব তথাকথিত যুবশক্তির ভূমিকা কম নয়। তাই বলে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দিতে হবে, তা বোধকরি ভেবে দেখার অবকাশ আছে। বিষয়টি ভেবে দেখার আগে আমাদের রাজনীতির হালচাল একটু খতিয়ে দেখতে পারি।

ইতিহাস যখন চোখ মেলা শুরু করেছে, সভ্যতা হাটি হাটি পা পা, তখন থেকেই রাজনীতি তথা শাসন ব্যবস্থা বর্তমান ছিলো। সভ্যতার আলোয় পরিশীলিত হয়ে রাজনীতিতে চতুর্বিধ উপায় সংশ্লিষ্ট হয়। উপায়গুলো হলো, সাম-দন-ভেদ-দণ্ড। (তবে চাণক্য রাজনীতিতে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেননি, যা অপরিহার্য)। অর্থাৎ ভালোবাসা, দানদক্ষিণা, ভালো-মন্দের বিচার এবং অপরাধির দণ্ড। আমরা এখন বিদেশি মানদণ্ড দিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রতন্ত্রের আলোকে শাসন করতে দেখছি। একদা রাজনীতি ছিলো জনকল্যাণের কথা সামনে রেখে। জনগণ নেতাদের সাদরে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করতেন।

এঁরা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতেন। আজ মনে হয় সেটা ঠাকুমার ঝুলির ছেলেভোলানো গল্প। ব্যতিক্রম ছাড়া এখন আদর্শহীন রাজনীতিতে পরার্থপরতার ভাবনা শূন্য। ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য সর্বকালের সকল নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছেন কিছু রাজনীতি ব্যবসায়ী। জনকল্যাণ অভিধাটি তাদের অভিধান থেকে মুখ লুকিয়েছে। এরা ত্যাগী নেতার সাইনবোর্ড গলায় ঝুলিয়ে বাজিমাত করতে চায়। এদের অনেকের অপকর্মের ফল গিয়ে পড়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতার ওপর। এদের কারণে উন্নয়ন যতই হোক না কেন জনসমর্থন দ্বিধান্বিত হয়।

ইতিহাসবিদ ইবনে খলদুনের মোকদ্দমার কথা স্মরণে রেখে বলা যায়, এমনটি চলতে থাকলে ‘কাউয়া’ আর ‘হাইব্রিড’দের সংখ্যাধিক্যে আদর্শ মুখ থুবড়ে পড়ার আশংকা থাকে। আত্মসর্বস্ব রাজনীতি ব্যবসায়- সে যে নামেই হোক। রাজনীতির চতুর্বিধ মাহাত্ম্যকে ধূলোয়-লুণ্ঠিত করে।

অপসারি জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনার জন্য আমলা নির্ভরতা ভালো ফল বয়ে আনে না। নিকট অতীতে বৃটিশ বশংবদ আমলার উত্তরাধিকার আজিজ আহমেদকে আমরা দেখেছি। তিনি জনগণ তো দূরে থাক সাধারণ রাজনীতিক এমনকি মন্ত্রীদেরও যথাযথ সম্মান দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পছন্দ করতেন। এরা ফরমাবরবাদ। এক প্রভু গেলে অন্য প্রভু আসবে।

মাঝখান থেকে অনেক আমলা তাই অপকর্মে লিপ্ত হয়। এদের জনতার দরবারে জবাবদিহি হতে হয়না। বঙ্গবন্ধু এমনতর শাসনপদ্ধতি পরিবর্তনের সূচনা করতে চেয়েছিলেন। আত্মসর্বস্ব কিছু মানুষরূপী ষড়যন্ত্রী তা হতে দেয়নি। তাঁকে অকালে চলে যেতে হয়েছে। ইতিহাসকে কলঙ্কিতকারীরা দাপট দেখিয়েছে কিছুদিন অস্ত্র হাতে। তারা সাময়িক জনপ্রিয় হলেও স্থায়ী হয়নি। কারণ মনভোলানো মোড়ক আর আকাশচারী কল্পনাবিলাস স্থায়ী জনপ্রিয়তার মানদ- নয়। চোখ কান খোলা রেখে দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধই জনপ্রিয়তার অন্যতম চাবিকাঠি।

প্রশাসনে এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনস্থান লাভজনক ভেবে সেটি অধিকারের জন্য কামড়া কামড়ি চলে এর মোজেজা কী; তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। মাকাল ফলের মত প্রিয়ভাজনরা তাৎক্ষণিক সুবিধা পায়। কিন্তু সরকার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে জনপ্রিয়তার পারদ নামতে থাকে। তাছাড়া ওই যে সুখ খোঁজার অভিসন্ধি, মানবচিত্তকে চিরকালই দোলায়িত করে, সেটা ভাবার অবকাশ কারো হয় না।

তাৎক্ষণিকের মোহে ‘অনলশিখায় কি করিনু খেলা’র পাঁকে পড়তে হয়। নিজেদের কৃতকর্ম ছাড়াও বিদেশি স্বার্থান্বেষী আগ্রাসীদের অপপ্রচার একটি জনপ্রিয় সরকারকে নানাস্থলে অজনপ্রিয় করে তোলে। নির্মমভাবে এদের মুখোশ উন্মোচন করা দরকার। কুহকী ছদ্মবেশীরা পাশেই ঘুরঘুর করে। এদের চিহ্নিত করতে ভুল করলে, কিংবা বিলম্ব হলে সমূহক্ষতি। মনে রাখা দরকার, এরা অপ্রয়োজনে ভক্তি প্রদর্শন করে এবং সর্বত্র মোসাহেবির আশ্রয় নেয়।

আমরা বলছিলাম স্বার্থন্বেষী অপপ্রচার। এই অপপ্রচার হলো মানবপ্রগতির চির শত্রু অমূলক গুজব। এর প্রভাবে সরকারের জনপ্রিয়তা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিকট অতীতে দেখা গেল, সাঈদীকে চাঁদে দেখা, ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহ মানুষ হত্যা, পূজামণ্ডপে কুরআন শরীফ রাখা ইত্যাদির গুজবে সম্পদ ও লোকক্ষয় হয়েছে। দেখা যাচ্ছে মোবাইলে তা মুহূর্তে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডকে জনমত প্রকাশের স্বাধীনতা বলা যায় না। বরং বিদ্বেষ ছড়ানোর অপকৌশল ভেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ভাবলে শান্তি বিঘ্নিত হয়না। মানুষ শান্তিতে বসবাসে বিশ্বাসী।
লেখক: সাবেক শিক্ষক রাজশাহী কলেজ