জয়পুরহাটে বাসে ট্রেনের ধাক্কা, নিহত ১২ রেলগেট ছিল খোলা, ঘুমিয়ে ছিলেন গেটম্যান সাত ঘণ্টা পর উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন

আপডেট: ডিসেম্বর ১৯, ২০২০, ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

জয়পুরহাট প্রতিনিধি:


জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল রেলগেটে ট্রেনের ধাক্কায় একটি বাসের ১২ যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৫ জন। আহতদের বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে পার্বতীপুর থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। জয়পুরহাট ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক খন্দকার ছানাউল হক এসব তথ্য জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও জয়পুরহাট ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার পুরানাপৈল রেলগেটে সকালে রাজশাহীগামী উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেন বাসটিকে ধাক্কা দেয়। বাসটিকে দুমড়েমুচড়ে ট্রেনটি রেললাইনের ওপর দিয়ে প্রায় ৫শ’ মিটার দূরে নিয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৫ জন। আহতদের প্রথমে জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে নেয়ার পর বগুড়ার শজিমেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে আরও দুই জনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে ৩ জন শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
নিহতরা হলেন, জয়পুরহাট সদরের চিত্রাপাড়ার রেজাউল করিম (৩৪), পাঁচবিবি উপজেলার জিয়ার মোড়ের জিয়াউর রহমান (৫২) (বাসচালক), একই উপজেলার আটুল গ্রামের সরোয়ার হোসেন (৩৫) ও তার ছোট ভাই আরিফুর রহমান রাব্বি (২৫), ক্ষেতলাল উপজেলার ইটাখোলা বাজারের সুমন বাঁশফোর (২৭),আক্কেলপুরের চকবিলা গ্রামের সাজু মিয়া (২৬), নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার বিজয়কান্দি গ্রামের বাবুল মিয়া (৪১),জয়পুরহাট সদরের হিচমি গ্রামের রমজান আলী (৩৮) ও দোগাছি বটতলার আব্দুল লতিফ (৩৭), পাঁচবিবির আটাপাড়ার মঞ্জুরুল হক নাসিম (২৭), টাঙ্গাইলের ভুঞাপুর উপজেলার চিতুলিয়াপাড়ার মৃত শুকুর মন্ডলের ছেলে জুলহাস উদ্দিন (৬০) ও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া সাহিখোলা গ্রামের সাইফুল ইসলাম।
জেলা প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম জানান, পুরানাপৈল রেলগেটের গেটম্যান তার দায়িত্ব পালন না করায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের দাফনসহ সার্বিক খরচ বহন করা হবে।
দুর্ঘটনার পর থেকে পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার জন্য উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। চেষ্টা চলছে দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রেন অপসারণের। জেলা প্রশাসক ছাড়াও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাম কবীর, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র রায় এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান রকেট।
এদিকে পাঁচবিবিগামী বাঁধন পরিবহনের বাসটি যখন রেলগেটটিতে ঢুকে পড়ে তখন ক্রসিংয়ের গেট ছিল খোলা। আর সে কারণেই উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেনটির সামনে পড়ে যায় এটি। সরে যাওয়ার আগেই ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। শনিবার (১৯ ডিসেম্বর) সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটার পর ওই রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান পলাতক। ধারণা করা হচ্ছে ওই সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। এ মন্তব্য করেছেন জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সালাম কবির।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, পার্বতীপুর থেকে রাজশাহীর দিকে যাচ্ছিল উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেনটি। পথে জয়পুরহাট থেকে পাঁচবিবি যাচ্ছিল বাঁধন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি। পুরানাপৈল রেলক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনায় হতাহতদের সবাই বাসের যাত্রী। দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে পুলিশ, সদর পুলিশসহ প্রশাসন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। এ ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও জয়পুরহাট জেলা প্রশাসন।
এ ঘটনায় জয়পুরহাট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রেজা হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া রেলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাসির উদ্দিনকে প্রধান করে ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেল মন্ত্রণালয়।
জয়পুরহাট ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক খন্দকার ছানাউল হক বলেন, খবর পেয়ে সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের দল উদ্ধার কাজ শুরু করে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার ছাড়াও ৫জনকে জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের বগুড়ার শজিমেক হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে দু’জনের মৃত্যু হয়।
রেলের পাকশী অঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আব্দুর রহিম বলেন,বগুড়ার সান্তাহার থেকে দিনাজপুরের বিরামপুর পর্যন্ত রেল লাইনে ৩৮টি লেভেল ক্রসিং গেট রয়েছে। তার মধ্যে ২০টিতে ম্যান পাওয়ার আছে। বাকি ১৮টিতে সতর্কতা বোর্ড দেওয়া আছে। যেগুলোতে পথচারীদের সতর্কতা বোর্ড দেখে পারাপার হতে হবে। পুরানাপৈল লেভেল ক্রসিংয়ে তিনজন গেটম্যান ছিল। যাদের পালাক্রমে ৮ ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করার কথা। প্রাথমিক তদন্তে গেটম্যানের কর্তব্যে অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটলেও আমরা গভীরভাবে তদন্ত করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। এ জন্য একটি কমিটিও করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলোতেও ম্যানপাওয়ার নিয়োগের।
জেলা প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে তাদের তিন কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে।
অন্য দিকে জয়পুরহাটের পুরানাপৈলে পার্বতীপুর-রাজশাহীগামী ৩২ নম্বর উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনার সাত ঘণ্টা পর উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। শনিবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুর সোয়া ২টার দিকে চিলাহাটি- রাজশাহীগামী আন্তঃনগর বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাজশাহী অভিমুখে ছেড়ে গেছে। এছাড়া বাকি সাতটি আন্তঃনগর ট্রেন পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রুটে চলাচল করবে।
পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) নাসির উদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার কারণে এই রুটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগযোগ বন্ধ ছিল। ঈশ্বরদী লোকোসেড থেকে রিলিফ ট্রেনটি দুপুর ১১:৫৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে।
পাকশী রেলওয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) শাহীদুল ইসলাম বলেন, উদ্ধারকর্মীরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে ৪৫ মিনিটে দুর্ঘটনাকবলিত ইঞ্জিনটি উদ্ধার করে। রেললাইন সচল করে দুপুর সোয়া ২টা থেকে ট্রেনগুলো এক এক করে গন্তব্য স্থানের দিকে ছাড়া হয়। রেলওয়ে ও পাকশী বিভাগীয় দফতরের স্ব-স্ব দফতরের কর্মকতা, কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে অল্প সময়ে রেললাইন ট্রেন চলাচলের উপযোগী করতে সক্ষম হয়েছি।
জয়পুরহাটের ট্রেন দুর্ঘটনায় সারা দেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ঢাকা-খুলনা ও রাজশাহীর আটটি যাত্রীবাহী আন্তঃনগর ট্রেনের ভ্রমণপ্রিয় যাত্রীদের কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
এর আগে জয়পুরহাটের পুরানাপৈলে ট্রেন ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকাসহ সারাদেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে করে হিলি রেলস্টেশনে আটকা পড়েছে রাজশাহীগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেন, দীর্ঘক্ষণ আটকা থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছিল যাত্রীরা।
শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় হিলি রেলস্টেশনে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনটি আসলেও জয়পুরহাটে ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে এখানেই ট্রেনটি আটকে দেয়া হয় । ফলে টানা ৬ ঘণ্টা আটকে থাকায় চিকিৎসা, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছিল।
ট্রেনের যাত্রী কবির হোসেন বলেন, ব্যবসার কাজে রাজশাহীতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ফুলবাড়ি থেকে ট্রেনে উঠেছি। কিন্তু, ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে সেই সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে হিলি রেলস্টেশনে আটকা পড়ে আছি। দুপুর দেড়টা এখানেই বেজে গেলো এখন কখন যে লাইন ক্লিয়ার হবে আর আমরা কখন যাবো তাতে করে আমাদের তো মাল করাই হবে না, চরম বিপাকে পড়ে গেলাম।
ট্রেনের যাত্রী রফিক ও সিদ্দিক জানান, আমরা রাজশাহীতে পড়ালেখা করি, সে কারণে বরেন্দ্র ট্রেনে করে রাজশাহীতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু জয়পুরহাটে দুর্ঘটনার কারণে ট্রেন যে কখন ছাড়বে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, আমরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ