বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

জীবনের প্রতিচ্ছবি : ভাল-মন্দ মিলায়ে সকলি

আপডেট: December 1, 2019, 1:23 am

ড. এএইচএম জেহাদুল করিম


বেশ কিছুদিন আগে পুরাতন পত্রিকা ও সংগৃহীত লেখাগুলো ঘাটতে গিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও লেখিকা সেলিনা হোসেনের ‘আলো ও অন্ধকারের মুখোমুখি’ শিরোনামে তাঁর স্মৃতি-সংবলিত ছোট্ট একটি লেখা গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ছিলাম এবং বলতে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে টেবিলে বসেই আমার আজকের লেখাটি লিখে ফেলেছিলাম। এখানে বলা প্রয়োজন যে আমি যেহেতু কোনো গল্প লেখক নই, সুতরাং অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এটি পুরানো কাগজের স্তুপেই এটি পড়েছিল এই কয়টা দিন। আজ আবার একটু হাতে সময় পাবার কারণে, এই ভূমিকাটুকু দিয়ে লেখাটি পত্রিকায় ছাপাবার জন্য পাঠালাম।
সেলিনা হোসেন তাঁর গল্পে অত্যন্ত দুঃখপূর্ণ হৃদয়ে, ১৯৯৪ সালে বেঙ্গল স্টাডিজ কনফারেন্স থেকে ফিরবার সময়, তাঁর নেদারল্যান্ড সফরের একটি অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। সেলিনা হোসেন কনফারেন্সটি শেষ করে তাঁর ডাচ বন্ধু হেনি রুমকেসের সাথে দেখা করে ফেরবার সময়ে একজন ডাচ টিকিট চেকার সেলিনা হোসেনকে কিভাবে প্রতারিত করেছিল সেটি বর্ণনা করেছেন তাঁর সত্যিকার গল্পের মাধ্যমে। ভীষণ টাচি সে গল্পটি; অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। এর অবশ্য একটা কারণও রয়েছে। কেননা ১৯৯৪ সালে নেদারল্যান্ডে বেঙ্গল স্টাডিজের সেই কনফারেন্সে, আমিও আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। সেলিনা হোসেন ছাড়াও সেদিনের সেই সেমিনারে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম, ড. মুনতাসীর মামুন, নাট্যকার সাইদ ভাই, বেশ কিছু ছায়াছবির প্রখ্যাত পরিচালক এবং আরো অনেকেই ছিলেন। সেমিনারটির সংগঠক ছিলেন ডাচ ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানী উইলেম ভ্যান স্যান্ডেল। আমস্টার্ডাম থেকে বেশ অনেকটা দূরে সুন্দর একটা নির্জন গ্রামীণ পরিবেশে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। হল্যান্ডের সেই সুন্দর গ্রামীণ পরিবেশে বিকেলের দিকে সেলিনা আপাকে আর দু’এক জনের সাথে হাটতে দেখে, আমিও তাঁর সঙ্গ নিলাম। এরও একটা কারণ রয়েছে; সেলিনা আপা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। আমি প্রায় চল্লিশ বছর সেখানে শিক্ষকতা করেছি। আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, প্রফেসর কবি জুলফিকার মতিনের তিনি সহপাঠী। স্বভাবতঃই সেলিনা আপাকে আমাদের একান্ত আপন ভাবাটাই স্বাভাবিক। সেই সেমিনার থেকে তিনি তাঁর বান্ধবী হেনি রুমকেসের সাথে কয়েকদিন অবস্থান করে ফেরার সময় এমন একটা করুণ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন যা মনে করেই আমার এই ঘটনাটি লিখবার তাগিদ অনুভব করলাম। কেননা আমার গল্পের সাথে সেলিনা আপার গল্পের ঘটনার আংশিক মিল ও কিছুটা বৈপরীত্য খুঁজে পাওয়া যাবে।
যদিও অনেক আগের ঘটনা সেটি; ১৯৮৪ সালে, আমি সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স প্রোগ্রামে অধ্যয়ন করবার জন্য ক্যানাডার লেইকহেড বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন করি। অন্টোরিও প্রদেশের একেবারে উত্তরে, Thunder Bay শহরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। সুন্দর ছোট্ট এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পৃথিবীর বৃহত্তম লেইক সুপিরিয়রের পাড়ে অবস্থিত। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, বিদেশি আছে বেশ, কিন্তু বাঙালি নেই বললেই চলে। ভূগোল বিভাগে প্রফেসর হারুণ-অর-রশীদ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ছিলেন কলকাতার প্রখ্যাত ক্রিকেট কমেন্টেটার বেরী সর্বাধিকারীর ভাইপো ড. প্রদীপ সর্বাধিকারী। প্রদীপদার স্ত্রী ছিলেন একজন চেক মহিলা; বাড়িতে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের সাথে বাংলা বলতে পারতেন না বলেই সম্ভবতঃ আমাকে দেখলেই বলতেন, ‘করিম এসো আমার রুমে, গল্প করি।’ তাঁর এই আন্তরিকতাটুকু আমার বেশ ভালই লাগত।
যাইহোক, আমি লেইকহেডে পড়তে যাবার সময় আমার স্ত্রী ও বড় মেয়েটিকে রেখে গেছিলাম দেশে। প্রায়শঃই বেশ খারাপ লাগত। তাই এই মানসিক কষ্টটাকে কাটিয়ে উঠতে মাঝে মধ্যে একটু আধটু বেড়াতে বেরুতাম। এভাবেই ১৯৮৪ সালে একদিন অটোয়াতে অনুষ্ঠিতব্য ক্যানেডিয়ান এশিয়ান স্টাডিজের একটি সেমিনারে যোগ দেবার জন্য ট্রেনে চেপে বোসলাম। বলাই বাহুল্য যে সম্পূর্ণ টিচিং এসিস্টেন্ট্শিপের উপর নির্ভরশীল আমার মত একজন বাংলাদেশি ছাত্রের জন্য Thunder Bay থেকে অটোয়াতে যাবার জন্য এটাই সবচাইতে সহজ বলে মনে হয়েছিল। থান্ডার-বে থেকে অটোয়ার দুরত্ব অনেক; প্লেন একটু ব্যয়বহুল, বাস- মন্দ নয়। তবে পাশ্চাত্যদেশে ট্রেনভ্রমণ বেশ আনন্দদায়ক, তাই আমি ট্রেনেই যাবার সিন্ধান্ত নিলাম।
প্রায় ৮০০ কিলোমিটারের দুরত্বকে সামনে রেখে, আমি Thunder Bay থেকে আমার ভ্রমণ শুরু করি। ভালই লাগছিল, বিশাল এই দেশ কানাডা। পাহাড়, লেইক, সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে চলছিল ট্রেনটি। আমি কবি নই, তবে রোমান্টিসিজম আছে। এত দূর দেশে স্ত্রী-কন্যাদের ফেলে বেশ একটা প্যাথোজ আমার মধ্যে সর্বদাই কাজ করছিল। দেশের কথা, দেশের নদী, মাঠ-ঘাট, আর সেই সাথে অতি প্রিয়জনদের স্মৃতিভরা মুখগুলো মনে হচ্ছিল। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই, প্রকৃতিকে দেখতে দেখতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছিলাম। ভীষণ কান্না পাচ্ছিল; এমনি সময়ে টরন্টো পৌঁছাবার কিছুটা আগেই জানতে পারলাম যে অটোয়া আরও অনেক দূর, তবে টরোন্টো অতি কাছে। কনফারেন্স শুরু হতেও সময় রয়েছে আরও দু’দিন। মনে হলো টরন্টোতে বন্ধু ইসমাইল রয়েছে, স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে। ভাবলাম, তাঁর সাথে একটু দেখা করে গেলে মন্দ হয়না। পারিবারিক শুন্যতায়, আমার মনটাও তাঁর সান্নিধ্যে কিছুটা হাল্কা হতে পারেÑ কেননা তিনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই বন্ধু, টরন্টো ইউনিভর্সিটিতে পিএইচ.ডি করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার টিকিট রয়েছে অটোয়া পর্যন্ত এবং এখানে যাত্রাবিরতি করতে গেলে হয়তো আমাকে কিছু পয়সা গচ্চা দিতে হতে পারে। এমনি অবস্থায়, ট্রেনে অবস্থানকারী টিকিট চেকারকে, আমি আমার মনের ইচ্ছার কথাটি বললাম। টিকেট চেকার আমাকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বলল, No problem, you may use the same ticket, tomorrow or day after tomorrow, while you take a break at Toronto. সে আরও বলল যে, এর জন্য আমাকে কোনো অতিরিক্ত ভাড়াও দিতে হবে না। আমি তাঁকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ধন্যবাদ দিয়ে কিছুক্ষণ পরেই টরন্টোতে নেমে পড়ি। টরন্টোতে নেমে, বন্ধু ইসমাইলকে ফোন করে তাঁর বাসায় চলে যাই।
যথারীতি টরন্টোতে দুই দিন অবস্থান করে, অটোয়ায় গেলাম। সেমিনারে অংশগ্রহণকারী হিসাবে অটোয়া ইউনিভার্সিটিতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। সেমিনার শেষে বন্ধু তরফদার এসে নিয়ে গেল তাঁর বাসায়। তরফদারের স্ত্রী লাইলী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্রী, সুতরাং আর অটোয়া ইউন্ভিার্সিটির হোস্টেলে থাকাই চলে না।
এইভাবে কয়েক দিন অটোয়ায় কাটিয়ে আবার ট্রেনে চাপলাম যথারীতি। এবার ফিরে যাবার গন্তব্যস্থল আমার শহর Thunder Bay । বন্ধু তরফদার ও তাঁর স্ত্রী স্টেশনে এসে বিদায় দিয়ে গেল। এইভাবে আবার ফিরে যাচ্ছি- রাতের ট্রেন চলতে শুরু করেছে। মাঝে মধ্যে কোনো কোনো স্টেশনে দু’একজন যাত্রী উঠছে, নামছে। প্যাসেঞ্জার নেই বললেই চলে। ক্যানাডার এই এলাকাগুলো অন্টারিও প্রদেশের উত্তরাংশ। প্রচুর শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি, অনেক ক্যানাডিয়ান ইন্ডিয়ানদের বাস এখানে। স্টেশনের ক্ষীণ আলোতে, এই ধরনের জাতিগোষ্ঠীর কিছু লোকদেরকে দেখাও যাচ্ছে।
এভাবেই কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ দেখি আমার সিটের কিছু দূরে, কয়েকজন ক্যানাডিয়ান হোয়াইট যুবক। বসে বেশ হৈ চৈ করছে। মাঝেমাঝেই ভীষণভাবে অট্টহাসি এবং তার সাথে ‘প্যাক’, ‘প্যাক’ শব্দে চিৎকার করছে। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে তারা প্যাকি প্যাকি শব্দে আমাকে উদ্দেশ্যে করেই মূলতঃ সেই মুহূর্তে বিশ্রী ইঙ্গিতের এই শব্দগুলো উচ্চারণ করছে। আর এটিও বুঝতে পারলাম যে এরা ট্রেনে কিছুটা ডিংকও করেছে। পাশ্চাত্য দেশে, আর যাই হোক, ট্রেনে ড্রিংক করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কানাডাতে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদেরকে তারা পাকিস্তানি বলে মনে করে এবং তাদেরকে tease করবার জন্য তাদের উদ্দেশ্যেই এই শব্দটি ব্যবহার করে।
তাদের এই ধরনের উপহাসে, আমি নিজেকে বেশ ছোট মনে করছিলাম। কিন্তু বিদেশের মাটিতে নিজেকে সংযত রেখে, তাদেরকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছিলাম। আমার এই বিব্রতকর অবস্থাটি দেখে সম্ভবতঃ ট্রেনের অন্য সহযাত্রী প্যাসেঞ্জার এবং টিকিট চেকাররাও হয়তঃ বেশ খারাপ বোধ করছিল। যাই হোক, ভাবছিলাম, একটু পরেই তো নেমে পড়ব, থান্ডারবে আর বেশি দূরত্বে নয়। এরই মধ্যে হঠাৎ করে দেখি, থান্ডারবে স্টেশনের সিগনাল পয়েন্টের কিছু আগে, ট্রেনটি থেমে গেল। পুলিশের কিছু লোক অতিদ্রুত ট্রেনটিতে উঠে পড়ল এবং মদ্যপ সেই যুবকদেরকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে গেল। আমি অপলক নেত্রে চেয়ে দেখলাম।
লেখক: আন্তর্জাতিক গবেষক। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর।