জাতীয় নেতা শহিদ কামারুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট: নভেম্বর ৪, ২০১৯, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ

ড. তসিকুল ইসলাম রাজা


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এএইচএম কামারুজ্জামান হেনা সাহেব ১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তনের প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের মহান নেতা বিশ^নন্দিত রাজনীতিক ও শেখ মুজবুর রহমানের রাজনীতির গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। পরের বছরই তিনি ১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এ পদে তিনি ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় কালে তিনি বৃহত্তর রাজশাহীতে আওয়ামী লীগকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করান। তাঁর সাংগঠনিক যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তাঁর রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য, কর্ম প্রয়াস ও সাংগঠনিক যোগ্যতায় শেখ মুজিবুর রহমান খুবই প্রীত হন। হেনা সাহেব তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতা গুনেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বলিষ্ঠভাবেই অপরিহার্য হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে দলের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। তিনি সভাপতি এবং কামারুজ্জামানকে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আহবায়ক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেন। কামারুজ্জামান ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। কিন্তু মার্শাল আইয়ুব খানের শাসন আমলে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষেদের সদস্য হিসেবে বাঙালিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে যুক্তিনিষ্ঠ বক্তৃতা করেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের উত্তরবঙ্গ তথা রাজশাহী বিভাগ বা বরেন্দ্র অঞ্চল খুবই অবহেলিত অবস্থায় ছিল। তাই, তিনি সর্ব প্রথম ১৯৬২ সালেই যমুনা নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য জোর দাবী জানান। তিনি মহান সংসদে দাঁড়িয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈষম্যের বিষয়টি অত্যন্ত সোচ্চার কণ্ঠে উচ্চারণ করেন। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাজেটের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে তিনি যেমন পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের ভিতরে, তেমনি বাইরেও বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদ করেন। তখন বিনা বিচারে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতা, ছাত্রনেতাসহ কর্মীদের জেলখানায় আটক রাখতো। নানান রকম নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাতো। পাকিস্তানের দুইটি ইউনিট অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেটে সুষম অর্থ বরাদ্দের জন্য জোর দাবী জানান। সেনাবাহিনীতে বাাঙালিদের তেমন নিয়োগ দেয়া হতো না। বিচারপতি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনীহা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হতো। বৈদেশিক চাকরির ক্ষেত্রেও বাঙালিদের নিয়োগ দেয়া হতো না। কামারুজ্জামান সাহেব জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ইংরেজি ও উর্দু প্রাঞ্জল ভাষায় চমৎকার বক্তৃতা দানের মাধ্যমে সংসদকে কাঁপিয়ে দিতেন। রস-রসিকতার মাধ্যমে তাঁর শাণিত বক্তৃতা সংসদ সদস্যগণ বেশ উপভোগ করতেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি আমলাদের (সিএসপি) ক্ষমতা কমানোর জন্য জোর দাবী জানান। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বাঙালিদের ক্ষেত্রে স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি আপসহীন ও নির্ভকচিত্তে সোচ্চার বক্তৃতা করেছেন। আওয়ামী লীগ দলের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ও বিশ^স্ত সহচর হিসেবে তিনি ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ছয় দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম, ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন, ছাত্রদের এগারো দফা আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং তিনি তাদের আন্দোলনে একাত্মতার জন্য পাকিস্তান জাতীয় সংসদ সদস্য থেকে পদত্যাগ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষরে লিখা রয়েছে। এ ছাড়াও ১৯৬১ সালে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে উৎসব উদযাপনের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সামরিক শাসক ও শোষক শ্রেণি প্রচণ্ড বাধা সৃষ্টি করে এবং ১৯৬৫ সালে বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ পাকিস্তানে রবীন্দ্র রচনাবলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই সময় জাতীয় সংসদে তিনি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং নিন্দা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এএইচএম কামারুজ্জামান ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সম্মিলিত বিরোধী দলের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, প্রখ্যাত আইনজ্ঞ-স্বনামখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান, গণতন্ত্রের মানসপুত্র ও অতন্দ্র প্রহরী পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম স্রষ্টা, মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা এবং আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক গুরু জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর বৈরুতের একটি হোটেলে নির্জনে মৃত্যুবরণ করেন। তারপর তাঁর লাশ তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং ঢাকায় তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দাফনের ব্যবস্থা করেন। সেখানে লক্ষাধিক মানুষ তাঁদের প্রাণাধিক প্রিয় মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর জন্য তেজগাঁ বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত উপস্থিত হন।
তাঁর মৃত্যুতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয়। সেই সময় সংসদে সম্মিলিত বিরোধী দলের সম্পাদক এএইচএম কামারুজ্জামান বলেন, জনাব সোহরাওয়ার্দী সংগ্রামী জীবনের প্রারম্ভে যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেই গণতন্ত্রের জন্যই সংগ্রাম করিয়া গিয়াছেন। জনাব সোহরাওয়ার্দী সম্মুখ সংগ্রাম বিশ^াস করিতেন, কোনো দিন তিনি খিড়কির দরজা দিয়া ক্ষমতাসীন হন নাই। যে মহামনীষী পাকিস্তান কায়েম করেন, তাঁহাকেই সেই দেশেরই কারাগারে প্রেরণ করা হইয়াছিল। ইহার চাইতে ভাগ্যের পরিহাস আর কি হইতে পারে। সেইদিন মরহুমের চোখে অশ্রু দেখা গিয়াছিল। দুঃখ করিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, ‘আজ আমাকেই পাকিস্তানের দুশমন বলিয়া চিহ্নিত করা হইতেছে।’ সেইদিন জনাব সোহরাওয়ার্দী আমাকে নির্দেশ দিয়াছিলেন, ‘কামরু, দেশ ও দেশবাসীকে গিয়া বলো আমি বিশ^াসঘাতক নই, পাকিস্তান ও পাকিস্তানবাসীদের আমি ভালোবাসি।’
‘(সূত্র-গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সম্পাদনায় সৈয়দ তোশারফ আলী, সিটি পাবলিসার্স হাউস, ৯০ কাকরাইল, ঢাকা-১০০০। প্রকাশক মইনুল হোসেন, প্রকাশকাল: ডিসেম্বর, ১৯৯৮ পৃ:৪৩১)।’
এ প্রেক্ষিতে আমরা বিশেষভাবে জাতির প্রতি গৌরববোধ করছি যে, কামারুজ্জামান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য, গুনমুগ্ধ এবং আমৃত্যু একজন অত্যন্ত বিশ^স্ত সহচর ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু এবং বিশ^নন্দিত রাজনীতিক ও গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবেরও অত্যন্ত প্রীতিভাজন স্নেহধন্য ও এক বুক কাছের মানুষ ছিলেন জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান। রাজনৈতিক জীবনে কামারুজ্জমানের যে মেধা মনন, যোগ্যতা, কর্ম-দক্ষতা ও কর্মকুশলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় এই বিষয়টি চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব কামারুজ্জামানকে ‘কামরু’ বলে সম্বোধন করেছেন। ছোট্ট নাম ‘কামরু’ অতি আদরের স্নেহমাখা এবং অত্যন্ত কাছের প্রাণপ্রিয় নিকটজন হিসেবেও কামারুজ্জামান পরম শ্রদ্ধাভাজন ও বয়স্ক মুরুব্বীদের প্রতি সম্মান জানানোর তাঁর সাংগঠনিক যোগ্যতা ও কর্ম দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
প্রকৃতঅর্থে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজশাহী শহর কিংবা বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় মুসলিম জনজীবনে কামারুজ্জামানের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বৃটিশ আমলে তাঁদের বাড়িতে অবিভক্ত ভারতের বিশ্বনন্দিত ও দেশবরেণ্য মহান নেতৃবৃন্দ আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস (১৮৭০-১৯২৫), শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), মহাকবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১), মওলানা আকরাম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮), বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), সঙ্গীত সাধক আব্বাস উদ্দীন (১৯০১-১৯৫৯) প্রমুখ। তাঁদের অনেকেরই স্নেহ ধন্য ও পরম পরশে সান্নিধ্য লাভের মাধমে তরুণ বয়স থেকেই কামারুজ্জামান তাঁর মানস গঠনে নিজেকে বিনির্মাণ করেন।
চলবে..