জয়পুরহাটে পীরের আস্তানায় ৫ খুন বিভিন্ন কারণে ১৮ বছরেও শেষ হয় নি বিচার কাজ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১, ৯:০৪ অপরাহ্ণ

জয়পুরহাট প্রতিনিধি:


বিভিন্ন কারণে এবং আইনের জটিলতায় দীর্ঘ ১৮ বছরেও জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বেগুনগ্রাম পীরের আস্তানায় খাদেম সহ ৫ খুনের মামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি রাতে বেগুনগ্রাম চিশতিয়া পীরের আস্তানায় খাদেম ও বাবুর্চিসহ ৫ জনকে জবাই করে নগদ অর্থ সহ আস্তানার প্রায় ৬৩ হাজার টাকার মালামাল লুট করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। নিহতরা হলেন, আস্তানার খাদেম স্থানীয় ধাপশিকটা গ্রামের বৃদ্ধ নুরউদ্দিন, হারুঞ্জা গ্রামের শফির উদ্দিন ফকির এবং বাবুর্চি আক্কেলপুরের জালালপুর গ্রামের দুলাল মিয়া, ক্ষেতলালের বাঘাপাড়া গ্রামের মতিউর রহমান ও বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বড় বেলঘড়িয়া গ্রামের আফাজ উদ্দিন। ঘটনার পরের দিন ২১ জানুয়ারি বেগুনগ্রাম আস্তানায়ে চিশতিয়ার সেক্রেটারী ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা কসবা (গ্যাংগাইর) গ্রামের আব্দুল আজিজ খান অজ্ঞাতদের আসামি করে কালাই থানায় ডাকাতির মামলা করেন। দায় সারাভাবে তৎকালীন প্রশাসন স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু আসামি ঐ মামলায় দীর্ঘদিন হাজত বাস করলেও বর্তমানে আদালত থেকে তারা জামিনে আছেন। পরবর্তীতে জেএমবি’র শীর্ষ নেতা শায়েখ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই ও আব্দুল আউয়াল ঢাকার ম্যজিষ্ট্রেট আদালতে দেশের অন্যান্য ঘটনার সাথে কালাইয়ের বেগুন গ্রামে পীরের আস্তানায় ৫ খুনের ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়। এর আগে শাহজালাল বাচ্চু ও হযরত আলী নামের আরও দুজন আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। ঐসব জবানবন্দী, স্বাক্ষী প্রমাণ এবং তদন্তকালে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া জব্দকৃত ট্রাভেল ব্যাগে লিখা নাম ও খাদেম সহ ৫জনকে জবাই করে হত্যার আলোকে ২১ জনকে আসামি করে গত ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুরের সিআইডি ক্যাম্পের তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক জালাল উদ্দিন আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। আসামিদের মধ্যে চারজন জেএমবি’র সক্রিয় নেতা থাকলেও অন্যরা স্থানীয় গ্রামবাসী। তদন্তে স্বাক্ষী প্রমাণে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও অন্য মামলায় ফাঁসিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ায় জেএমবি’র শীর্ষ নেতা শায়েখ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই ও আব্দুল আউয়ালকে মামলার বিচার কাজ থেকে বাদ দেয়া হয়। এছাড়া তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় জেএমবি’র ৭জনসহ ২৪ জন আসামিকে এ মামলার দায় হতে অব্যাহতি দেয়া হয়। মামলায় মোট স্বাক্ষী করা হয় ৭১ জনকে। কিন্তু অভিযোগ পত্র দায়েরের এক যুগ পেরোলেও মামলার বিচার কাজ এখনও শেষ হয়নি। ফলে বছরের পর বছর মামলা চালাতে গিয়ে নি:স্ব হয়ে পড়েছেন বাদী এবং মামলার সাথে জড়িতরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলোচিত এ মামলাটি বর্তমানে জয়পুরহাটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্বাক্ষী পর্যায়ে রয়েছে। মামলার ৭১ জন স্বাক্ষীর মধ্যে গত ১২ বছরে স্বাক্ষী হয়েছে মাত্র ১৬ জনের। মামলার পরবর্তী স্বাক্ষীর দিন ধার্য আছে আগামী ২৯ এপ্রিল। ওই ঘটনায় নিহত বাবুর্চি আক্কেলপুরের জালালপুর গ্রামের দুলাল মিয়ার বৃদ্ধ অসুস্থ মা ওবেলা বিবি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আর ক’বছর লাগবে হামার সোনা বাবা (নিহত ছেলে দুলাল) হত্যার বিচারের। ১৮ বছরতো হলো। হামি কি দেখে যাওয়া পারমো?। ওর বাপের খুবই সখ ছিল, মরার আগে বিচারের রায় শুনে মরার। কিন্তু ভাগ্যে হলো না। ছ’লের (ছেলে) মত গত বছর হামাক ছ্যাড়ে ওর বাপও মরে গেছে। হামারও অনেক অসুখ। হয়তো হামিও বিচার দেখে যাওয়া পারমো না’।
মামলার রাষ্ট্র পক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট নৃপেন্দ্রনাথ মন্ডল বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি প্রথমে দায়ের করা হয় ডাকাতি ও হত্যার ঘটনা হিসেবে। যেখানে আসামি ছিল অজ্ঞাত। পরে দীর্ঘ দিন তদন্তের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা চারজন জঙ্গী সহ ২১ জনকে আসামি করে পুলিশ অভিযোগ পত্র দেয়। কিন্তু সময় মত আদালতে স্বাক্ষী ও দেশের বিভিন্ন কারাগারে এই চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিরা অন্যন্যা মামলায় হাজতে থাকায় তাদেরকে যথা সময়ে আদালতে হাজির করতে না পাড়ায় (প্রচলিত আইনে আদালতে আসামির উপস্থিতিতে বিচার করার বাধ্যবাধকতার বিধান রয়েছে) এবং করোনার কারণে বিচার কাজ বিলম্ব হলেও এরই মধ্যে ১৬ জনের স্বাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ে চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচার কাজ শেষ হবে’।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ