জীবনানন্দের কামনা ছিলো অনাবিল জীবনের

আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০২১, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

সস্ত্রীক জীবনানন্দ দাশ : ছবি ইন্টারনেট
গোলাম কবির:


আজ কবি জীবনানন্দ দাশের ৬৮তম প্রয়াণ দিবস। ১৯৫৪ সালের ২২ শে অক্টোবর এদিন রাত এগারোটা পয়ত্রিশ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার আগে ১৪ই অক্টোবর সন্ধ্যায় বালিগঞ্জে ট্রাম দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন তিনি। আমরা সেই দিনটি সামনে রেখে সক্রেটিসের ভাষায় বেদনাশ্রু মাখা আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করবো (We smile through our tears)।
‘তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও আমি বাংলার পরে রয়ে যাব’। কী গভীর আত্মপ্রত্যয় নিয়ে জীবনানন্দ দাশ এই পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেছিলেন, তাঁর অতৃপ্ত অকাল জীবনাবসানের পর ‘রূপসী বাংলা’-(১৯৬৭’) কাব্যের দ্বিতীয় কবিতায়।

অথচ দানবিক সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মানববিদ্বেষ তাঁকে প্রাচ্যের ভেনিস, জন্মভূমি বরিশাল ছাড়তে বাধ্য করে দেশভাগের অব্যবহিত আগে (১৯৪৬)। আজ আর আফসোস করে লাভ নেই। এই বিষ সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। ধর্মবোধের জন্ম মূলত মানুষে মানুষে সম্প্রীতি অধিকতর প্রগাঢ় করার জন্য। ধর্মকে বলা হয়ে থাকে সুনীতি সাধনার পথ। দুঃখের বিষয় মানুষ ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিদ্বেষ উজ্জীবিত করছে।
দীর্ঘকাল কয়েকটি ধর্ম সম্প্রদায় ভারতে মোটামুটি সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করেছে। বেনিয়া শাসক শোষণ দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে টড এবং হান্টারকে দিয়ে পরস্পর সম্প্রদায়ের মধ্যে সাপে-নেউলে ভাব সৃষ্টির বিষবৃক্ষ উপ্ত করে। তার অশুভ পরিণতি বাংলা তথা ভারত ভাগ। চলে যেতে হলো জীবনানন্দ দাশকে। অথচ কী নিবিড় আত্মশ্লাঘায় নরম কণ্ঠে জীবনানন্দ উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাইনা আর।’ যাবেন না, সেই প্রত্যয়ে যদি জন্মান্তর হয় তবে এই বাংলায় যেখানে ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে; অলস গেঁয়োর মত এইখানে কার্তিকের খেতে।’ (অবসরের গান-ধূসর পান্ডুলিপি)। মানুষ হয়ে জন্মাতে না পারলেও তিনি শঙ্খচিল শালিকের বেশে ‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়’ বলে আগাম বারতা দিয়েছিলেন। হায়, আমরা তাঁর জন্মভূমিকে ছিঁড়ে-ফেঁড়ে-কুরে শতধাবিভক্ত করে ফেলেছি। রাজনীতি আর ধর্মের নামে মানব ধর্মকে বিসর্জন দিয়েছি।
ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধে উজ্জীবিত হননি জীবনানন্দ। তাঁর রচনা-জগৎ জুড়ে দেবতার প্রশস্তি সূচক তেমন উপাদান নেই। ‘রূপসীবাংলা কাব্যে মনসামঙ্গলের প্রসঙ্গ এসেছে বাংলার লোক ঐতিহ্য বুঝাতে। রচনা কিংবা ব্যক্তিগত আচরণে ধর্মের ভেদবুদ্ধি দিয়ে কাউকে পরোক্ষেও আঘাত করেননি। অথচ তাঁকে চলে যেতে হয়েছে-শৈশবের দুই খেলার সাথী মনিলাল-শুকলাল গৃহকর্মির ছেলে অলিমামুদ, আর তিরোধানের পর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ কাব্যের ‘১৯৪৬-৪৭’ শীর্ষক কবিতায় উৎকীর্ণ হয়ে আছে বান্ধবদের নাম, তারা বাংলা নামের নয়। যেমন, ইয়াসিন হানিফ মহম্মদ মকবুল করিম আজিজ-এঁদের স্মৃতি বক্ষে রেখে জীবনানন্দ আর্তনাদ করে বলেছেন, ‘মানুষ মেরেছি আমি তার রক্তে আমার শরীর ভরে গেছে, পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার ভাই আমি।’ (বেলা অবেলা কালবেলা) এর মূল কারণ মতবাদের অবিবেকী উন্মাদনা। যা উভয় বাংলায় দৃশ্যমান ছিলো। সম্প্রতি প্রকাশিত শওকত আলীর ‘অবিস্মৃত স্মৃতি’ যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বহন করে। দেশভাগের পর তিনি পূর্ববাংলায় চলে আসতে বাধ্য হন পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জ থেকে সর্বস্ব রেখে।
জীবনানন্দ বাংলার মুখ দেখে পৃথিবীর রূপ খুঁজতে চাননি। এই রূপকে তিনি নানা মাত্রায় প্রতিবিম্বিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তা প্রত্যক্ষ করে মন্তব্য করেছিলেন ‘চিত্ররূপময়’। এ মূল্যায়ণ অতুলণীয়। জীবননান্দ সম্পর্কে এর চেয়ে সার্থক অভিধা আর হয় না। কারণ চিত্রময়তার মাঝে লুকিয়ে থাকে স্বরূপের অবিকল রূপ। মানুষ কিংবা সচল প্রাণী যাই ভাবুক না কেন, ভাবনার সাথে সাথে একটা চিত্র প্রতিবিম্বিত হয়। তাকে কবি ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে’ ‘রূপের তুলিকা ধরি রসের মুরতি’ আঁকেন। এখানেই কবির শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বিধৃত হয়। ওই যে কালিদাস কিংবা ইমরুল কায়েসের ফোটানো মানস-বাসনার চিত্রগুলো কি আমাদের আকুল করেনা! যাকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রশালায় অনন্যরূপ দিয়েছেন। জীবনানন্দ সমকালের প্রতিনিধি হয়ে চিরকালের ভাবনাকে যেভাবে রূপময় করেছেন। যার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। আমরা অক্ষমরা তাই নানা অভিধায় তাঁতে তুলে ধরে নিজেদের অক্ষমতা প্রকট করি। ধর্মবোধ মানুষকে সহনশীল হতে শেখাবার কথা। মানুষ কতটুকু সহনশীল হতে শিখলো! সে প্রশ্ন রয়েই গেল। এশিয়া-আফ্রিকার কিছু অংশে যে হানাহানি, তার মূলে অনেক কারণ আছে। সেগুলোকে কাজে লাগানো হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদিতার অস্ত্র হিসেবে ধর্মকে। আমেরিকার গত নির্বাচনে মানুষ তার আভাস পেয়েছে। কার্যত, কথায় যতটুকু এরা ধার্মিক, কাজে নয়।
মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তার জন্য জীবননাশের পথে নামতে হবে এমন কদিচ্ছার চিত্ররূপ জীবনানন্দের সৃষ্টি সম্ভারে নেই। ওই ‘আটবছর আগে একদিন’ কবিতায় ‘আরো এক বিপন্ন বিস্ময়’ টুকু আছে মানস-অতৃপ্তির প্রেক্ষাপটে এবং তাঁর তিরোধানের পর অগ্রন্থিত কিছু কবিতায় মতবাদে মদমত্তদের আক্রোশে পৃথিবীর শান্তি বিনষ্টকারি পরিবেশ কবিকে বিমূঢ় করেছে।
মধুসূদনকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি সমকাল, ধর্মের ধুয়ো তুলে। তাঁকে অকালে অনাদরে অবহেলায় বিদায় নিতে হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর তিরোধানের পর ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় দুঃখ করে বলেছিলেন: ‘যিনি যশের পাত্র, তিনি জীবিতকালে যশস্বী নহেন। যিনি যশের অপাত্র তিনি জীবিত কালেই যশস্বী।”
ইতিহাসে এর বহুনজীর আছে। জীবদ্দশায় জীবননান্দকে সম্মান জানাতে সমকাল উদার হয়নি। আমাদের জানামতে নগদ ১০০/- টাকা আর একখানা মামুলি উত্তরীয় দেয়া হয়েছিলো তাঁকে। আজ ভাবলে আমাদের মাথা নত হয়ে আসে। অবশ্য এ নিয়ে কবি কখনো উচ্চবাচ্য করেন নি। কেবল ‘সমারূঢ়’ কবিতায় স্বগতোক্তি করেছিলেন। মসনবির কবি জালাল উদ্দিন রূমি হাজার বছর আগে অনুরূপ ভাবনায় প্রত্যক্ষ ভাবে বলেছিলেন, গাধারাই গুণিদের কাঁধে নৃত্য শুরু করবে অচিরেই। আমাদের দেখার দুর্ভাগ্য শুরু হয়ে গেছে। মোসাহেবি আর মক্করবাজিতে চ্যাম্পিয়ান কিছু ব্যক্তি পদবি পেয়ে জীবনানন্দ দাশদের যেন পরিহাস করছে।
সাম্প্রদায়িক বিষাক্ত নিঃশ্বসে মাতৃভূমি ছাড়তে হয়েছে কবি জীবনানন্দকে। সে অবস্থার পরিবর্তন কতখানি হয়েছে? কারণ ওই একটি মাত্র দাওয়া, যা দিয়ে মানুষকে সহজে মারমুখি করে তোলা যায়। ভুয়া খ্যাতিমান সাজা সে তো মানুষের আদি স্বভাব। মহাকাল ভুয়াদের ছাঁটাই করে। দুঃখের বিষয় ভুক্তভোগীর তা দেখার সময় থাকে না। আমরা বিচারক নই, তবে রবীন্দ্র-উত্তর মনন জগতের পরিশীলিত কবি জীবনানন্দ। যতদিন যাচ্ছে, তাঁর কবিতার স্বাদ নেবার পাঠক অধিকতর বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবনানন্দ মতবাদী জীবনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তির জন্য যেমন নিরাসক্ত থেকে ‘সবুজ ঘাসের দেশ’ আর ‘কার্তিকের নবান্নের দেশের মাধুরী পান করতে চেয়েছিলেন, তেমনটি থাকতে পারলে আমরা অবাঞ্ছিত পরিবেশ থেকে মুক্ত থাকবো। অনাবিল হবে আমাদের জীবন।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।