রাবিতে ১৮ দিনে ১৩৭ জনের জন্ডিস শনাক্ত, মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৪, ১০:৫২ অপরাহ্ণ


রাবি প্রতিবেদক:জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়তে শুরু করে জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। তবে, সর্বশেষ চারদিনে সংখ্যাটি কিছুটা কমেছে। অনদিকে আবাসিক শিক্ষার্থীর থেকে মেসে থাকা অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন এই রোগে। বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

মেডিকেল সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৫ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৫২ জনের পরীক্ষা করে জন্ডিস শনাক্ত হয়েছে ১৩৭ জনের। এই হিসেবে দৈনিক গড়ে আক্রান্ত হচ্ছেন ৭ জনের বেশি। তবে, সর্বশেষ চারদিনে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।

মেডিকেল সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৫ জানুয়ারি থেকে থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লক্ষণজনিত কারণে ২৪২ জনের পরীক্ষা করে ১১০ জনের জন্ডিস শনাক্ত হয়। এসময় দৈনিক সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৮ জন। তবে, সর্বশেষ চারদিনে ১১০ জনের পরীক্ষা করে জন্ডিস শনাক্ত হয় ২৭ জনের। ফলে এই চারদিনে দৈনিক সংক্রমণের হার নেমে হয়েছে প্রায় ৭ জন।

সর্বশেষ চারদিনের তথ্য থেকে আরো জানা যায়, ৪, ৫ ও ৭ ফেব্রুয়ারি জন্ডিস শনাক্ত হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১ জন করে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকে। বাকিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বা, ছাত্রাবাসে থাকে। ৬ ফেব্রুয়ারি জন্ডিস শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে সকলেই ক্যাম্পাসের বাইরে মেসে থাকেন। চারদিনে জন্ডিস শনাক্ত হওয়া আবাসিক তিন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ড. শামসুজ্জোহা হল, নবাব আব্দুল লতিফ হল এবং মতিহার হলে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসকরা জানান, হেপাটাইটিস এ ভাইরাস লিভারে সংক্রমণের কারণে জন্ডিস হয়ে থাকে। হেপাটাইটিস এ মূলত ছোঁয়াচে এবং পানিবাহিত একটি রোগ। এই ভাইরাসের অস্তিত্ব রয়েছে এমন দূষিত পানি ও খাবার থেকে এটি ছড়ায়। খাবার সঠিকভাবে তৈরী বা রান্না না করলে এবং পরিচ্ছন্নভাবে পরিবেশন না করলেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। জ্বর, বমি, ধূসর রঙের মল, চোখ ও জিহ্বা হলুদ হয়ে যাওয়া, পেটে যন্ত্রণা, গিটে ব্যথা, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি হলো এই রোগের প্রধান উপসর্গ।

এই রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডা. তবিবুর রহমান শেখ বলেন, বিশুদ্ধ পানি পান করা, সঠিকভাবে রান্না করা এবং পরিচ্ছন্নভাবে পরিবেশিত স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহন করার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। হেপাটাইটিস এ সংক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাই, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করায় শ্রেয়। এটি প্রতিরোধ করার সবচেয়ে নিভর্যোগ্য উপায় হলো টিকা গ্রহন।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদ বলেন, জন্ডিস বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে, আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত অধিকাংশ শিক্ষার্থী মেসে থাকে। এর মানে হলো, আমাদের ক্যাম্পাসের ভিতরে প্রকোপটা খুব একটা বেশিনা।

তিনি আরো বলেন, এবিষয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মসচেতন হওয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ খাবার ও পানি করতে সচেতন করার জন্য আমরাও মাইকিং এবং লিফলেট বিতরণ করার উদ্যোগ নিয়েছি। খাবারের দোকানগুলোতে মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী কোনো সমস্যাই পড়লে তাৎক্ষণিক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান করছি।

এদিকে সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কয়েকজন শিক্ষার্থী হেপাটাইটিস এ বা জন্ডিস আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এই বিষয়ে রাবি কর্তৃপক্ষ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জন্ডিস সংক্রমণরোধে বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০:৩০ মিনিটে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনস্থ কনফারেন্স কক্ষে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. সুলতান-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অন্যদের মধ্যে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবীর, জীববিজ্ঞান অনুষদের অধিকর্তা অধ্যাপক মো. গোলাম মোর্ত্তুজা, প্রক্টর অধ্যাপক মো. আসাবুল হক, ছাত্র-উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম সাউদ, জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক প্রদীপ কুমার পাণ্ডে ও ফার্মেসী বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আজিজ আব্দুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সভায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে জন্ডিস সংক্রমণ রোধে কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।

গৃহিত সিদ্ধান্তের মধ্যে আছে, ক্যাম্পাসে জন্ডিস সংক্রমণ রোধে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচার-প্রচারণা চালানো, আবাসিক হল ও মেসসমূহে এবং ক্যাম্পাসে লিফলেট বিতরণ, মাইকিং ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ইত্যাদি। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যে, সাবমার্সিবল পাম্প থেকে পরিস্কার পাত্রে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ ও পরিস্কার গ্লাসে পান করা; নিজ বাসস্থান ও খাবারের স্থান পরিস্কার রাখা; আক্রান্ত না হলেও বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়ে টেস্ট করা ও প্রয়োজনে টিকা গ্রহণ করা; হেপাটাইটিস এ ভাইরাস বা জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ গ্রহণ; ক্যাম্পাসে ও সংলগ্ন এলাকায় খাবার পরিবেশনকারী দোকানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাসহ পরিস্কার পরিবেশে খাবার পরিবেশন করা। বুধবার বেলা ১২টায় একই বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এর সাথে হল প্রাধ্যক্ষবৃন্দেরও সভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রসঙ্গত, ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে অধিকতর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। হেপাটাইটিস এ বা জন্ডিস সংক্রমণ রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে কর্তৃপক্ষ আহ্বান জানাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাবির গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী জন্ডিস ও কিডনি বিকল হয়ে মারা গেছেন। ওই শিক্ষার্থীর নাম মো. মুরাদ আহমেদ মৃধা। তিনি রাবির গণিত বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার কাটাস্কোল এলাকায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই শিক্ষার্থীও মেসে থাকতেন।