‘জেলহত্যা স্বাধীনতার গৌরবে কালিমা’ ||রাজশাহীর বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০১৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব ও রফিকুল ইসলাম




 

দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, কবি, গবেষক ও রাজনীতিক বিশ্লেষকগণ জেল হত্যার শিকার জাতীয় নেতাদের অন্যতম এএইচএম কামারুজ্জামানকে প্রকৃত গণমানুষের নেতা আখ্যায়িত করে বলেছেন, জেলহত্যা আমাদের স্বাধীনতার গৌরবদীপ্ত স্বাধীনতাকে কালমালিপ্ত করেছে। জাতি হিসেবে আমাদের এ কলঙ্কতিলক বয়ে বেড়াতে হবে।
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছেন, এ ঘটনা জাতির জন্য কলঙ্ক। এই ঘটনা স্বৈরশাসনের সূত্রপাত করেছে। জাতীয় চার নেতার অন্যতম এএইচএম কামরুজ্জামান সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক বলেন, তিনি বড় নেতা ছিলেন। তিনি জনগণের সঙ্গে ছিলেন ঘনিষ্ঠ।
তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধে প্রতিদিন কী হয়েছে, কোথায় কীভাবে রক্ত ঝরেছে, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ অর্গানাইজ হয়েছে তা ভেতর থেকে জানতেন তাজউদ্দিনসহ জাতীয় চার নেতা। সেই চারজনকে এভাবে মারা হলো? খন্দকার মোশতাক চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। চার নেতার জেলহত্যার জন্য খন্দকার মোশতাকের কোনো বিচার হয় নি। এটা হতাশার। যুদ্ধাপরাধে জড়িতদের বিচার হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দেখেছি। এদের (খন্দকার মোশতাক ও তার সহযোগীরা) বিচারও এভাবে হলে ভালো হতো।
হাসান আজিজুল হক আরো বলেন, জেল হত্যায় জড়িতদের বিচার হয়েছে। কিন্তু সেটা অনেক দীর্ঘ সময় নিয়ে। ওই সময় বিচার হলে ভালো হতো। ইতিহাস জেলাহত্যায় জড়িতদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না বলে মত দেন তিনি।
জাতীয় চার নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কেমন মূল্যায়ণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কই আর তেমন মূল্যায়ন করেছি। অনেক শাসক এসেছে, যেমন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল তারা তো এসবের কোনো তোয়াক্কাই করে নি। আওয়ামী লীগের আমলে কিছুটা কাজ হয়েছে। তবে জেলহত্যায় জড়িতদের যেভাবে বিচার হয়েছে তাতে আমি পরিতৃপ্ত নই। বিচারটা পড়ে ছিল বহুদিন। এখন যা হচ্ছে তা মন্দের ভালো।


কবি ও লেখক প্রফেসর জুলফিকার মতিন বলেন, জেল হত্যা জাতীয় জীবনের ট্রাজেডি হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধ্বংস করার জন্য তাদের হত্যা করা হয়েছিল। এদেশের ইতিহাসে জাতীয় চার নেতার অবদান অনস্বীকার্য। মুক্তিযুদ্ধে, জাতীয় রাজনীতিতে কামরুজ্জামানসহ জাতীয় নেতাদের অবদান আমরা কোনোদিন ভুলতে পারবো না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। সেই চেতনাকে এগিয়ে নিতে হবে।’


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি প্রফেসর মোখলেসুর রহমান বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সহচর হিসেবে জাতীয় চার নেতা দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের এভাবে খুন হওয়া খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। তাদের অবদান ভুলবার নয়। এএইচএম কামরুজ্জামান রাজশাহীর জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তিনি সর্বসাধারণের নেতা ছিলেন। তাকে যেভাবে হত্যা করা হলো তার নির্মমতা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তার রাজনৈতিক জীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার অবদান আমরা চিরজীবন স্মরণ করবো।


কবি, লেখক ও অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক জাতীয় চারনেতাকে বঙ্গবন্ধুর ‘রক্তবন্ধু’ আখ্যায়িত করে বলেন, জাতীয় চারনেতা ছিলেন সত্যিকার অর্থেই বঙ্গবন্ধুর রক্তবন্ধু। তারা নিজের জীবন দিয়েই তা প্রমাণ করেছেন। দেশের জন্য তাদের আত্মত্যাগ নিজেদের ভেতর ধারণ করেই বাঙালী সত্যিকার অর্থে আত্মপ্রত্যয়ী জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন তারাও থাকবেন। নতুন প্রজন্ম তাদের জানবে, বুঝবেÑএর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি মর্যাদাবান জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে।
অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক বলেন, দেশে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠছিল এই সরকার তা ধীরে ধীরে দূর করছেন। এই সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছেন এবং জাতীয় চারনেতার হত্যাকারীদেরও বিচার করবেন।


শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা বলেন, জাতীয় চারনেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের মতো এত সৎ, নির্ভীক ও জনদরদি নেতা আর দেখিনি। তিনি প্রকৃতপক্ষেই গণমানুষের নেতা ছিলেন। তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্যাগ না করতেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্যরকম হতো। কারণ তিনি ছিলেন একদিকে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর আবার ছিলেন গণমানুষের নেতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় দীর্ঘ নয় মাস তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তারই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তিনি ত্যাগ স্বীকার করেন। এইরকম একটা মহৎ জাতীয় নেতার প্রতি অবহেলা দেশের প্রতি অবহেলারই নামান্তর।
তসিকুল ইসলাম রাজা বলেন, জাতীয় অন্য তিন নেতার কবরস্থান ঢাকায় হলেও শহীদ কামারুজ্জামানের কবরস্থান রাজশাহীতে। রাজশাহীতে হলেও তার প্রতি জাতীয় সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ যেকোন্ োমন্ত্রী-সাংসদ রাজশাহীতে এলেও তাকে জাতীয়ভাবে সম্মান জানানো উচিত। তার মাজারে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো উচিত। এছাড়া তার প্রতি সম্মান দেখাতে চাইলে অবশ্যই তার কবরস্থানের জায়গায় শহীদ কামারুজ্জামান কমপ্লেক্স নির্মাণ করা উচিত। দরকার হলে, কামারুজ্জামানের মাজারের পাশের বাড়িগুলো সরকারি উদ্যোগে অন্য জায়গায় সরিয়ে কমপ্লেক্স নির্মাণ করা উচিত।
তসিকুল ইসলাম রাজা বলেন, শহীদ কামারুজ্জামানকে শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ হচ্ছে তার ছেলেকেও যথার্থ জায়গায়, দলের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেয়া। এটা রাজশাহী বিভাগের জন্যও দরকার। দলকে, দলের নেতৃত্বকে বিকশিত করতে চাইলে এর বিকল্প নেই। তিনি জাতীয় চারনেতার হত্যাকারীদের বিচার এই সরকার করবেন বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।