জাতীয় শিক্ষক দিবসের শুভেচ্ছা-শত আশাতেও হতাশা !

আপডেট: অক্টোবর ১৭, ২০২১, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

মো. তাজরুল ইসলাম:


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন “স্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা দেবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারের মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন;…..তবু মানুষের কাছ হইতে মানুষ যাহা পায় কলের কাছ হইতে তাহা পাইতে পারে না। কল সম্মুখে উপস্থিত করে, কিন্ত দান করে না; তাহা তেল দিতে পারে, কিন্ত আলো জ্বালাইবার সাধ্য তাহার নাই।”
দুঃখজনক হলেও সত্য আজও আমরা ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক এমনকি রাষ্ট্র এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারিনি। দক্ষ মানবসম্পদ ও সুনাগরিকতা সম্পন্ন সোনার বাংলা তৈরির জন্য এ সত্যটি উপলব্ধি করা উচিত। আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানীরা শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “শিক্ষা হলো আচরণের ইতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তন।” বার্টান্ড রাসেল বলেছেন-” শিক্ষা হলো শিক্ষার্থীর উত্তম চরিত্র গঠন। সক্রেটিস বলেছেন, ” শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সত্যের লালন ও মিথ্যার অপলোদন।” এক কথায় পরিপূর্ণ শিক্ষা জ্ঞানের স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, জ্ঞানার্জনের পর তা কার্যকরেভাবে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করাই হলো শিক্ষা। শিক্ষা দানের এই গুরুদায়িত্ব পালন করেন যাঁরা তাঁরাই শিক্ষক। আজ কোথায় সেই শিক্ষক আর কোথায় সেইছাত্র। শিক্ষক যখন স্কুলে আসেন বা আসার সময় হয় তখন অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে বা স্কুল গেটে অপেক্ষা করতাম। আমি আগে সালাম দিবো, সবার আগে কুশল বিনিময় করব। আর শিক্ষকরা যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন তখন দুপাশের মানুষের সালাম নিতে এমন অবস্থা দেখেছি শেষ পর্যন্ত শুধু মাথা নাড়িয়ে হু করতে সম্মান এবং শ্রদ্ধায় স্নাত হয়ে এগিয়ে যেতেন। কী সেই মহান দিনগুলো। কিন্তু আজ কী ছাত্র আর কী শিক্ষক! শিক্ষকরা সব সময় আতংকে থাকেন এই বুঝি কোনো ছাত্র অপমান করল, এই বুঝি পাওনাদার টাকা চাইল। সামনে বা পাশে ছাত্ররা বিড়ি টানছে বা মোবাইলে উচ্চস্বরে গান বাজাচ্ছে। তাও আবার সেই গান না, যেই গানকে আর যাই হোক সুস্থ বিনোদন বলা যায় না। ছাত্রদের সাথে ছাত্রীর, শিক্ষকদের সাথে ম্যাডামদের এমনকী শিক্ষকদের সাথে ছাত্রীদের শ্লীলত হানি বা নানা অশ্লীল শ্রুতি হরহামেশায় কানে আসে। কোথায় গেল সেই শিক্ষক আর কোথায় গেলো শিক্ষার্থী। খুব অল্প সময়েই হারিয়ে গেল সেই সোনালি, সুশ্রী, পবিত্র ও মহান সেই বিদ্যাপীঠ। একজন শিক্ষক শুধুই শিক্ষক নন তিনি একজন প্রশিক্ষকও বটে। শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয় বুঝিয়ে দেন বা শিখিয়ে দেন তখন তিনি শিক্ষক। যখন সৃজনশীলতা, শিষ্ঠাচার, দেশপ্রেম, নেতৃত্ব, কষ্টসহিষ্ণুতা, গণতন্ত্রমনষ্কতা ও পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি সহপাঠ কার্যক্রম বিষয়গুলো নজরদারিতে রাখেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন তখন ওই শিক্ষকই একজন প্রশিক্ষক। শিক্ষকের কাজ হবে শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করা, কীভাবে আলো ছড়িয়ে অন্ধকারের মানুষগুলোকে আলোর পথে নেয়া। তা না করে একশ্রেণির শিক্ষক তাদের অপকর্মের মাত্রা এতটাই অতিক্রম করে যাচ্ছে তাতে সমস্ত শিক্ষক জাতি আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে চিটারি বাটপারি, নারী কেলেংকারি এমনকী পত্রিকার পাতায় ভূমিদস্যু হিসেবেও শিক্ষকের নাম পরিচয় প্রাত্যহিক ঘটনা। আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, এরিস্টেটল, প্লেটো, সক্রেটিস যদি শিক্ষকদের দৈন্যদশা দেখতে পেতেন তাহলে কতই না কষ্ট পেতেন। শিক্ষা, জ্ঞান হলো আলোর মশাল, যা সৃষ্টকর্তা সবার হাতে দেয় না। যার হাতে দেয়া হয় তার অনেক বড় দায়িত্ব। দুনিয়ার অন্ধকারের মানুষগুলোকে জ্ঞানের মশালের আলো দেখিয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখানো। কেউ যেন তার আলো থেকে থেকে বঞ্চিত না হয়। বিধাতা যাকে সম্মানিত করে হাতে তুলে দিল জ্ঞানের আলোর মশাল, আর বললেন, আন্ধকারের মানুষগুলোকে আলোকিত করতে। কিন্তু এই পথ দেখনো মানুষগুলো যখন জাতিকে আলোকিত না করে নিজেই হারিয়ে যায় অন্ধকারের গহীন গহবরে। তখন কোথায় থাকে মানুষের মানবতা। একটাবার ভেবে দেখুনতো, কাঁমার ভালো দা, বটি, ছুরি ইত্যাদি বানাতে পারে। তাই এগুলোর প্রয়োজন হলে মানুষ কাঁমারের কাছে যায়। ভাল গহনা বানাতে পারে বলে তারা স্বর্ণকার। গহনা বানাতে মানুষ স্বর্ণকারের কাছে যায়। ভাল গাড়ি চালাতে পারে যারা তারা ড্রাইভার। যে যে বিষয়ে দক্ষ সে সে পেশায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহন করে। মানুষ ড্রাইভিং শিখতে কখনও কাঁমারের কাছে বা অলংকার বানাতে কেহ ড্রাইভারের কাছে যায় না। যিনি যে বিষয়ে দক্ষ মানুষ সেই প্রয়োজনে তাঁর কাছেই যায়। যারা শিক্ষক তাদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। ভাল মানুষ না হলে তো তিনি ভাল কারিগর হতে পারে না। নিশ্চয় যিনি মানুষ গড়ার কারিগর তিনি অত্যন্ত ভাল মানুষ, না হলে কি করে ভাল মানুষ গড়বেন। যদি তাই হয় তাহলে বিভিন্ন পন্য, খাদ্য, ঔষধ, ইত্যাদি ভেজালের সাথে মানুষ গড়তেও ভেজাল ঢুকেগেছে। মানুষ বাড়ছে কিš‘ ভাল মানুষ বাড়ছে না। খারাপ মানুষের সংখ্যা যদি এভাবে চক্রাবৃদ্ধি হতে থাকে তাহলে ভাল মানুষের সংখ্যা দিন কমে যাবে। নিমগাছ থেকে তিতা পাওয়া যাবে মিঠা পাওয়া কোন ভাবে সম্ভবনা। খারাপ মানুষ খারাপ প্রডাকশন দিবে। আর ধীরে ভালো মানুষ বিলুপ্ত হবে। কারিগর যদি নষ্ট হয় তাহলে তার গড়া মানুষ তো নষ্ট হবেই। ছোট থেকে শুরু করে সকল প্রতিষ্ঠানে নষ্ট মানুষ তৈরি হচ্ছে। নষ্ট হওয়া আর পঁচে যাওয়া এক কথা নয়। ধরুণ, আপনার একটা ইলেক্টোনিক্স যন্ত্র বা শরীরের একটা যন্ত্র বা যে কোন একটা পণ্য নষ্ট হয়েছে। যা রিপিয়ারিং সম্ভব। এবার ধরুন একটা পিয়ারা বা আপেল পঁচে গেছে, এই ফলটাকে যদি অন্য ভাল ফলগুল থেকে আলাদা না করেন তাহলে সব ফল নষ্ট করে ফেলবে ওই পঁচা ফলটা। তখন ওই পঁচা ফলটা বরং মাটির নিচে পুতে ফেলায় উত্তম। সমাজে দিন ভাল মানুষের তালিকা একেবারে ছোট হয়ে যাচ্ছে। আর পঁচা মানুষের সংখ্যাদ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। সমাজটা পঁচে গেছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।দেশ ধ্বংস করতে যুদ্ধের প্রয়োজন হয়না যদি শিক্ষাকে নষ্ট করা যায় তাহলে দেশ এমনিতেই শেষ হয়ে যায়।
উপযুক্ত মূল্য দিয়ে অর্জিত কিছুর সাথে যে সুখানুভূতি তাই সাফল্য। আমাদের সেটাই অর্জন করা উচিৎ। অযথা সাফল্যের জন্য দশ দিকে না ছুটে আমরা যদি আমাদের নিজ পেশার প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা, কঠোর পরিশ্রম সঠিক উপস্থাপন আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করি তাহলে মনে হয় নতুন সূর্যের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছি- এক শেয়াল আর এক বিড়াল বসে পরামর্শ করছে। কুকুর আমাদের দুইজনেরই জাতশত্রু। কুকুর থেকে বাঁচার জন্য কী করা যায়? শেয়াল বলল, আমার মাথায় বাঁচার শ-খানেক বুদ্ধি আছে, এটা নিয়ে আমার তেমন চিন্তা নেই। বিড়াল বলল, আমার তো একটাই বুদ্ধি আছে! তাহলো, এক লাফে গাছের মগডালে উঠে পড়া। এই সময় একটি কুকুর আক্রমণ করে। বিড়ালতো একলাফে সোজা গাছের মগডালে। এইবার শেয়াল চিন্তা করে এই একশটা বুদ্ধির মধ্যে কোন বুদ্ধিটি কাজে লাগানোযায়! এই চিন্তা করতে করতে কুকুর লাফ দিয়ে শেয়ালকে ধরে ফেলে। আমাদের উচিত শিক্ষা নিয়েই গবেষণা করা উচিৎ।
জাতীয় শিক্ষক দিবসে সকল শিক্ষকদের উচিৎ ছাত্রদের সন্তান ভেবে পাঠ্যশিক্ষার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, শিষ্ঠাচার, দেশপ্রেম, নেতৃত্ব, কষ্টসহিষ্ণুতা, গণতন্ত্রমনষ্কতা ও পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদিসহ পাঠ কার্যক্রম বিষয়গুলো নজরদারিতে রেখে ও নিয়ন্ত্রণ করে একজন দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা। আমরা যারা শিক্ষক তাদের শিক্ষা নিয়েই চর্চা করা উচিত তাতে হতাশা নয়, শত আশায় এগিয়ে যাব আলোর পথে।
লেখক: অধ্যক্ষ, কেশরহাট মহিলা কলেজ।