জীবনযুদ্ধে হার মানেন নি বাঘার জায়দা

আপডেট: July 9, 2020, 12:03 am

বাঘা প্রতিনিধি:


বাঘার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অটো নিয়ে জুটে বেড়ান জায়দা বেগম-সোনার দেশ

রাজশাহীর বাঘায় জায়দা বেগম নামের এক নারী জীবনযুদ্ধে হার মানেন নি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দু-মুঠো ভাতের জন্য কিস্তিতে কেনা অটো নিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটে বেড়ান। জায়দা বেগমের বাড়ি বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে।

 

 

জায়দা বেগম জীবন জীবিকার তাগিদে গৃহিণী থেকে ধরেছে অটোর হ্যান্ডেল। সমাজে পুরুষের পাশাপাশি জায়দা বেগম আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে পেশা হিসেবে অনেক নারী বেছে নিচ্ছেন গাড়ি চালানোকে। যাদের দেখা মেলে শহরে। তবে চালকের আসনে এখন গ্রামের রাস্তায় নেমেছে এই প্রথম নারী জায়দা বেগম। স্বামী শাহাজামাল আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে। তারপর সে নিরুপায় হয়ে পড়ে। অবশেষে অটো চালানো পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

জায়দা বেগমের দরিদ্র পরিবারে জন্ম। অন্যদিকে কালো চেহারার বলে কেউ বিয়ে করতে চায়নি। ফলে ৩০ বছর বয়সে বিয়ে করেন। বছর খানেক সংসার করেন। তারপর একটি সন্তান জন্মের আগে স্বামী অন্যত্র চলে যায়। তখন জীবন জীবিকার তাগিদে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। ইতোমধ্যে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান। অভাবি সংসারে ভারতের সীমান্তবর্তী পদ্মার দুর্গম বাংলাবাজার চর ছেড়ে ছেলে জায়দুল হককে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ২০ বছর আগে চলে আসেন উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে। এই গ্রামে ৫ কাঠা জমি কিনে শুরু করেন নতুন জীবন। খেয়ে পরে বেঁচে থাকার তাগিদে কোন পেশাকে ছোট করে দেখেন নি জায়দা বেগম। এভাবেই পার করেন জীবনের ৫০টি বছর। স্থানীয় এক এনজিও থেকে কিস্তিতে ৩২ হাজার টাকা নিয়ে একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যান কিনেন। নিজ এলাকায় কয়েকদিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে রাস্তায় নামেন ভ্যান নিয়ে। বর্তমানে ওই ভ্যান বিক্রি করে অটো কিনে জায়দা বেগম সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজ এলাকা জোতকাদিরপুর-নারায়ণপুর-বাঘা-আড়ানী সড়কে চালান। যাত্রী পরিবহন করে প্রতিদিন আয় হয় প্রায় ২৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা। প্রতিদিনের ব্যাটারি চার্জ বাবদ ৫০ টাকা। বর্তমানে ছেলেসহ দু’জনের সংসার ভালভাবে চলে। এছাড়া সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা দিতে কোনো অসুবিধা হয় না। খরচবাদে বাড়তি কিছু টাকা জমাও করেন প্রতিদিন। আর্থিক অনটনের মধ্যেও ছেলেকে লেখাপাড়া করাচ্ছেন স্থানীয় স্কুলে। ছেলে জায়দুল হকের বয়স ১৩ বছর। বর্তমানে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। নিজে লেখাপড়া জানে না। তার ইচ্ছা ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা।

জায়দা বেগম বলেন, দেশে বিভিন্ন যানবাহনে পেশাদার নারীচালক আরো দরকার। নারীদের জন্য পরিবহনের বিশেষ কোনো সুবিধা নেই। নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলে নারী চালক বৃদ্ধি পাবে।
বাঘা দরগা মেডিকেল হলের পল্লী চিকিৎসক আবদুল লতিফ মিঞা বলেন, বর্তমানে রাস্তায় যে হারে দুর্ঘটনা হয়। নারীরা সহজে ধৈর্যহারা হয় না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। সেক্ষেত্রে নারীরা গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা হার অনেক কমে যাবে। গাড়িচালক হিসেবে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি নিরাপদ। ফলে রাস্তায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।
স্থানীয় সাবেক বেসরকারি স্ব-উন্নয়নের প্রকল্প কর্মকর্তা আবু বাক্কার সিদ্দিকী বলেন, খামখেয়ালি স্বভাব আর অকারণে ধৈর্যহারা হওয়ার প্রবণতা নারীদের তুলনায় পুরুষের বেশি। তাই স্টিয়ারিং হুইলের উপর নারীর হাতটিই নিরাপদ মনে হয়। গ্রামের নারীরা আগের চেয়ে উন্নত হলেও সার্বিকভাবে তারা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবার আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। যে কোনো সাহসী পেশাতে নারীদের এগিয়ে আসতে পরিবেশ পরিবর্তন হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ