জীবনযুদ্ধে অদম্য রোজিনা স্বপ্নের পথে সারথি হলো রাজশাহী কলেজ

আপডেট: ডিসেম্বর ৮, ২০২১, ১০:৫৩ অপরাহ্ণ


মাহাবুল ইসলাম:


মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই পরকালে পাড়ি জমিয়েছেন বাবা হামেদ। হতদরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তি হামেদের আকস্মিক মৃত্যুর কিছুদিন পরই জন্ম নিয়েছিলো রোজিনা খাতুন। চরম অপুষ্টি নিয়েই পৃথিবীর মুখ দেখেছিলেন রোজিনা। অভাবের সংসারের টানাপোড়নে সেই অপুষ্টির অভিশাপ থেকে মেলে নি মুক্তি। এরই ফলশ্রুতিতে চার বছর বয়সে পোলিও জ¦রে আক্রান্ত হয়ে হারিয়েছেন দুরন্ত শৈশব। অসুখে মেলেনি চিকিৎসা। মিলেছে পঙ্গু জীবন! তবে পঙ্গু জীবনেও আশার আলো হয়েছিলো সংগ্রামী মায়ের অনুপ্রেরণা। মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন তাড়া করে বেড়িয়েছে মেয়ে রোজিনাকেও। সেই স্বপ্নের মাঝপথে হঠাৎই ইতি ঘটেছে মায়ের অনুপ্রেরণা। তবে দমে যাননি রোজিনা। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছে সে। এবার সেই স্বপ্নের পথে সারথি হলো দেশসেরা রাজশাহী কলেজ।

রোজিনা খাতুন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বাকশিমুইল ইউনিয়নের পরিজুনপাড়ার বাসিন্দা। বর্তমানে তার বয়স ২৯ বছর। মা আলিমন ও বাবা হামেদের কনিষ্ঠ মেয়ে সে। বড় ভাই এলাকায় দিনমজুরের কাজ করে দিনযাপন করেন। বড় বোন ফাহিমা বেগম স্বামী-সন্তান নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে থাকেন। রোজিনার একমাত্র সম্বল বলতে সবসময় পাশে ছিলেন মা। এবছরের ১৪ নভেম্বর স্ট্রোক করে মা আলিমনও মৃত্যুবরণ করেন। এখন বড় ভাইয়ের কাছে আশ্রয় নিলেও অভাবের সংসারে উৎকন্ঠায় রয়েছেন তিনি।

রোজিনা ২০১০ সালে কেশরহাট নাকইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ২০১২ সালে পুঠিয়ার পঙ্গু শিশু নিকেতন সমন্বিত অবৈতনিক ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর মোহনপুর দাউকান্দি কলেজে সামাজবিজ্ঞানে অনার্স কমপ্লিট করেন। অর্থনৈতিক সমস্যা ও করোনা মহামারীর কারণে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারছিলেন না তিনি। এবছর রাজশাহী কলেজে মাস্টার্সের ফরম উত্তোলন করেন। কিন্তু অর্থের অভাবে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন কি নাÑ তা নিয়ে দুঃচিন্তায় ছিলেন। সেই চিন্তার অবসাে রোজিনার স্বপ্নের পথে সারথি হয়ে এগিয়ে আসলেন শিক্ষার্থীবান্ধব রাজশাহী কলেজ প্রশাসন। তার ভর্তি, মাস্টার্সে শিক্ষাগ্রহণকালীন যাবতীয় খরচ ফ্রি করে দেয়াসহ বিনামূল্যে শিক্ষাসামগ্রী ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেয়ার ঘোষণা দিলেন রাজশাহী কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহা. আব্দুল খালেক।

মঙ্গলবার (৭ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে রাজশাহী কলেজ লাইব্রেরির সামনে নিজের জীবনের চড়াই উতরাই’র ঘটনা তুলে ধরছিলেন রোজিনা। বলছিলেন তার স্বপ্ন ও বাস্তবতার কথা। রোজিনা খাতুন বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর মানুষের বাড়ি কাজ করে কখনো বা ধারদেনা মা আমাকে পড়িয়েছেন। বড় ভাই বোনেরাও কিছুটা সাহায্য করেছেন। তবে তাদের সংসার চালানোর পর আবার এদিকের খরচ চালানো সম্ভব ছিলো না। চার বছর বয়স থেকে আমি পঙ্গু জীবনযাপন করছি। কোমরে কোনো শক্তি পাই না। পায়ের রগগুলোও বাঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু আমি বোঝা নই। একটু সহযোগিতা পেলে নিজের কাজ নিজেই করতে পারি।
তিনি আরও বলেন, পোলিও জ¦রের সময় চিকিৎসা পেলে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠতাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাহস হয় নি। অভাবের সংসারে যেখানে জীবন চলে না; সেখানে চিকিৎসা! এতো খরচ চালানোর মতো টাকা আমাদের নেই। ছোট্ট থেকেই প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। সেগুলো দিয়ে আমার পড়াশোনার খরচ চালে। স্কুল-কলেজ থেকেও কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। সেগুলো দিয়ে কোনোমতে পড়াশোনা চালিয়ে গেছি।

মলিন কন্ঠে রোজিনা বলেন, মা মারা যাওয়ার পর আমার জীবনের কষ্ট আরও বেড়ে গেছে। বড় আপন সম্পদটি হারিয়ে ফিলেছি। মা মারা যাওয়ারপর বুঝে উঠতে পারি না কী করব। অভাগী কপাল হয়তো ভালো হবে না জানি। কিন্তু শেষ চেষ্টাটা করছি।

রোজিনা আরও বলেন, অনার্স কমপ্লিট করে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য ঘুরে বেড়িয়েছি। এখনও কোনো গতি হয় নি। আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা করার ইচ্ছে রয়েছে। তবে ইচ্ছা থাকলেও উপায়টা কঠিন। মাস্টার্সে টাকার অভাবে ভর্তি হই নি। দুইটা বছর বসেছিলাম। কিন্তু এবার রাজশাহী কলেজে ফরম তুলেই কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করি। শঙ্কায় ছিলান তারা আমাকে বুঝবে কী না? তবে এ কলেজের সুনাম আমার জানা। সেই আশায় স্যারের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। অধ্যক্ষ স্যারসহ অন্য শিক্ষকরা আমার অসহায়ত্বের কথাগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে শুনেছেন। আমার পড়াশোনার সকল খরচ ফ্রি করে দিয়েছেন। আমার পাশে থাকার আশ^াস দিয়েছেন। আমি অধ্যক্ষসহ কলেজ প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞ।

এ বিষয়ে রাজশাহী কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহা. আব্দুল খালেক জানান, বাবা-মা হারানো রোজিনা পঙ্গুত্ব জীবনের এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও যেভাবে অদম্য সাহস ও ইচ্ছাশক্তি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত রোজিনার জীবন অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা। আর এমন আত্মপ্রত্যয়ী শিক্ষার্থীকে দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজ কখনোই অবহেলা করতে পারে না। তার উচ্চ শিক্ষার এই ধাপটিকে কিছুটা মসৃণ করতে রাজশাহী কলেজ তার পাশে দাঁড়িয়েছে। তার পড়াশোনার যাবতীয় খরচ রাজশাহী কলেজ চালাবে। এর বাইরেও তাকে সাহায্য করা যায় কি না? এবিষয়ে সুদৃষ্টি আছে। তার জীবনের সাফল্য কামনা করছি।