জয়পুরহাটে ভাগ্য ফিরিয়েছে অতি দরিদ্র দুই নারী

আপডেট: মার্চ ৮, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

শাহাবুদ্দিন, জয়পুরহাট



জয়পুরহাটের বৈষম্য আর বঞ্চনাকে হার মানিয়ে নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছে দুই নারী। সংসারে এখন তাদের মুখে সুখের হাসি।
জয়পুরহাট সদরের ভাদসা ইউপির অজপাড়াগাঁ গোপালপুর গ্রামে মাত্র ১৩/১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় ২২ বছরের তোতামিয়ার সঙ্গে। সংসার জীবনে তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে হয়। ছেলে বড় হয়ে বিয়ে করে আলাদা হয়ে যায়। তারা মেয়েরও বিয়ে দেয়। মেয়ে একটি সন্তান রেখে তাদের দুঃখে ভাসিয়ে মারা যায়। এতে তারা ভেঙে পড়ে। তার স্বামী তোতামিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই শোকে আজও সে ভালভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে নি। তখন থেকে এই অসহায় বিত্তহীন ছাবিলার পরিবারে নেমে আসে চরম দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশা। তখন থেকেই সে মজুরি ছাড়া ৩ বেলা ভাতের চুক্তিতে মানুষের বাড়িতে ও জমিতে কাজ করে এসেছে। অবর্ণনীয় কষ্টে দিনাতিপাত করেছে। এভাবে কষ্টকরে নিজে খেয়েছে, অসুস্থ স্বামীকে খাইয়েছে। এমন করে অভাব ও বঞ্চনা সয়ে তার দাম্পত্য জীবনে কয়েক যুগ পার করে। বছর দুই আগে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো একটি বেসরকারি সংস্থা অতিদরিদ্র কর্মসূচি নিয়ে তার কাছে আসে। তাকে তাদের সদস্য করে নেয়। তাকে নার্সারি করার জন্য প্রশিক্ষণ দেন। বেসরকারি সংস্থাটি প্রশিক্ষণ শেষে ছাবিলাকে নার্সারি করার জন্য ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে দেয়। চারা দেয়। চারার সঙ্গে আয়বর্ধক একটি ছাগলও দেয়। চারা বড় হয়ে বিক্রি উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত প্রায় ১ বছর ধরে তাদের দেহের পুষ্টি যোগানে অর্থও দেয়। এতে করে ছাবিলা এক বছরেই ৪ হাজার ১৫০টি বিভিন্ন ফলজ ও বনজ জাতের চারা ও শাক বিক্রি করে এক লাখ ১২ হাজার ১শ টাকা আয় করে। এখন তার নার্সারিতে বিক্রি উপযোগী বিভিন্ন জাতের ৫ হাজার ৩শ টি ফলজ ও বনজ চারা রয়েছে। রয়েছে ফুলেরও চারা। সে একটি ছাগল থেকে দুইটি ছাগল করেছে। একটি গরু কিনেছে। কিনেছে একটি ভ্যানগাড়ি। নিজের নার্সারিকে আরও সম্প্রসারিত করতে চলতি বছরে নিজের খরচায় .২২ শতক জমি লিজ নিয়েছে। নিজের কুঁড়ে ঘরে সরমজার ছাউনী ছড়িয়ে টিনের ছাউনী দিয়েছে। এবারের মৌসুমে সে দুই লাখ টাকার উর্ধ্বে আয় করবে বলবে আশা পোষণ করছেন। এখন গড়ে তার মাসিক আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। সে নিজের ভাগ্য ফিরিয়ে বসে থাকে নি। নিজের অতি দরিদ্র দেবরের স্ত্রী জুলেখাকে (১৮) নার্সারি করণে উদ্বুদ্ধ করে। তার নার্সারি সংলগ্ন ০.৭ শতক জমি তাকে লিজ নিয়ে দেয়। এখন সেখানে জুলেখা বিভিন্ন জাতের ফলজ ও বনজ চারা উৎপাদন করছে। এ থেকে প্রতি মাসে গড়ে সে আয় করছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। জুলেখাও একটি গরু কিনেছে। ছাবিলা (৫৮) ও জুলেখা (১৮) জানায় তাদের এখন আর কোন দুঃখ কষ্ট নেই। চলতি বছরেই তারা দুই জনে সেমি পাকা বাড়ি করবে। এখন তাদের রয়েছে স্বাস্থসম্মত টয়লেট। তারা আরো উন্নতি করবে। জুলেখা ও তার স্বামী ইউনুসের (২৮) একমাত্র মেয়ে কুলসুমকে (৪) জয়পুরহাট শহরের ভালো কিন্ডার গার্টেন স্কুলে পড়াচ্ছে বলেও জুলেখা জানিয়েছে। তারা এখন সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে শিখেছে। তারা খুবই সুখে রয়েছে।
ভাদসা ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার স্বাধীন ও মহিলা ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম জানায়, তারা তাদের ইউনিয়নের অতি দরিদ্র পরিবারের এ ধরনের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে ও সহায়তাও দিয়ে থাকে। ব্র্যাক জয়পুরহাট প্রতিনিধি আখতার হোসেন জানায়, ব্র্যাকের অতি দরিদ্র কর্মসূচি জয়পুরহাটের ২৯টি ইউনিয়নের ৯৯টি গ্রামে চলছে। এসব গ্রামের এক হাজার ৯৭৮ জন অতি দরিদ্র জনের ভাগ্য ফেরাতে তারা তাদের আয়বর্ধক বিভিন্ন সম্পদ দিয়েছে। এতে করে তাদের ভাগ্য ফিরছে। এক কর্মসূচি শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বের আরো ৮টি দেশে পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে কাজ করছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেসব দেশের শতকরা ৭৫ ভাগ থেকে ৯৮ ভাগ পর্যন্ত অতিদরিদ্র জন মাত্র ২ বছরেই অতি দরিদ্র থেকে তিনটি আয়বর্ধক উৎস তৈরিতে আয় বর্ধক গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে। বাংলাদেশেও এই কর্মসূচির আওতায় অতিদরিদ্রজন ২ বছরে ৩টি আয়ের উৎস তৈরি করে, এভাবে অর্জিত সম্পদের মূল্য দ্বিগুণ করে, দুই বেলা পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে, পরিবার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তৈরিতে ও টেকসই ঘর নির্মাণে, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার ও নিরাপদ পানি পান করার ক্ষমতা গড়ে তুলে শতকরা ৯৮জনই আয়বর্ধক গ্র্যাজুয়েট হতে পারছে।
জয়পুরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, জয়পুরহাটে অতিদরিদ্রজনও এখন ভাগ্য ফেরাচ্ছে। এমন কার্যক্রম তারা মনিটরিং ও পরিদর্শন করছে। এমন উৎসগুলোকে এসব ক্ষেত্রে সবরকম সহায়তা দিতে বলছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবদুর রহিম জানিয়েছেন, তিনি অতি দরিদ্র থেকে ভাগ্য ফেরানো বেশ কয়েকটি কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। তিনি মাসিক সমন্বয় সভায় এমন কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় সহায়তা দিকসমূহ নিশ্চিত করেন। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎসগুলোকে জেলায় এ কার্যক্রমকে আরো বিস্তৃত করতে উৎসাহিত করে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ