জেলহত্যা দিবস : কিছু স্মৃতি রক্তাক্ত কারাগার

আপডেট: নভেম্বর ২, ২০২২, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

আহসানুর রহমান আহাসান:


১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু এবং তার রাজনৈতিক কর্মী জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর বাংলাদেশের গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া সকলেই শোকে মুহ্যমান হয়েছে। সবাই হয়েছে হত-বিহব্বল। এই জঘন্যতম হত্যাকা-ের প্রতিশোধ নেবার জন্য কেউ কেউ প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমেছে। কেউ কেউ অস্ত্র নিয়েই প্রতিশোধের জন্য বেরিয়ে গেছে। অনেকেই প্রস্তুতিও নিয়েছে প্রতিশোধ আর প্রতিরোধের উপায় নিয়ে। আমরা কয়েকজন তাই করেছি। আমাদের বয়স তখন ১৮-১৯ বছর। কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ি। রাজশাহীর উপশহরের এমন কয়জন আমি, আকবারুল হাসান মিল্লাত (বর্তমানে দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক), গোলাম ফারুক বেলাল (এখন নওগাঁয় গ্রামের বাড়িতে থাকে), মরহুম আনোয়ারুজ্জামান শিল্টু (বেশ কয়েক বছর আগে রোগে ভুগে মৃত্যুবরণ করেছে), মরহুম বজলুর রশীদ মোল্লা বীনা (ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অবসরপ্রাপ্ত এবং নামের একটি অক্ষর ভুল বানানের কারণে সার্টিফিকেটহীন মুক্তিযোদ্ধা), বোরহান উদ্দিন মোল্লা জিনু (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অবসরপ্রাপ্ত), মোস্তাক আহমেদ সেন্টু (হোটেল ব্যবসা ছেড়ে এখন ডিম ব্যবসায়ী), আ.ফ.ম. ওবায়দুল হক ববিন (জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তার পদ থেকে এখন অবসরে) মাসেম আলী (বর্তমানে বিএডিসি’তে কর্মকর্তা), আব্দুর রহমান জাহাঙ্গীর (বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত), খন্দকার মোহাম্মদ আলী মুকুল (নওহাটা ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে অবসরপ্রপ্ত), আসাদুজ্জমান আজম (ব্যবসায়ী), আইনুল হোসেন (রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা থেকে এখন অবসরপ্রাপ্ত), এরফান আলী, মরহুম শওকত ওসমান দুলাল, মরহুম সেফাত আলী প্রমুখ একজোট হই। আমাদের সাথে আমাদের বড় কয়েকজন তখন পরামর্শক হিসাবে যোগ দেন। তারা হলেন, মরহুম আওরঙ্গজেব চাচা, মরহুম সামাদ সিদ্দীকি ভাই, মরহুম আবুল ভাই। আমাদের ছোটদের মধ্যে তখন যাদেরকে পেয়েছি তারা হলো, সামিম আহমেদ খেদু (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক), মাসুদ রানা সাহিন (শ্রমিকলীগ নেতা), শামসুজ্জামান রতন (বোয়ালিয়া থানা পশ্চিম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), আতিকুর রহমান বাবু (রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার বিভাগের সিস্টেম এনালিস্টের চাকরি ছেড়ে বর্তমানে কানাডা প্রবাসী)।

সামরিক সরকার এক পর্যায়ে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দিলে ১৯৮৩ সালে আমরা প্রথমেই ‘শহীদ কামরুজ্জামান স্মৃতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ নাম দিয়ে একটি সংগঠন তৈরি করি। এটিই ছিল বাংলাদেশে জাতীয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামানকে নিয়ে প্রথম সংগঠন। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার এবং জাতীয় চার নেতার হত্যাকা-ের প্রতিশোধ নেয়া এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষে বিভিন্নভাবে সাধারণ জনতার মাঝে স্বাধীনতার চেতনাকে পুরোপুুরি ধারণ-লালন, পালন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা।
প্রথমদিকে আমরা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, বাংলাদেশের পতাকার কথা বলেছি। কোন্ কোন্ দিনে- কেমন করে পতাকা তুলতে হবে তাই বলে বলে জনে জনে ঘরে ঘরে ঘুরেছি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা করেছি। স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে এলাকায় খেলাধুলার আয়োজন করেছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার হত্যার বিচারের পথ প্রশস্ত করা। এরই দ্বিতীয় ধাপে আমরা শুরু করলাম আলোচনা সভা। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৭ এপ্রিল, ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর, ১৬ ডিসেম্বর ইত্যাদি দিবসে আমরা আলোচনা-অনুষ্ঠান করতাম। এসব আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিও প্রচার করতাম। তখন ভিসিপি আর টিভি জোগাড় করে কোন এক ঘরে ৩০-৪০ জন একসাথে ভিডিও প্রদর্শন করতাম আর ঘরোয়া আলোচনা সভা করতাম। আমাদের পায়ের নিচের মাটি ধীরে ধীরে শক্ত হতে শুরু হলো। আমরা আমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আরও এক ধাপ এগুলাম। শুরু করলাম প্যান্ডেল করে জনসভার আয়োজন। প্রথম পর্যায়ে আমরা উপশহর মোড়ে কয়েক বছর এই জনসভা করেছি। এইসব জনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার (পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি) ড. আব্দুল খালেক স্যার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার (পরবর্তীতে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান) ড. মিজানুর রহমান স্যার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাষণ দিয়ে এলাকার মানুষদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাদের সেই জ্ঞানগর্ভ ভাষণ শুনে মানুষের মাঝে চেতনা ফিরে আসতে শুরু হলো। এমনও হয়েছে যে ৩ রা নভেম্বরের অনুষ্ঠানে যেন খালেক স্যার আসেন তার বায়না আগে থেকেই এলাকাবাসী আমাদের করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দিবসে আমরা প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ মাইকে বাজাতে শুরু করলাম। তখন এমনও দিন গেছে যে আপেল তার স্ত্রীর জন্য কেনা ব্লাউজের কাপড় দিয়ে পতাকা বানিয়েছে, জিনু তার মেয়ের দুধের টাকা দিয়ে পতাকার বাঁশ কিনেছে।

ধীরে ধীরে ‘শহীদ কামরুজ্জামান স্মৃতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এর নাম সারা রাজশাহীতে পরিচিত হতে থাকলো। আমরাও আরও শক্ত হলাম। শোকের পাশাপাশি আমাদের অর্জন হলো মনের শক্তি। নওহাটার তখনকার বিশিষ্ট ইটভাটা ব্যবসায়ী মাসুদ ভাই (হৃদরোগে যিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন) আমাদের প্রতি অনুরক্ত হয়ে স্থায়ী ঘর করার জন্য এক ট্রাক ইট দিলেন বিনামূল্যে। ঘর তৈরির পূর্বেই আমরা উপশহর মোড়ে ‘উপশহর সমন্বয় সমিতি’ নামক একটি সমবায় সমিতির ছনের চালা ঘরে বসে ‘শহীদ কামরুজ্জামান স্মৃতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এর একটি কমিটি তৈরি করলাম। ওই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলাম আমি – মো. আহসানুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন মো. আনোয়ারুজ্জমান শিল্টু। কমিটির অন্যান্য সদস্যগণ হলেন খন্দকার মোহাম্মদ আলী – সহ সভাপতি, মাসেম আলী – সহ সভাপতি, আবদুর রহমান জাহাঙ্গীর – সহ সভাপতি, বোরহান উদ্দিন মোল্লা – সহ সভাপতি, গোলাম ফারুক বেলাল – সহ সাধারণ সম্পাদক, ওবায়দুল হক ববিন – সহ সাধারণ সম্পাদক, এরফান আলী – সহ সাধারণ সম্পাদক, সামিম আহমেদ খেদু – সাংগঠনিক সম্পাদক, মোস্তাক আহমেদ সেন্টু – কোষাধ্যক্ষ, মাসুদ রানা শাহীন – প্রচার সম্পাদক, মো. শওকত ওসমান – দপ্তর সম্পাদক, সেফাত আলী – সমাজ কল্যাণ সম্পাদক, আকবারুল হাসান মিল্লাত – সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক, আইনুল হোসেন – সহ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক, আবুল হোসেন – ক্রীড়া সম্পাদক, আতিকুর রহমান বাবু – পাঠাগার সম্পাদক। বর্তমান রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং শহীদ এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান জ্যেষ্ঠ পুত্র এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটন এবং বর্তমান রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. নওশের আলীগণও ছিলেন কমিটির সদস্য।
এর পরের ধাপে আমরা উদ্যোগ নিলাম পত্রিকা প্রকাশের। ১৯৮৭ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসে প্রকাশিত হলো “রক্তাক্ত কারাগার” নামক প্রথম পত্রিকা। ‘শহীদ কামরুজ্জামান স্মৃতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এর ব্যানারে এই পত্রিকা বের করা হয়। এটিই হলো শহীদ এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান কে প্রথম প্রকাশ। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে আমাদের এই প্রয়াশকে সকলেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। সেই সময়ে এই ধরনের একটি প্রকাশনা বের করতে বেশ কষ্ট পেতে হয়েছে। সবচাইতে বেশি সহযোগিতা করেছেন লিটন ভাই। এই পত্রিকা বের করতে যাঁদের সাহায্যের কথা না বললেই না তারা হলেন বাচ্চু ভাই। একতা প্রিন্টিং প্রেসের মালিক। ভুবন মোহন পার্কের পাশেই ছিলো তার প্রেস। লেটার হেড প্রেস। তখন রাজশাহীতে একটি মাত্র অফসেট প্রিন্টিং প্রেস ছিলো। সোনালী প্রিন্টিং প্রেস। রাজশাহী বিসিকে ছিলো তার সেই প্রেস। যার মালিক ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুস সামাদ (প্রয়াত)। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে রাজশাহী শহর আওয়ামী লীগ কমিটির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। তার কাছে এই পত্রিকা ছাপানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু এই পত্রিকা ছাপানোর সাহস তিনি করেন নি। উল্টো আমাদেরকে নিরুৎসাহিত করেছেন। তাঁকে তার ছাপানোর খরচ অগ্রিম দিতে চেয়েছি, তবুও তিনি রাজি হন নি। বাচ্চু ভাই সাগ্রহে এই পত্রিকা ছাপানোর দায়িত্ব নিলেন। বাচ্চু ভাই শুধু ছাপানোর দায়িত্বই নিলেন না, তিনি প্রুফ দেখার ব্যবস্থাও করলেন। সেই সময় প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামানিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহাতাব ভাই, শফিকুর রহমান রাজা প্রতিদিন আড্ডা দিতেন, ওই প্রেসে বসতেন। বাচ্চু ভাই তাদেরকে দিয়ে প্রুফ দেখাতেন। এই সময় লিটন ভাই বেগম সুফিয়া কামালের নিকট গিয়ে একটি কবিতা নিয়ে আসলেন এই পত্রিকায় ছাপানোর জন্য। লিটন ভাই আরও বেশ কিছু মৌলিক লেখা এই পত্রিকার জন্য লিখে নিলেন অনেকের কাছ থেকে। শহীদ এএইচএম কামারুজ্জমানের নিজের লেখা কয়েকটি কবিতাও লিটন ভাই দিলেন এই পত্রিকায় প্রকাশের জন্য। এই পত্রিকায় আরও যারা লিখলেন তারা হলেন – শফিকুল আজিজ মুকুল, সনৎ কুমার সাহা, ড. আবদুল খালেক, ড. মিজানুর রহমান কলি, খৈয়াম কোরায়শী, মুহাম্মদ আবদুস সামাদ, মো. আব্দুল মালেক চৌধুরী, মিজান রশীদ প্রমূখ। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্টজন রাজশাহী শহরের বিশিষ্ট আয়কর উকিল আব্দুস সালাম সাহেবের একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রতিবেদন ছাপা হয় এই পত্রিকায়। এই পত্রিকায় আরও যারা লিখেছেন তারা হলেন আনোয়ারুজ্জামান শিল্টু, আমজাদ হোসেন নবাব, জান্নাতুল ফেরদৌস (ছবি), কিংশুক, মো. আবদুস সোবহান, মুহাম্মদ হান্নান, নজরুল ইসলাম, মোঃ রফিকুল আলম (তুহিন), বিপ্লব সাহা, শামীম আহসান খান, গোলাম মোস্তফা, আকবারুল হাসান মিল্লাত প্রমূখ। এই পত্রিকার জন্য বাণী দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই স্মরণিকা প্রকাশের জন্য যারা পরিশ্রম করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিটন ভাই শুভেচ্ছা বাণী দিয়েছিলেন এই পত্রিকায়। তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের চেয়ারম্যান কর্ণেল (অব.) শওকত আলী একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখেছিলেন এই পত্রিকায়।
অনেক সাহস আর পরিশ্রম করে আমরা শহিদ এএইচএম কামরুজ্জমানের স্মরণে বের করলাম “রক্তাক্ত কারাগার”। এটি একটি মৌলিক পত্রিকা এবং জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান এর স্মরণে প্রথম প্রয়াস- এই কথা আমাদের নয়, এটি গবেষণা করে কয়েকটি সংস্থা তাদের প্রকাশিত গ্রন্থে একথা উল্লেখ করেছেন।
লিটন ভাই সেদিন তার শুভেচ্ছা বাণীতে যা লিখেছিলেন তা থেকে দু‘টি লাইনের কথা আমি এখনও ভুলি নাই। তিনি লিখেছিলেন “ …. গুটিকয়েক যুবকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই স্মরণিকা, …. প্রয়াস হয়তো ক্ষুদ্র, পরিসর হয়তো সীমিত, তবুও আগামী প্রজন্ম আমাদের যেন অকৃতজ্ঞ না বলে ….।”
আমরা এখন গর্ব করে বলি ‘আমরা অকৃতজ্ঞ নই’।