জাকাত ইসলামের অন্যতম ফরজ বিধান

আপডেট: মে ৫, ২০২১, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ:


আল্লাহ তায়ালা রমজান দিয়েছেন মুত্তাকী হওয়ার জন্য। মুত্তাকীর অন্যতম গুণ হচ্ছে, আমি (আল্লাহ) তাদেরকে যে রুজী দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। (সূরা আল বাকারা-৩) অর্থাৎ যারা মুত্তাকী তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেন। এই ব্যয়কে পরিভাষায় সদকা বলা হয়। সদকা দু ধরনের। একটি নফল সদকা, অপরটি ফরজ সদকা। ফরজ সদকাকে পরিভাষায় জাকাত বলা হয়। অর্থাৎ জাকাতও তাকওয়া অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। জাকাত বছরের যে কোন সময়ই আদায় করা যায়। কিন্তু পবিত্র রমজান মাসে যেহেতু একটি নফল আদায় করলে অন্য মাসের একটি ফরজের সমান সওয়াব পাওয়া যায় এবং একটি ফরজ আদায় করলে অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান সওয়াব পাওয়া যায় তাই রমজান মাসে নফল সদকা এবং ফরজ সদকা অর্থাৎ জাকাত আদায়ের পরিমাণ বেশী বেশী হয়। এছাড়া হাদীস শরীফে আছে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, রমজান মাসের রোজা ব্যতীত সবচেয়ে উত্তম রোজা কোনটি? তিনি বললেন, রমজানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও এর জন্য প্রস্তুতিমূলক শাবান মাসে রোজা রাখা। তাঁকে পুনরায় জিজ্ঞেস করা হল, কোন দান সর্বাপেক্ষা উত্তম? জবাবে তিনি বললেন, রমজান মাসের দান সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম। (তিরমিজী)
নামাজ যেমন ফরজ, রোজা যেমন ফরজ তেমনি জাকাতও ফরজ ইবাদত। জাকাত শব্দের অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া এবং পবিত্রতা। জাকাত আদায়ের দ্বারা সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং এতে খুব বরকত হয়। হাদীস শরীফে আছে, জাকাত আদায়ের কারণে ধন-সম্পদের কোন প্রকার ঘাটতি দেখা যায় না, বরং তা আরও বৃদ্ধি পায়। জাকাত হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ যা অত্যাবশ্যকীয় ও সম্পূর্ণ নিশ্চিত একটা বিধান। কোন মুসলমান এটাকে অস্বীকার করতে পারে না। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. তাঁর খেলাফত একদল লোককে শুধু জাকাত অস্বীকার করার কারণে মুরতাদ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা যদি নামাজ কায়েম কর, জাকাত দাও, আমার রাসূলগণের উপর ঈমান আন ও তাঁদেরকে সম্মান কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর তবে তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করব এবং নিশ্চয়ই প্রবেশ করাব জান্নাতে যার পাদদেশে নহর প্রবাহিত হবে। এরপরও কেউ কুফরী করলে সে সরল পথ হারাবে। (সূরা আল মায়েদ-১২)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ রা.কে ইয়ামানের গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান এবং তাকে এই নির্দেশ দেন- তুমি ইয়ামানবাসীকে আল্লাহর একত্ববাদ ও আমার উপর ঈমান আনয়নের দিকে ডাকবে। তারা তোমার ডাকে সাড়া দিলে এবং তোমার কথা মেনে নিলে তাদেরকে এ কথা বলবে, আল্লাহ তোমাদের উপর প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ ফরজ করেছেন। তারা তোমার এ কথাও মেনে নিলে তাদেরকে বলবে, আল্লাহ তোমাদের ধন-সম্পদের উপর জাকাত ফরজ করেছেন যা তোমাদের ভিতর সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সম্পদ হতে গ্রহণ করে সহায়-সম্বলহীন ব্যক্তিবর্গের মাঝে বণ্টন করা হবে। (আবু দাউদ, নাসাঈ)
অপর এক হাদীসে আছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুমি যখন তোমার সম্পদের জাকাত আদায় করে ফেললে তখন তোমার উপর আরোপিত কর্তব্যও পালন করে ফেললে। (তিরমিজী, বুখারী)
জাকাত আদায় করলে প্রচুর সওয়াব আছে। অনুরূপ জাকাত আদায় না করলে প্রচুর শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। জাকাতের সওয়াবের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা নিজেদের ধনৈশ্বর্য আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে। প্রতেক শীষে একশত শস্যকণা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা আল বাকারা-২৬১)
আর জাকাত আদায় না করার পরিণাম বলতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং ওগুলো আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে ওগুলো উত্তপ্ত করা হবে এবং ওগুলো দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে সেদিন বলা হবে, এটা ওই যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। (সূরা আত তাওবা-৩৪-৩৫)
হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যাকে আল্লাহ পাক ধনৈশ্বর্য দান করেছেন এবং সে এই ধন-সম্পদের জাকাত প্রদান করে না, কিয়ামতের দিন এই সম্পদ বিষধর সর্পে পরিণত হবে। এই সর্পের চোখে দুটি সাদা বিন্দু থাকবে। সর্পটি তার গলায় ঝুলতে থাকবে এবং তার উভয় অধর প্রান্তে দংশন করতে থাকবে ও বলবে, আমিই তোমার সঞ্চিত ধন। (বুখারী)
জাকাত কোন দয়া নয়। এটা অবশ্য কর্তব্য দায়িত্ব। সুতরাং জাকাত দেয়ার নাম করে দরিদ্র মানুষ ডেকে নিয়ে এসে লাশের সারি তৈরী না করে উচিত তাদের দ্বারে গিয়ে জাকাত পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী দান করার তাওফীক দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী