জোসনার জীবন

আপডেট: আগস্ট ২৬, ২০২২, ৯:০৫ অপরাহ্ণ

আইয়ুব আলী:


মেয়েটা বিয়ের আগের কয়েকটা দিন অস্থির রাত সময় পার করছে। যৌবনের শেষ বেলায় এসে জীবনের অতীত খুঁজে বেড়াচ্ছে সিনেমার টেলরের মত। দেখতে দেখতে বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেছে। এবারের বিয়েটা সে বসবে কি না এ চিন্তায় দিশে হারা। এ বয়সে সমবয়সী বর পাওয়া যায়। তবে ছেলে গরিব ঘরের হয়। আবার ধনী ঘরের বর আসলে দেখা যায় বয়স চল্লিশ পার। বউ ছাড়া, না হয় বউ মরা। কোন কোন বরের বেলায় দেখা যায় আগের বউয়ের সন্তানও আছে। এখন তার খুব মনে পড়ছে খলিল প্রফেসরের কথা। সবে কলেজে চাকরি পেয়েছে। দেখতেও স্মার্ট। তবে মেয়েটির ক্লাস টেনে পড়া পাকা আঙ্গুর ফলের মত যৌবনের কাছে পাত্তা পায়নি। তার ধারণা কলেজের টিচাররা বেশির ভাগই পরক্রিয়া করে বেড়ায়। পাশের বাড়ির হাফিজ প্রফেসরের ঘরে তো দু’বেলা ঝগড়া এই পরক্রিয়া নিয়ে। ক্লাস নাইনে থাকতে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল মিজানুরের। মিজানুর মনে খুব কষ্ট পেয়েছিল। তার মত মেধাবী ছাত্র এই বড়লেখা গ্রামে এখনো কেউ হয়নি। বুয়েট পাশ করে মিজানুর এখন কানাডায় থাকে। মেয়েটি মেট্রিক পাশ করার পরে তার ফুফা একটা বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসে, ছেলে ইন্টারমেডিয়েট ফেল। পড়া লেখা করবে না। বাবার ব্যবসা শিখে ব্যবসা করবে। বহু জমিজমাও আছে সেগুলো দেখভাল করবে। বাড়ির সবাই রাজি কিন্তু মেয়টির মনে ধরলো না। বাড়ির সবার অনুরোধ সে অবজ্ঞা করলো। সে পড়া লেখা করবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তার পরই বিয়ের পিড়িতে বসবে। নিজেকে বটবৃক্ষ করে গড়ে তুলবে লতানো আঙ্গুর ফলের গাছ হতে চায় না। অনার্সে পড়ার সময় বান্ধবীদের বিয়ে হল। তাদের সন্তার আজ বড় হয়েছে। স্মৃতির পাতায় সব বিক্ষিপ্ত হয়ে ধরা পড়ছে। আজ যে ছেলের সাথে বিয়ের কথা চলছে সেই ছেলের বয়স জোসনার বয়সেরই। পরিবারের সবাই আশার ঘর বেধেছে। এবার জোসনার বিয়ে হবেই। কিন্তু ছেলের তো শুধু শরীর। এ ছাড়া সম্পদ বলতে কিছুই নেই। নেই বাবা মা। কোন মতে এমএ পাশ করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে স্বল্প বেতনে চাকরি করে। ছেলেটিও লোভে পড়ে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। মেয়ের নামে জমি আছে। ব্যাংকে অনেক টাকা আছে। অন্তত ছেলেটির চাকরি চলে গেলে জোসনার টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে পারবে। জীবনের নিশ্চয়তা তো থাকবে।
বিয়ের দাওয়াত দিতে গেলেন ছেলেটির বন্ধুর মত মামাকে। মামা সব শুনে ছেলেটিকে বলল, বারে মামু পরের টাকা দেখিস না। দেখবি নগদ টাকা দু দিনেই খরচ হয়ে যাবে। পরে নিজের পরিশ্রমেই বউমাকে খাওয়াতে হবে, আর সারা জীবন পস্তাতে হবে।
ছেলে আলতাবের এত দিন তেমন কোন আত্মীয় পাওয়া যায়নি যে, বিপদে তার পাশে দাড়াবে। এবার বিয়ের কথা চলছে। বিয়ে তো আর আলতাব একা একা করতে পারে না! বিয়েতে আত্মীদের দাওয়াত দিতে হবে। এবার কাকে ছাড়ে আর কাকে দাওয়াত দিবে এটা ঠিক করতে পারছে না। দেখতে গেলে তো সবাই আপন। এছাড়া মেয়ের বাড়িতে বিশাল বড় গরু জবাই করে শত শত লোককে দাওয়া দিয়ে খাওয়াবে। এর মধ্যে যদি আলতাবের বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান না হয় তাহলে তো কোন পক্ষেরই সম্মান থাকে না। জোসনাও বলল আলতাবকে, দেখ পরে কি হবে সেটা তো কেউ দেখতে আসবে না। তোমার বাসায় যদি অনুষ্ঠান না হয় তাহলে আমার পরিবারের সম্মান যে থাকে না। লোকে বলবে কি! এত দিন পর বিয়ে করছি কোন ঘরে। আপাতত সম্মানটা রাখ। তোমার খরচ যা লাগে নিয়ে যাও। তোমার আত্মীদের কিছু খরচ করতে বল। বিয়ের পর হিসেব করে দিয়ে দিব। ও একটা কথা বাকিতে হলেও গলার হার, কানের দুল, হাতের বালা বিয়েতে নিয়ে আসবা। পরে দেখা যাবে। আর বিয়েতে যাত্রী নিয়ে আসবা কিসে করে। কোন নসিমন করিমন আনা যাবে না। অবশ্যই মাইক্রোবাস ভাড়া করে নিয়ে আসবা। কথা মত আলতাব সব ব্যবস্থা করলো। তার বাড়িতে লাখ টাকা দামের গরু জবাই হল। আত্মীয় স্বজন গ্রামবাসি সবাই কে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হল। সবার মুখে বাহবা ধ্বনি। যাক ছেলেটা খুব ধনী ঘরে বিয়ে করছে। জীবনটাই এবার পাল্টে যাবে।
বিয়ের পরে অষ্টমঙ্গলে বরের সাথে কে কে যাবে! নিজের বোনজামাই গেলেই হবে। কিন্তু না। এক চাচা বললো, আমার একটা মাত্র মেয়েজামাই সেও সাথে যাক। তাকে সঙ্গে নিয়ে না গেলে মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজন কি বলবে! শালাবাবুর বিয়েতে গেলে আর তাকে অষ্টমঙ্গলে নিয়ে গেল না। এনিয়ে তমুল তর্ক বিতর্ক। তার আরেক চাচি এসে বললো, লিটনের মেয়েজামাইকে সঙ্গে নিয়ে গেলে আমার দুই মেয়ে জামাইকেও নিয়ে যেতে হবে। এভাবে আলতাবের ফুফুরাও জেদ ধরে বসলো। তাদের মেয়েজামাইদেরও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। আলতাবের এক মামানি তো তার চাচির সাথে ঝগড়া বাধিয়ে দিল। সবাই গেলে মামাতো বোনজামাইরা বাদ পড়বে কেন? খালা তখনো নিরব হয়ে দর্শকের তালিকায়। পরে দেখা গেল আবার দুই মাইক্রোবাস ভাড়া করে সবাই অষ্টমঙ্গলে গেল।
সবাই জামাইজোড়া মানুষ। সবাইকে পোশাক দিতে হবে। এ এক বিশাল খরচ। তাদেরকে খাওয়াতে আবার খাসি কাটা হল। এর জন্য তো সম্মান হানি করা যায় না। জোসনার বিয়েতে এত উপহার দিয়েছে সবাই ভাবাই যায় না! দামি খাট, আলমারি, শোকেস, টিভি ফ্রিজ থেকে শুরু করে ছোট বড় নানা উপহার।
বিয়ের মাস খানেক পর…। আলতাবের বোনজামাই এসে বলছে, আমার টাকা দু চার দিন পরে দিলেও হবে স্বর্ণের দোকানের টাকা দিতেই হবে সামনের হাটে। দেড় লাখ টাকা শুধু আমার কথায় বাকি দিয়েছে।
চাচাতো ভাই বলছে পঞ্চাশ হাজার টাকা মাইক্রো ভাড়া দিতে হবে। আরেকজন এসে বলছে কাপড়ের দোকানের সত্তর হাজার টাকা। ডেকোরেশন বাবদ বিশ হাজার টাকা।
এভাবে সবার খরচের আবদার মিটিয়ে দিল জোসনা। কয়েকদিন থেকে ফোনের মেসেজগুলো পড়ার সময় হয়নি জোসনার। আজ হঠাৎ মনে হল মেসেজগুলো দেখার কথা। দেখে সবাই উইস করেছে। বিভিন্ন প্রশংসা করেছে। এরই মাঝে ব্যাংকের নম্বর থেকে একটা মেসেজ। সেখানে চোখ আটকে গেল জোসনার! তার একাউন্টে মাত্র পনের হাজার টাকা আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর জোসনার তেমন খরচ ছিল না। তার জন্য জমানো টাকা সব এ ব্যাংকেই রাখা ছিল। বিয়ের পর আলতাবকে দিয়ে ব্যবসা করাবে তাই তাকে চাকরিটাও ছেড়ে দিতে বলেছিল। আলতাব বড় বাজারে দোকানের পজিশন দেখে এসেছে। চার লাখ টাকা সিকিউরিটি দিতে হবে। মাসে মাসে ভাড়া দিতে হবে ছয় হাজার টাকা। আর বিভিন্ন কোম্পানির লোকের সাথে কথা বলে এসেছে বোনাস রেটে মালও পাবে। কিন্তু একি গড়ার আগেই ধ্বংস ! আলতাব সব টাকা আত্মসাৎ জোসনার সই জাল করে। জোসনার ঘরে তখন অসীম আঁধার আর আলোর পথ খুঁজে পায় না।