জীবনানন্দ: সমকাল

আপডেট: নভেম্বর ১১, ২০১৬, ১০:৪২ অপরাহ্ণ

প্রভাতকুমার দাস


…গত সংখ্যার পর
জীবনানন্দের কবিতার জটিল ভাবনাবৃত্ত ক্রমশ দুরূহ হয়ে উঠেছে বলে সাধারণ পাঠকদের অভিযোগকে খ-ন করে সঞ্জয় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন: ‘যে ভাব-প্রকাশ প্রচলিত ভাষায় কুলিয়ে উঠে না তার জন্যে ভাষা হাতড়ে দুর্বোধ্য হবার মানে আছেÑজীবনানন্দ দাশের পরীক্ষার স্থান তাই বাংলা কবিতা করে দিতে বাধ্য।’ ‘বনলতা সেন’ প্রসঙ্গে পরে জীবনানন্দ সাধারণ্যে তাঁর নির্জনস্বভাবে চিহ্নিত হয়ে, পলায়নবাদী বলেও আখ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর শেষ পর্বের কাব্যধারার অভিনবত্বকে অভিনন্দন জানিয়ে সঞ্জয় ‘নিরুক্ত’তে একটি স্বতন্ত্র নিবন্ধ লিখেছিলেন তাঁর কাব্যচর্চায় ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে। তাঁর মতে: ‘যৌবনের শেষে স্থবিরতার পথে সত্যকে খুঁজতে এগিয়ে গেছেন জীবনানন্দ। এ তাঁর এক সম্পূর্ণ নূতন জগতে অভিযান। অথবা বলা যায় সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টি নিয়ে এবার তাঁর অভিযান। এখন আর চোখ তাঁর স্বপ্নমেদুর নয়, জিজ্ঞাসায় তা প্রখর। মন ছেড়ে মননের পথে এসে কবি দেখলেন, আজকের দিনের জীবন আমাদের জটিল সমস্যায় ঘেরা। বিংশ শতাব্দী প্রশ্ন সমাকীর্ণ জীবনকে যখন তিনি বুঝতে চাইলেন তখন তাঁর ভাষা থেকেও স্বপ্নের সেই প্রাক্তন কোমল ঋজুতা ঝরে পড়ছে, ক্রমেই এসেছে তাতে গদ্যভঙ্গি, মিশেছে জটিলতা।’ জীবনানন্দ নিজেও একটি পত্রে সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে তাঁর নিজের কবিতার বিষয়ে জটিলতার উল্লেখ করেছিলেন, আলোচ্য প্রবন্ধের উপসংহারে সেটি উদ্ধৃত করলেন সঞ্জয়: ‘সম্প্রতি আমার কবিতা জটিল হয়ে পড়েছে। আমার শেষের দিকের কবিতায় তেমন প্রসাদ নেই। দোষ হোক গুণ হোকÑএ জিনিস তবু অস্বাভাবিক নয় এবং কাব্য জীবনের একটি অধ্যায় শুধু: শান্তি, ইচ্ছা ও সৎ অন্তঃকরণ থাকলে ভবিষ্যতের দিকে হয়ত নিয়ে যাব কবিতাতে।’ প্রবন্ধটি নিরুক্ততে প্রকাশের সময় পর্যন্ত সঞ্জয়ের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়নি, যদিও এই আলোচনার সূত্রেই বরিশাল আর কলকাতার মধ্যে এক হৃদয়ের সেতু রচিত হলো, অবশ্য জীবনানন্দের ‘হার্দ্য দর্শন’ পেয়েছিলেন আরো কিছু পরে। জীবনানন্দ প্রবন্ধটি পাঠ করে সঞ্জয়কে জানিয়েছিলেন: ‘আপনার প্রবন্ধ পাঠ করে নিজেকে নতুনভাবে জানলাম।’
তিরিশের দশকের শেষ তিন-চার বছর বাঙালি কবিদের মধ্যে প্রগতি ভাবনার ক্রমবিস্তারের ফল ১৯৩৮-এর ডিসেম্বর মাসের ২৪-২৫ তারিখে কলকাতায় ভবানীপুরে আশুতোষ মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সম্মেলনে’র দ্বিতীয় অধিবেশন। তার বছরখানেক পূর্বে সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত প্রগতি (১৯৩৭) সংকলনে প্রেমেন্দ্র, বুদ্ধদেব, সুধীন্দ্র, সমর, সজনীকান্ত প্রভৃতি বিভিন্ন স্বভাষী কবির এক অপূর্ব সম্মেলন ঘটেছিল। লক্ষণীয় যে, অচিন্ত্য-সঞ্জয়-জীবনানন্দ সে সংকলনে অনুপস্থিত। অস্বীকার করা যায় না, গানে কবিতায় গল্পে, সাংস্কৃতিক নানা কর্মোদ্যমে সাম্যবাদের এক ব্যাপক প্রভাব দেখে নতুনভাবে উদ্দীপিত হলেন লেখক-কবি-শিল্পীরা।
১৯৪১-এর বাইশে জুন ফাসিস্ত জর্মন কর্তৃক সোভিয়েত রাশিয়া আক্রান্ত হওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জনযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। কলকাতার টাউন হলের এক সভায় ‘সোভিয়েট সুহৃদ সমিতি’ নামে এক সংগঠন তৈরি হয়। ১৯৪২-এর ৮ মার্চ ‘সোভিয়েট সুহৃদ সমিতি’ আয়োজিত একটি ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সভায় যোগদানের পথে তরুণ কথাসাহিত্যিক সোমেন চন্দ নিহত হন। এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় ফাসিস্ত-বিরোধী সম্মেলন, এ ঘটনার অব্যবহিত পরে ২৮ মার্চ ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ’ গঠিত হয়, বিষ্ণু দে ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যুগ্ম সম্পাদনায়। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের ঠিকানায়, সুভাষ, তাদের সঙ্ঘের পক্ষ থেকে একটি প্রকাশিতব্য কেন লিখি পুস্তিকার জন্য একটি প্রবন্ধ লেখার আহ্বান জানান। পত্রপাঠ ‘খুব তাড়াতাড়ি পৃষ্ঠা তিনেকের একটি প্রবন্ধ নিয়ে পাঠিয়েছিলেন জীবনানন্দ। ১৯৪৪-এর জানুয়ারিতে প্রকাশিত পুস্তিকায় উদ্যোক্তারা এ ধরনের উদ্যোগ নেবার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে মুখবন্ধে লিখেছিলেন: ‘পুরনো সমাজ-ব্যবস্থার বদলে যে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবার উপক্রম হয়েছে তার চাবিকাঠি তাদের হাতে যারা নিজেদের শারীরিক শ্রম একদিন নিয়োজিত করেছে শুধু পরের দাসত্বে। যারা এদের শত্রু তারা আমাদের সকলের শত্রু তাদের বিকাশের জন্যে স্বদেশে ও বিদেশে সকলকে এক করে দিতে হবে। কবি হিসেবে, সমসাময়িক সমাজের কাছে কী দায়িত্ব পালন করতে হবে, কীভাবে তা পালনীয় হবে এসব সম্পর্কে তাঁর নিজের মধ্যেই যে সব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, সেগুলি স্পষ্ট ভাষায় জানালেন এবং সেই সঙ্গে তাঁর নিজের উত্তরও।’ তাঁর মতে: ‘কবিতা কীÑ কী তার কাজ,Ñ কী করে কবিতা গ্রহণ করতে হবে,Ñ এই সব জিজ্ঞাসা সম্পর্কে কবি ও পাঠকের ধারণা ক্রমশই আরো পরিচ্ছন্ন না হলে উভয়পক্ষই অস্বস্তি বোধ করবেন। আমার এবং যাদের আমি জীবনের পরিজন মনে করি তাদের অস্বস্তি বিলোপ করে দিতে না পেরে, জ্ঞানময় করবার প্রয়াস পাই এই কাজটি প্রচার করে যে জীবন নিয়েই কবিতা; যদি ভাবা যায় যে কবিতা মানুষের আধুনিক জীবনকে নিরন্তর ভবিষ্যতের শ্রেয়তর সামাজিক জীবনে পরিণত করে চলেছে তা হলে সে ধারণা ঠিক হবে না। কবিতার ঐতিহ্যের সংস্পর্শে এসে বুঝে নিতে পারা যায় যে কবিতা মানুষের জীবনের কল্যাণ মানসকে অপরোক্ষভাবে চরিতার্থ করবার সুযোগ না দিয়ে বরং জীবনের স্বর্গ ও আঘাটা সবেরই ভয়াবহ স্বাভাবিকতা ও স্বাভাবিক ভীষণতা আমাদের নিকটে পরিস্ফুট করে; আমাদের হৃদয় (ভেবে নেয়া যাক) উপস্থিত হয়: আমাদের জ্ঞানপিপাসু স্বভাবকে সর্বতোভাবে সব কথা জানিয়ে দেবার চেষ্টা করে; আমাদের ভাবনাকে সর্বমানবীয় পরিসর দেয়; অভিজ্ঞতার আত্মপ্রসাদের ভিতর আত্মনাশ ও সকলের সর্বনাশ রয়েছে জানিয়ে মহত্তরভাবে গ্লানিহীন করে দিতে চায়; হৃদয়কে ক্রমশই বিশুদ্ধ করে।’
বস্তুতপক্ষে, কবির কাছে চাপিয়ে দেওয়া দায়বদ্ধতাকে সাত্ত্বীকরণ করে, অনেকটা যেন ফরমায়েশ মতো নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টাকে কখনোই জোর দেননি তাঁর মতো সমাজসচেতন কবি। আলো ও অন্ধকার, বিষাদ ও আনন্দ বৃহত্তর জীবন-সত্যকে মান্য করে নবতর সম্ভাবনার কথাই বলতে চেয়েছেন গভীর বিশ্বাসে। হতাশা ও অবসাদ, ক্লান্তি বা অবক্ষয়কে যুগধর্মের কেন্দ্রীয় সুর হিসেবে উচ্চারণ করেছেন সমাজ ও সমকালের সংকটকে নিজের উপলব্ধ সত্যের আলোকে। একাকী মানুষের হাহাকারে সে সত্য, বিপন্ন দীর্ণ।

তিন.
তাঁর জীবনের শেষ পর্বে, চার বছরের ব্যবধানে দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল: মহাপৃথিবী (১৩৫১) এবং সাতটি তারার তিমির। প্রথমোক্ত গ্রন্থটির পেছনে প্রধান উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ‘কাগজ দুষ্প্রাপ্যতার দিনে হাতে তৈরি কাগজে’ পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল মুদ্রণে সেটি প্রকাশ করেছিল ‘পূর্বাশা লিমিটেড’। সে গ্রন্থকে অভিনন্দন জানিয়ে ‘পূর্বাশা’য় অস্বাক্ষরিত সমালোচনায় স্পষ্টত উল্লেখ করা হয়েছিল: ‘রবীন্দ্রনাথের পর জীবনানন্দ দাশই একমাত্র বাঙালি কবি যার কবিতায় সমগ্রভাবে জীবনবোধের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।’ তাঁরা এ কথাও উল্লেখ করছিলেন: তাঁর কবিমানস প্রসারিত হাতে জড়িয়ে ধরেছে এমন একটি অনুভবকে পরিবেশন করতে হলে যে নূতন রূপকল্প ও নূতন ভাষার দরকার, জীবনানন্দ দাশের কবিতাগুলোতে তার অভাব নেই। বিষয় আর ভাষা, দুদিক থেকেই মহাপৃথিবীর কবিতায় পাঠক নূতনত্বের আস্বাদ পাবেন: আর তাই বইটিকে তাঁরা সার্থক আধুনিক কবিতার বই বলে অভিনন্দিত না করে পারবেন না।’ অন্যদিকে, তাঁর কবিতার দীর্ঘকালের অনুরাগী বুদ্ধদেব, গ্রন্থটিকে নতুন বই বলেই স্বীকার করতে চাননি, তাঁর মতে: ‘মহাপৃথিবীতে কোনো নতুন সুর লাগেনি; বস্তুত এ বই ভিন্ন নামে ‘বনলতা সেন’-এরই পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ।’ তাঁর শেষের দিকের কবিতা কতগুলো ‘বাঁধাধরা বাক্যের বিচিত্র ও অদ্ভুত সংস্থাপনা মাত্র’ মনে করেছিলেন বুদ্ধদেব, তাঁর অভিমত: ‘বাক্যগুলি সুন্দর, কিন্তু সবটা মিলিয়ে কিছু পাওয়া যায় না। এত পুনরুক্তি না বলে নিজের অনুকৃতি বলতে হয় এবং কোনো কবি যখন নিজের অনুকরণ করেন, তখন দেবতারা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। মনে হয় জীবনানন্দ স্বরচিত বৃত্তের মধ্যে বন্দী হয়েছেন, প্রার্থনা করি তিনি তা থেকে বেরিয়ে আসুন, তাঁর কাব্যক্ষেত্রে যৌবনের ফুল ফোটার পরে এবারে প্রৌঢ় দিনের পাকা ফসল ফলুক।’ এরকম সমালোচনায় খুবই অস্বস্তি বোধ করেছিলেন জীবনানন্দ। ‘বনলতা সেনে’র পরবর্তী কাব্যের প্রতি বুদ্ধদেবের এই কটাক্ষ ও ব্যঙ্গ অত্যন্ত করুণভাবে গ্রহণ করতে হয়েছিল কবিকে। কিন্তু সঞ্জয় ভট্টাচার্য যে তাঁর শেষের দিকের কবিতায় পারিপার্শ্বিক চেতনা প্রৌঢ় পরিণতি লাভ করেছে বলে বিশ্বাস করতেন, সে সমাচারে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করছিলেন। যদিও অজ্ঞাতনামা এক অনুরাগীকে তিনি একটি জীবনানন্দই লিখেছিলেন: ‘এ পারিপার্শ্বিক অবশ্য সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে কিন্তু আরো দু-চার রকম চেতনা আছে, আজো যাদের কবিতায় শুদ্ধ করে নিয়ে নির্ণয় করে দেখতে আমি ভালোবাসি। সমাজ যত বিশুদ্ধ, বৈজ্ঞানিক ও কোনো ঐকান্তিক কবি বা মনীষীর জীবনে ঘটে কি? ঘটেনি তো আমার জীবনে। সমাজ ও ইতিহাস সম্পর্কেও আমার কবিতা চেতনা হয়তো দেখিয়েছে, আরো বড় চেতনার উত্তর প্রবেশ চেয়েছে, কিন্তু সেই জ্ঞান দৃষ্টি কি পেয়েছে যা সমাজকে নূতন পথ দেখাতে পারে? কিন্তু কোন কোন কবি তার কবিতার সেই অমোঘ ‘বিজ্ঞান দৃষ্টির’ প্রভাবে সমাজ ও পৃথিবীকে নতুন পথ দেখিয়েছেÑকবি লক্ষিত সেই পথ চেয়ে মানুষ তার প্রাণের আকাক্সিক্ষত সমাজ পেয়েছে। প্রয়াণের প্রথম দিন থেকে শুরু করে আজো আমরা সে সমাজ পাইনি।’ অথচ সমসাময়িককালে, তাঁর নতুন কাব্যধারাকে প্রকাশ্যভাবে তিরষ্কার করে বুদ্ধদেব ভেবেছিলেন সমকালীন রাজনৈতিক প্রবাহের চাপে পড়ে জীবনানন্দ ‘সংক্রমিত, উদ্্ভ্রান্ত, ধর্মচ্যুত’ হয়ে পড়েছেন। তখন পর্যন্ত তাঁকে প্রকৃতির কবি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত দেখতে চান তিনিÑ মনে করেছিলেন জীবনানন্দের সেটাই প্রকৃত স্বদেশ। শুধু বুদ্ধদেব বসুর মতো কবিতাপ্রেমিক বিচক্ষণ সম্পাদক নন, আরো অনেকেই ধরতে পারেননি, তাঁর কবিতার পরিচিত জগৎ মুছে গিয়ে ধীরে গড়ে উঠছে নতুন এক চেতনার প্রসার। জীবনানন্দ সে কথা ভেবে অনেক সময় দুঃখিত হয়েছেন, চিন্তিত হয়েছেন তাঁর কবিতার অপব্যাখ্যা দেখে। বারো-তেরো বছর আগের লেখা ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার উদাহরণ সামনে নিয়ে এক ‘আত্মঘাতী ক্লান্তির অভিযোগ’ এনেছিলেন তাঁর দ্বারা প্রভাবিত কোনো তরুণ কবির কাব্যগ্রন্থে, ‘পূর্বাশা’য় সেই ক্লান্তির প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনে নিজেকে আন্তরিকভাবে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, আরোপিত ও আড়ষ্ট কোনো ‘আশাবাদী মনোভাব’ তৈরি করে, ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। আধুনিক কবিতায় ব্যবহৃত ‘আমি’, কবির নিজের ব্যক্তিগত সত্তা মোটেই নয়, কবিমানসের কাছে সমাজ ও কালের রূপ যেভাবে ধরা পড়েছে, তারই প্রতিভূ সত্তা হিসেবেই তিনি দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন: ‘কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাস-চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।’ তাঁর ‘ইতিহাসযান’ কবিতায় এই আত্মসংকটের সার্বজনিক বিষাদ ধ্বনিত হয়েছিল: ‘সময়ের ব্যাপ্তি সেই জ্ঞান আনে আমাদের প্রাণে/ তা তো নেই; স্থবিরতা আছেÑজরা আছে।/ চারিদিক থেকে ঘিরে কেবলই বিচিত্র ভয় ক্লান্তি অবসাদ/ রয়ে গেছে।’…তিনি চাইতেন, পা-িত্য নয়, তার চেয়ে বড় জিনিস প্রজ্ঞা দিয়ে কেউ একজন বিস্তারিতভাবে তাঁর কাব্য পটভূমিটি বিশ্লেষণ করুন।
মহাপৃথিবী-র মতো সাতটি তারার তিমির গ্রন্থটিকেও অভ্যর্থনা জানাননি বুদ্ধদেব, কবিতা পত্রিকায় সে গ্রন্থের সমালোচনা লিখেছিলেন অশোক মিত্র, তাঁর কাব্যগঠনে এক বিপজ্জনক দুরূহতা লক্ষ করে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বুদ্ধদেব যেমন মহাপৃথিবীতে তাঁর নিজের অনুকৃতি লক্ষ করেছিলেন, অশোক মিত্রও তেমন দেখেছিলেন: প্রতীকে, শব্দ যোজনায়, বাক্য প্রয়োগের বহুলতাই নিজে পুনরুচ্চারণ করেছেন এবং এই পুনরুক্তিতে কোনো আপাত-দার্শনিক সান্ধ্যভাষায় অবচ্ছন্ন। অবশ্য প্রাক্্-পরিবর্তন পর্বের কবিতাগুলোকে তিনি উৎকৃষ্ট হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু সঞ্জয় ভট্টাচার্য ‘পূর্বাশা’য় (আশ্বিন ১৩৫৫) ‘বাংলা কবিতার নূতন দিক’ শিরোনামে জীবনানন্দর সাম্প্রতিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্পষ্টত লিখেছিলেন: ‘ধূসর পা-ুলিপি আর মহাপৃথিবীতে জীবনানন্দ দাশের হৃদয়ধর্ম অতীতে আর প্রকৃতিতে জড়িয়ে থেকে যতটুকু ব্যক্তিগত ছিল সাতটি তারা তিমির-এ তা ইতিহাস পুরুষের অন্তর্গত হয়ে ব্যাপ্তিতে ও বিশালতায় ততটুকুই মুক্তিপ্রয়াসী হয়েছে। এ তাঁর প্রৌঢ় মনেরই উপার্জনÑ তা ছাড়া গত কয়েকটি বছর যে ব্যাভিচারী সময় আমরা উত্তীর্ণ হয়ে এসেছি, কবি মনে তার বাস্তব সংঘাত এ ধরনের একটি প্রশান্ত ও গভীর রূপান্তর এনে দেয়।’
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে, প্রায় একই সময়ে পূর্বাশা লিমিটেড মহাপৃথিবীর দ্বিতীয় সংস্করণ ও সিগনেট প্রেস বনলতা সেন-এর নতুন সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রথমোক্ত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু সিগনেট প্রেস শেষোক্ত গ্রন্থটি প্রকাশ করে জীবনানন্দ-প্রেমীদের কাছে যেন তাঁর পুরনো পরিচয় নতুন করে উপস্থাপন করেছিল। নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলন গ্রন্থটিকে তাঁদের প্রথম প্রবর্তিত পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করেছিল, যদিও সাতটি তারার তিমিরকে উপেক্ষা করে এই গ্রন্থটিকে পুরস্কৃত দেখে স্বয়ং কবিই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। প্রগতিশীল যারা, তারা জীবনানন্দের কাব্যচরিত্র দীর্ঘকাল ধরে প্রশংসাযোগ্য মনে করেননি, বনলতা সেন-এর নতুন সংস্করণ প্রকাশের পর তাদের প্রকাশ্য বিরোধিতা আরো স্পষ্ট এবং তীব্র হয়ে ওঠে। অথচ, তাঁর শেষের দিকের কবিতার যথার্থ মূল্যায়নের প্রত্যাশায়, তিনি দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রকাশিতব্য ‘মডার্ন বেঙ্গলি পোয়েমস’ শীর্ষক গ্রন্থে তাঁর যেসব কবিতা গৃহীত হয়েছিল, তাতে সন্তুষ্ট হননি, কেননা বনলতা সেন-এর পরবর্তী কাব্যধারা তাতে অনুপস্থিত এরকম একটা এন্থলজি মারফত এভাবে মিসরিপ্রেজেন্টেড হয়ে মোটেই আরামবোধ করেননি তিনি। অথচ, কোথাও কোনো আলোচনায় সাতটি তারার তিমির পর্বের সপ্রশংস উল্লেখে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। অরুণ ভট্টাচার্যর মতো অর্বাচীন কবির একটি আলোচনা পড়ে এতটা মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁকে সে খুশির কথা জানাতে দ্বিধা করেননি, তা সত্ত্বেও পত্র মারফত তাঁকে জানিয়ে ছিলেন: ‘আমার ধূসর পা-ুলিপি বনলতা সেনের পরবর্তী কাব্য এক-আধজন ছাড়া এ দেশের বড় সমালোচকের পছন্দ হয় না। সাধারণ পাঠক ও সমালোচকদের প্রায় সকলেই খুব সম্ভব আমার শেষের দিককার কবিতাগুলোকে দুরূহ নাকি দুর্বোধ্য?Ñভেবে ছেড়ে দেয়।’
স্বাধীনতা ও দেশ বিভাগের অব্যবহিত পূর্বে কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছিলেন, সুতরাং আবার অবধারিত বেকারত্বের যন্ত্রণায় তাঁকে বিদ্ধ হতে হয়েছে দীর্ঘকাল। বেকারত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর বাসস্থানের সংকট। অল্প কিছুদিনের জন্য এ সময় আবার কথাসাহিত্য রচনায় হাত দিয়েছিলেনÑ অনেকটা সুপরিকল্পিতভাবেই, যদিও জীবিতাবস্থায় তার একটিও লোকচক্ষুর সামনে উপস্থিত করেননি, হয়তো তিনি জানতেন, তাঁর কবিতার মতোই, গল্প-উপন্যাসগুলো গ্রহণ করবার মতো পাঠক তখনো তৈরি হয়নি। আসলে বনলতা সেন-এর সিগনেট সংস্করণ প্রকাশিত হলে তাঁকে ‘নির্জনতম কবি’ হিসেবে আবার তিরস্কৃত করবার একটা সহজ ঝোঁক দেখা গিয়েছিল মূলত প্রগতিবাদীদের মধ্যে। শান্তিনিকেতন ‘সাহিত্য মেলায়’ সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে কিছুটা কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, পরে ‘পরিচয়’ পত্রিকাতেও ‘নির্জনতম কবি’ শিরোনামে বনলতা সেন-এর সমালোচনায় তাঁকে জীবন-বিদ্বেষী ও শূন্য সাধনার গুরু হিসেবে অভিহিত করে তাঁর একাকিত্বের বোধকে বিদ্রƒপে বিদ্ধ করেছিলেন। সীমান্ত কিংবা সাহিত্যপত্রেও মণীন্দ্র রায় তাঁর কবি-আত্মার স্বরূপটি সঠিক নির্ধারণ করতে পারেননি। সে সময় সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সমালোচকেরও মনে হয়েছিল, ‘হেমন্তের কবি হিসেবেই তাঁর বড় পরিচয়, বিষণœতাই তার মূলধন, স্তিমিত নিদ্রাচ্ছন্নতায় তিনি ভ্রান্তিবিলাসী হেমন্তের আধ-আধ কুয়াশা এবং শান্ত প্রকৃতিই তাঁর যোগ্য প্রকৃতি।’ সমকালের এই মত কূট মন্তব্যে তিনি বিচলিত বোধ করতেন সে কথা সত্যিÑ তা সত্ত্বেও সুরজিৎ দাশগুপ্তকে একবার এসব সমালোচনার উত্তর দেওয়ার বিষয়ে নীরব থাকার পরামর্শ দিয়ে জানিয়েছিলেন: ‘আমার কবিতা সম্বন্ধে নানা জায়গায় নানা রকম লেখা দেখেছি, মন্তব্য শুনেছি; প্রায় চৌদ্দ আনি আমার কাছে অসার বলে মনে হয়েছে; কিন্তু এ নিয়ে বিতর্কে নেমে বিশেষ কোনো ফল হবে না। আমাদের দেশে বড় সমালোচক নেই-ই একরকম। আমার মনে হয়, প্রত্যেক সৎ কবিই তার নিজের কাব্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমালোচক; সেই হিসাবে নিজের কাব্য বিশ্লেষণ করে এদের প্রত্যেকেরই দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখা দরকার, শরীর মনের সুস্থতা ফিরে পেলে লিখব ভাবছি।’ এ চিঠি লেখার ঠিক এক মাস আগে তিনি তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র ভূমিকাতেই প্রায় একই সুরে বলেছিলেন: আমার কবিতাকে বা এ কাব্যের কবিকে নির্জন বা নির্জনতম আখ্যা দেওয়া হয়েছে; কেউ বলেছেন, এ কবিতা প্রধানত প্রকৃতির বা প্রধানত ইতিহাস ও সমাজচেতনার, অন্যমতে নিশ্চেতনার; কারো মীমাংসায় এ কাব্য একান্তই প্রতীকই; সম্পূর্ণ অবচেতনার; সুররিয়ালিস্ট। আরো নানা রকম আখ্যা চোখে পড়ছে। প্রায় সবই আংশিকভাবে সত্যÑকোনো কোনো কবিতা বা কাব্যের কোনো কোনো অধ্যায় সম্বন্ধে খাটে; সমগ্র কাব্যের ব্যাখ্যা হিসাবে নয়।’ পাঠক ও সমালোচকদের সুবিবেচনার প্রত্যাশী থেকেও, শেষ পর্যন্ত এক গভীর অসন্তোষের মধ্যে নিজেই আলোচনা শুরু করবেন, হয়তো সে সময়েই তাঁর অকস্মাৎ প্রয়াণ হলো।
আসলে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ব্যক্তির দর্পণে যে সমষ্টির সামগ্রিক বোধকে তিনি প্রতিনিধিত্ব দিতে চেয়েছিলেন, তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব কাব্যভাষায়, সমকালে সেই ভাবনাকে সঠিকভাবে কিংবা সামগ্রিকভাবে কারো পক্ষে স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর নিজের সমসাময়িকতাকে তিনি অনুভব করেছিলেন এক দূরদর্শিতার নিরিখে, স্পষ্টত সমসময়ের অন্য ভাবনায় প্রভাবিত লেখকসমাজ তাঁকে, তাঁর অগ্রবর্তিতাকে তাই সঠিক আন্তরিকতায় গ্রহণ করতে পারেননি। এক শুভ জাতক পৃথিবী রাষ্ট্রের দুর্মর কল্পনায় তিনি প্রতি মুহূর্তে চিন্তিত হয়েছেন;Ñএক অনন্ত সূর্যোদয়ের প্রতি উন্মুখর অপেক্ষায় তিনি বাস্তবের রক্ততটে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন আপন দুশ্চিন্তায়। বিষণœতা, অবসাদ, মৃত্যু ও অবক্ষয়, আলো-অন্ধকার, নিরাশা আর বেদনায় বিক্ষত তাঁর কবিহৃদয় বারবার বিচলিত হয়েছে তাঁর স্বভাব নিঃসঙ্গতায়। এক ‘সময়ের অমেয় আঁধারে’ বিঘূর্ণিত হয়েছে তাঁর কবিসত্তা। নগর জীবনের দুর্বিষহ প্রবঞ্চনার মধ্যে বিধ্বস্ত তাঁর ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত হয়েছে তাঁর সমকাল-সচেতন কবিতাবলি। নিছক কোনো বেদনা-বিলাসের মধ্যে, এককিত্বের মধ্যেÑমানবসমাজ ও প্রকৃতি, জীবন ও মৃত্যুর পারস্পরিক আকর্ষণ-বিকর্ষণের বিধুর সমবেদনায় তাঁর কবিতা অন্য মাত্রা পেয়েছে। তাঁর কবি-চেতনার অভিঘাতের পারম্পর্য ও ধারাবাহিকতা গভীরভাবে উপলব্ধি করার যে কাজ শুরু হয়েছিল তাঁর জীবিতাবস্থায়Ñ এতেই তাঁর কবিজীবনের মূল প্রাণশক্তি নিহিত আছে।
সমাপ্ত