জাতীয় গণহত্যা দিবস || ইতিহাসের দায়মুক্তি

আপডেট: মার্চ ২৫, ২০১৭, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতার পর থেকেই ভয়াল ২৫ মার্চকে ‘কালরাত্রি’ হিসেবেই জাতি পালন করে আসছিল। কিন্তু এই প্রথমবারের মত দিনটি ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেব সারা দেশে পালিত হচ্ছে। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে বাঙালি জাতিসত্তাকে নিশ্চিহ্ন করতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এ দেশের নিরীহ- নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলে পড়ে নির্বিচার গণহত্যার সূচনা করেছিল। পরবর্তী ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি শৌর্য-বীর্য আর বীরত্বের ইতিহাস রচনা করে। বাঙালিরা কাতারে কাতোরে মরেছে কিন্তু পদানত- পশ্চাদপদতাকে, কুপম-কতা-সাম্প্রদায়িকতাকে মেনে নেয়নি। প্রিয় এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ৩০ লক্ষ মানুষকে শহিদ হয়েছে, চার লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ করে সারা দেশকে মৃত্যুপুরিতে পরিণত করে, লুটপাট করে, দেশকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। স্বাধীনতার জন্য পৃথিবীর আর কোনো জাতিকে এতো মূল্য দিতে হয়নিÑ যা বাঙালিদের কে দিতে হয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে খুবই পরিকল্পিত উপায়ে বর্বর পাকিস্তান বাহিনী ঘুমন্ত বাঙলিদের হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। ইতিহাসের দায় থেকেই এই উদ্যোগটি নেয়া অপপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। এরজন্য বর্তমান মহাজোট সরকারকে ধন্যবাদ- প্রশংসা জানাই।
অবশ্য তার আগেই ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বাঙালির অবিসংবাদিত এই নেতা বলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” কার্যত সেটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, যার পথ ধরে কালরাতের পর শুরু হয় বাঙালির প্রতিরোধ পর্ব।
নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহিদের আত্মদান, চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়।
সেই ভয়ঙ্কর কালরাতির দিনটি আজ জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ১১ মার্চ ২০১৭ জাতীয় সংসদে গণহত্যা দিবস পালনের এই প্রস্তাব সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। ২০ মার্চ ২০১৭ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ায় প্রতি বছর বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পালনের জন্য ২৫ মার্চকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত একটি দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে।
গণহত্যা দিবসের গুরুত্ব এই কারণে যে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানাতে হবে যে, তাদের পূর্বসূরিদের স্বাধীনতার জন্য কী বিশাল আত্মত্যাগ করতে হয়েছে জাতিকে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে নিঃশেষ করতে কী ভয়ঙ্কর আক্রোশে গণহত্যা সংঘটিত করেছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে, সম্পদ লুটপাট ও বসতভিটায় অগ্নিসংযোগ করেছে। মানুষকে জোর করে ধর্মান্তরিত করেছে। তাদের নৃশংসতা থেকে নারী ও শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায়নি।
২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের যৌক্তিকতা খোদ পাকিস্তানই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধে একটি মীমাংসিত বিষয় ৩০ লক্ষ শহিদ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা একাত্তরে বাঙালিদের ওপর যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তা শুধু অস্বীকারই করছে না, বিশ্ববাসীকেও বিভ্রান্ত করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আর এসব করছে তারা যুদ্ধাপরাধের দায় এড়াতে। শুধু পাকিস্তানিরাই নয়Ñ বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এ ষড়যন্ত্র বিদ্যমান আছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও একই ধরনের প্রবণতা আমরা লক্ষ করছি। মুক্তিযুদ্ধের শক্তির বিরুদ্ধে এখনো ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বাংলাদেশের এ ব্যাপারে নিরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। প্রামাণিক দলিলসহ একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসরদের হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের বিষয়টি বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে হবে।
একাত্তরের শহিদদের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ