জীবন যুদ্ধে হার না মানা ভ্যানচালক জায়দা

আপডেট: মার্চ ৮, ২০১৭, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা



রাজশাহীর বাঘায় জয়দা বেগম নামের এক নারী জীবন যুদ্ধে হার মানেন নি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দু-মুঠো ভাতের জন্য কিস্তিতে কেনা ভ্যান নিয়ে এলাকা থেকে এলাকায় ছুটে বেড়ান। জায়দা বেগমের বাড়ি বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে।
জায়দা বেগম জীবন জিবীকার তাগিদে গৃহিণী পেশা ছেড়ে ধরেছে ভ্যানের হ্যান্ডেল। সমাজে পুরুষের পাশাপাশি জায়দা বেগম আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে পেশা হিসেবে অনেক নারী বেছে নিচ্ছেন গাড়ি চালানোকে। যাদের দেখা মেলে শহরে। তবে চালকের আসনে এখন গ্রামের রাস্তায় নেমেছে এই প্রথম নারী স্বামী পরিত্যক্তা জায়দা বেগম। স্বামী শাহা জামাল আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্রে চলে গেছে। তারপর সে নিরুপায় হয়ে পড়ে। অবশেষে ভ্যান চালানোকে পেশা বেছে নিয়েছে।
জায়দা বেগমের জন্ম দরিদ্র পরিবারে। অন্যদিকে কালো চেহারার বলে কেউ বিয়ে করতে চায় নি। ফলে ৩০ বছর বয়সে বিয়ে করেন। বছর খানেক সংসার করেন। তারপর একটি সন্তান জন্মের আগে স্বামী অন্যত্র চলে যায়। তখন জীবন-জীবিকার তাগিদে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। ইতোমধ্যে জন্ম নেয় ছেলে সন্তান। অভাবের সংসারে ভারতের সীমান্তবর্তী পদ্মার দুর্গম বাংলা বাজার চর ছেড়ে ছেলে জায়দুল হককে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ২০ বছর আগে চলে আসেন উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে। এই গ্রামে ৫ কাঠা জমি কিনে শুরু করেন নতুন জীবন। খেয়ে পরে বেঁচে থাকার তাগিদে কোন পেশাকে ছোট করে দেখে নি জায়দা বেগম। এভাবেই পার করেন জীবনের ৫০টি বছর। আড়াই মাস আগে স্থানীয় এক এনজিও থেকে কিস্তিতে ৩২ হাজার টাকা নিয়ে একটি মটর ও ব্যাটারি চালিত ভ্যান কিনেন। নিজ এলাকায় কয়েকদিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে রাস্তায় নামেন ভ্যান নিয়ে। জায়দা বেগম সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজ এলাকা জোতকাদিরপুর-নারায়নপুর-বাঘা সড়কে ভ্যান চালান। যাত্রী পরিবহন করে প্রতিদিন আয় হয় প্রায় ২৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা। প্রতিদিনের ব্যাটারি চার্জ বাবদ ২০ টাকা। বর্তমানে ছেলেসহ দুইজনের সংসার খরচ চলে। এছাড়া সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা দিতেও কোন অসুবিধা হয় না। খরচবাদে বাড়তি কিছু টাকা জমাও করেন প্রতিদিন। আর্থিক অনটনের মধ্যেও ছেলেকে লেখাপাড়া করাচ্ছেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছেলে জায়দুল হকের বয়স ১৫ বছর। বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। নিজে লেখাপড়া জানে না। তার ইচ্ছা ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা।
কথা হয় জায়দা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশে বিভিন্ন যানবাহনে পেশাদার নারী চালক আরো দরকার। নারীদের জন্য পরিবহনের বিশেষ কোন সুবিধা নেই। নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলে নারী চালকের বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও উপাধ্যক্ষ নছিম উদ্দীন বলেন, বর্তমানে রাস্তায় যে হারে দুর্ঘটনা হয়। নারীরা সহজে ধৈর্যহারা হয় না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। সেক্ষেত্রে নারীরা ভ্যান চালকের আসনে আসলে দুর্ঘটনা হার অনেক কমে যাবে। গাড়ি চালক হিসেবে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি নিরাপদ। ফলে রাস্তায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।
স্থানীয় বেসরকারি স্বউন্নয়নের প্রকল্প কর্মকর্তা আবু বাক্কার সিদ্দিকী বলেন, খাম খেয়ালি স্বভাব আর অকারণে ধৈর্যহারা হওয়ার প্রবণতা নারীদের তুলনায় পুরুষের বেশি। তাই স্টিয়ারিং হুইলের উপর নারীর হাতটিই নিরাপদ মনে করেন তিনি। তার মতে, গ্রামীণ নারীরা আগের চেয়ে উন্নত হলেও সার্বিকভাবে তারা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবার আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। যে কোন সাহসী পেশাতে নারীদের এগিয়ে আসতে পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ