জাতীয় চারনেতা হত্যার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০১৯, ১২:২৬ অপরাহ্ণ

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক


জাতীয় চার নেতা হত্যার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করতে গেলে প্রথমেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়টি এসে যায়। বঙগবন্ধুকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে অপরদিকে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তারিখে। সময়ের ব্যবধান মাত্র সাড়ে তিন মাস। যে অপশক্তি যে লক্ষ্য অর্জনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। জাতীয় চার নেতা হত্যার পেছনেও ঠিক একই লক্ষ্য কাজ করেছিল। বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে।
পরাধীন দেশের স্বাধীনতা অর্জন একটি রাজনৈতিক ঘটনা। রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া কখনও স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে না। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইউবের নেতৃত্বে দেশে জারী হয় সামরিক শাসন। আইউব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে আওয়ামী লীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে গিয়ে জাতীয় আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। ষাটের দশকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে চলে আসে শেখ মুজিবের হাতে। শেখ মুজিবকে সার্বিক সহযোগিতা দান করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপটেন মনসুর আলী এবং জনাব এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান। এই চার নেতার সাথে পরামর্শ করে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা। ছয় দফা দাবী আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবী ছাড়া আর কিছু নয়। ছয় দফা দাবী অতি দ্রুত পূর্ব বাংলার মানুষের প্রাণের দাবী বলে স্বীকৃতি লাভ করে। ছয় দফা ভিত্তিক আন্দোলনে আইউব খানের ভিত কেপে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত আইউব খানের পতন ঘটে। ১৯৬৯ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে ১৯৭০ সালে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় এবং সেই নির্বাচনে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, শেখ মুজিব এ দেশের শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য নেতা। নির্বাচনের পর আবার শুরু হয় ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবকে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের মধ্যরাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হয়, শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীনতা ঘোষণার অপরাধে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কারাগারে আবদ্ধ করে রাখে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কারারুদ্ধ করলেও মুক্তিযুদ্ধ থেমে থাকে নি। শেখ মুজিবের চার সহকর্মী সর্ব জেনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপটেন মনসুর আলী এবং জনাব এ.এইচ.এম কামারুজ্জামের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসে গঠিত হয় মুজিব নগর সরকার।
আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিব নগর সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম। মুজিব নগর সরকার মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে দেশকে কয়েকটি সেক্টরে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান সম্ভবত ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৭ শে মার্চে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনাটি নিজ কণ্ঠে প্রচার করেছিলেন, কথাগুলো এখনও বাণীবদ্ধ হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সেই প্রচারকে মূলধন করে বিএনপির জিয়াউর রহমান সাহেবকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। তাদের সেই অপচেষ্টা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জিয়াউর রহমান যদি স্বাধীনতার ঘোষক হবেন, তবে জেনারেল ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেল কেন? পাকিস্তান সরকার যদি বিশ্বাস করতো স্বাধীনতার ঘোষক শেখ মুজিব নয়, প্রকৃত ঘোষক মেজর জিয়া, সে ক্ষেত্রে শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিয়ে মেজর জিয়ার অবর্তমানে পাকিস্তান সরকার তাঁর বিচারের ব্যবস্থা করেতো। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি ঘটে নি। ‘মেজর’ র‌্যাংকের কেউ একটি পরাধীন দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বিশ্ববাসীর কাছে তা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং হাস্যকর হয়ে ওঠে। মেজর জিয়া যদি স্বাধীনতার ঘোষক হবেন, মুজিব নগর সরকারের অধীনে সেক্টর কমান্ডারের চাকুরি তাঁর আত্ম সম্মানে বাধে নি কেন? তাঁকে তো মুজিব নগর সরকারের প্রধান হয়ে থাকবার কথা।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং তাঁর স্ত্রী, পুত্র পরিজনদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন খোন্দকার মোশতাক এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। খোন্দকার মোশতাক এবং জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। শুধু বঙ্গব›ধু হত্যা নয়, জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারও বন্ধ রাখা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর তারিখে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম স্থপতি জাতীয় চারনেত াসর্ব জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান কে জেলখানায় বন্দী অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই সময়ে রাজনৈতিক উত্থান-পতনে খোন্দকার মোশতাক খুব বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন নি। কিন্তু রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বেশ কটি সামরিক অভ্যুত্থানকে মোকাবিলা করে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে ছিলেন। তার যদি রাজনৈতিক সততা থাকতো, তাহলে অবশ্যই তিনি জাতীয় চারনেতা হত্যার বিচার করতেন। প্রশ্ন দেখা দেয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো কেন? এই হত্যা কাদের স্বার্থে? স্বার্থ আসলে অভিন্ন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যারা বিরোধিতা করেছিল সেই মার্কিন সম্রাজ্যবাদ এবং পাকিস্তানের হাত খুব লম্বা। ১৯৭১ সালের পরাজয়কে তারা কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারে নি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে জেলখানায় নিহত জাতীয় চারনেতার অবদান কোন অংশে কম নয়।
পাকিস্তান এবং মার্কিন সম্রাজ্যবাদ শক্তি ভেবেছিল শেখ মুজিবকে জেলখানায় বন্দী করতে পারলেই বাঙালীদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভরাডুবি হবে। কিন্তু তাদের সেই ধারনা ভুল প্রমাণ করেন জাতীয় চারনেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবর্তমানে জাতীয় চার নেতাই মুক্তিযুদ্ধের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। শেখ মুজিবকে বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর এই চার নেতা মুজিব নগর সরকার গঠন করেছেন। সেই মুজিব নগর সরকারের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ফলে মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশের মহান বিজয় অর্জিত হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান সরকারের ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা খুব তিক্ত। শেখ মুজিবকে জেলখানায় আটকিয়ে রেখেও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যে ঠেকানো যায় নি। তার মূলে রয়েছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দীন আহমদ, জনাব ক্যাপ্টেইন মনসুর আলী ও জনাব এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান। এবার তারা ভুলের পুনরাবৃত্তি করে নি। ১৯৭৫ সালে ৩রা নভেম্বরে জেলখানায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের প্রতিশোধ নিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর দীর্ঘ একুশ বছর যারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, তারা যখন বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারের কোন ব্যবস্থা করে নি, তা থেকেই অনুমান করা যায় একুশ বছর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা এই হত্যা কাণ্ডের সাথে কোন না কোন ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। আওয়মীলীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় পাওয়া যায়। কিন্তু জাতীয় চারনেতা হত্যা বিচারের কাজ চলমান অবস্থায় আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে হেরে যায়।এর ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় তখন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি।
বিএনপি তথা খালেদা জিয়া সরকার দীর্ঘ একুশ বছরে জেল হত্যা মামলার শুরু করতে পারে নি, সেই বিএনপি ২০০১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবার পর হঠাৎ করে বিএনপি সরকার জেলখানায় জাতীয় চারনেতা হত্যার বিচারের রায় দেয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। জেল হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরকে দায়মুক্ত করা হয়। এটি উদ্দেশ্যমূলক। বাংলাদেশের মানুষ এই রায়কে প্রহসন বলে গণ্য করেএবং বিএনপি- জামায়াত সরকারের পাতানো রায়কে প্রত্যাখ্যান করে।
বিএনপি-জামায়াত সরকারের পাতানো রায়ে দেশবাসী বুঝতে পারে জাতীয় চার নেতার হত্যার সাথে যারা জড়িত ছিল, রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদেরকে বাঁচিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রমাণ স্বরূপ বলা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জাতীয় চার নেতা হত্যার কয়েকজন অভিন্ন আসামী ছিল যেমন- ফারুক, শাহরিয়ার, হুদা, রশিদ প্রমুখ। জাতীয় চার নেতা হত্যা বিচারের রায় প্রদানের পর এদের প্রতিক্রিয়া পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পেরেছিল। তারা সবাই আত্ম স্বীকৃত খুনী। বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জেলখানা হত্যার দায়-দায়িত্ব তারা অস্বীকার করে নি। তারা বলেছিল দেশের মঙ্গলের জন্যই তারা এ কাজটি করেছে। তাদের কাছ থেকে তখন জানা গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার খবরটি যখন জিয়াউর রহমান সাহেবকে জানানো হয়, জিয়াউর রহমান সাহেব আবেগাচ্ছন্ন হয়ে তাদেরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিলেন।
এর পর বাংলাদেশের রাজনীতি নানা খাতে প্রবাহিত হয়েছে।২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় আংশিক ভাবে কার্যকর করেছে। অনেকে বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে ,১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তারিখে তারাই জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছে। হত্যাকারী অনেকেই এখন ফাঁসির ভয়ে বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের দাবী হত্যাকারী আসামীদেরকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হোক।
লেখক: উপাচার্য, নর্থবেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী