জীবনযুদ্ধে লড়ছেন বীরপ্রতীক সোলায়মান

আপডেট: ডিসেম্বর ৩, ২০১৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

সুফি সান্টু, নাটোর



‘সকালে ভালো থাকি, বিকাল হলে অসুস্থ হয়ে পড়ি। বেশির ভাগ সময় কাটে ঘরে বসে। সন্ধা হলে এখন আর ঘরের বাইরে যেতে পারি না। অথচ ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় রাতের সামান্য আলোতেও হানাদার বাহিনীর সদস্যদের টার্গেট করেছি। কত শত্রু খতম করেছি তার হিসাব নেই। নীলফামারীর ‘জগদ্দল’ নামক স্থানে সম্মুখযুদ্ধে পাকসেনার শত্রুর গুলিতে আমার দুই হাত ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। শিলিগুড়ি আর্মি ক্যাম্পে এক মাস এক দিন চিকিৎসা নিয়ে আবার যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। থেমে যায় নি। অথচ এখন দিনের আলোতেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারি না। ছয় মাস আগে এসপি অফিস থেকে ওষুধ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে ছয় মাস আগে ৭২ হাজার টাকা দিয়েছিল। সেই টাকাও সংসার খরচ এবং নিজের ওষুধপত্র কেনায় ফুরিয়ে গেছে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে টাকার অভাবে আর চিকিৎসা করাতে পারছি না। তবে আজ কালের মধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে টাকা দেয়ার কথা রয়েছে।’
নিজের দুঃখের কথা এভাবেই জানালেন নাটোরের এক মাত্র বীরপ্রতীক মোহাম্মদ সোলায়মান। বীরপ্রতীক এই সোলায়মানের বাড়ি নাটোর শহরের কাপুড়িয়া পট্টি মহল্লার ভিকটোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরির পিছনে অবস্থিত এক টুকরো সরকারি খাস জমিতে। ওইখানে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে মরণপণ জীবনযুদ্ধ করে দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। এক ছেলে ও দুই মেয়ে তার।  এর মধ্যে মেয়ে দুইটির বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটা ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করেন।
১৯৭১ সালে এই বীরপ্রতীক রংপুর পুলিশ লাইনে চাকরি করছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে অন্যান্য সহকর্মীর সঙ্গে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল পদে চাকরিতে যোগ দিয়েও রংপুরে আর ফিরে যান নি।
বীরপ্রতীক সোলায়মান বলেন, স্বাধীনতার পর তিনি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালিয়েছেন। ২০১১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর  স্ট্রোক করে তাঁর শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে গুরুতর অসুস্থ বোধ করি। শুয়ে থেকেই দিন পার হয়ে যায়।
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান বলেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারের কাছ থেকে যে ধরনের সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল তা পায়নি। তবে ৯৭ সালের দিকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পেয়েছিলাম।’
নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নায়িরুজ্জামান জানান, নাটোর সদরে তালিকা অনুযায়ী ৫৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধা আছে। এদের মধ্যে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ৫৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি থাকায় তারা কোনো ভাতা পান না। মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গত বছর সরকারের পক্ষ থেকে নয় লাখ দেয়া হয়েছে। এবছর এখনো কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায় নি। বরাদ্দ পেলে এবং আবেদনের ভিত্তিতে সহযোগিতা করা হবে।
নাটোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রউফ জানান, মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মানসহ জেলায় ১৫৬২ জন মুক্তিযোদ্ধা ও আট জন বীরাঙ্গনা রয়েছেন।