জয়পুরহাটে ৭৪ টি ট্রান্সফরমার চুরি

আপডেট: জানুয়ারি ২৮, ২০২২, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

জয়পুরহাট প্রতিনিধি:


জয়পুরহাটে কৃষি কাজের জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সেচ পাম্পের ৭৪ টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হলেও একটিও উদ্ধার না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেচ পাম্প মালিকরা। এর মধ্যে জেলার ৫টি উপজেলার কৃষকদের বিভিন্ন মাঠে এসব ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারগুলোর একটিও উদ্ধার না হওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে, ট্রান্সফরমার উদ্ধারে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য প্রদান করছে পুলিশ প্রশাসন ও জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও বরেন্দ্র বহুমূখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। জানা গেছে, জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও বরেন্দ্র বহুমূখি উন্নয়ন (বিএমডিএ) কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সরেজমিন জানা গেছে, কৃষি জমিতে সেচ কাজের জন্য জেলার ৫ টি উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের ১ হাজার ৮৭৫ টি গভীর, ৩ হাজার ৪৯৩ টি অগভীর ও ২ টি এলএলপি নলকুপ রয়েছে। আর বিএমডিএ’র ৩৫৯টি গভীর নলকুপ রয়েছে।

জেলায় এসব বিদ্যুৎ চালিত মোট ৫ হাজার ৩৭০টি নলকুেপর জন্য প্রায় ৮ হাজার ট্রান্সফরমার রয়েছে। এসব ট্রান্সফরমাগুলোর মধ্যে গত ২০২১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে চুরি হয়েছে ৭৪টি। এরমধ্যে পল্লী বিদ্যুতের ৫৩ টি ও বিএমডিএ’র ২১টি। জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও বরেন্দ্র বহুমূখি উন্নয়ন (বিএমডিএ) কর্তৃপক্ষরা আরও জানান, ট্রান্সফরমারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেচ পাম্প অপারেটরদের প্রতি ঘন্টার জন্য শতকরা ১০ টাকা কমিশন দেওয়া হলেরও চুরি ঠেকানো যায় নি। প্রতিটি ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর সেচ পাম্প মালিকদের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক থানায় অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরী করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হলেও কোন ট্রান্সফরমারই উদ্ধার বা কোন অপরাধি গ্রেপ্তার হয় নি।

সেচ পাম্পগুলোর ট্রান্সফরমারগুলো চুরি হওয়ার পর সেগুলো উদ্ধার না হলে সেগুলো পুনরায় সেচ পাম্প মালিকদের কিনতে হয়েছে। চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার উদ্ধার না হওয়াসহ দোষীরা আইনের আওতায় না আসায় আবারো চুরি হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন সেচ পাম্প মালিকরা। এ ছাড়া মূল্যবান তামার তারের জন্যই সেচ পাম্পগুলো চুরি হচ্ছে বলেও জানান স্থানীয় পল্লী বিদ্যুত ও বিএমডিএ’র কর্তৃপক্ষসহ সেচ পাম্প মালিকরা।

এছাড়া সদর উপজেলার তেঘর দন্ডপানি গ্রামের জাহিদুল ইসলামের ৩টি, ক্ষেতলাল উপজেলার বড় তারা গ্রামের মাহফুজার রহমানের ৩টি, মাামুদপুর-দেওগ্রামের মিলন মন্ডলের ৩টি, আক্কেলপুর উপজেলার পূর্ন্য গোপীনাথপুর গ্রামের শফিকুল ইসলামের ১টি, কালাই উপজেলার মোলামগাড়িহাট গ্রামের মজিবর রহমানের ৩টি, পাঁচবিবি উপজেলার ভূই ডোবা গ্রামের এনামুল হকের ৩টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার কয়তাহার গ্রামের সেচ পাম্প মালিক আব্দুল মজিদ মল্লিক জানান, গত ২৭ অক্টোবর আমার পাম্পের ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দিয়েও লাভ হয়নি। ফসল রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে কষ্ট করে টাকা যোগাড় করে ট্রান্সফরমার সংগ্রহ করে সেচ কাজ চালু রেখেছি। ট্রান্সফরমার চুরি বন্ধে পুলিশসহ প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। একই উপজেলার আমদই-মীরগ্রাম এলাকার সেচ পাম্প মালিক হাফিজুর রহমান একই অভিযোগ করে জানান, আমার সেচ পাম্পের ৩টি ট্রান্সফরমার চুরি হলে আলুসহ অন্যান্য ফসলী জমিতে সেচ সংকট দেখা দেয়।

এতে কৃষকরা চরম বিপাকে পরেছিল বলে আমি ধার কর্য করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ৯৩ হাজার টাকা জমা দিয়ে ট্র্রান্সফরমারগুলো সংযোগ করে কৃষকদের জমিতে পানি দিয়ে ফসল রক্ষা করেছি। কালাই উপজেলার মোলামগাড়িহাটের মজিবর রহমান জানান, ‘গত ২৬ অক্টোম্বর আমার সেচ পাম্পের ৩টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।

এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দিয়ে সেই কাগজ দেখিয়ে পল্লী বিদ্যুত অফিসে গিয়ে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ করে নতুন ট্রান্সফরমার সংযোগ দিয়ে পানি সেচ চালু রেখে কৃষকের ফসল রক্ষা করছি। ট্রান্সফরমার চুরি বন্ধে পুলিশসহ প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

ট্রান্সফরমার চুরির শিকার অনেক সেচ পাম্প মালিক অভিযোগ করেন, ট্রান্সফরমারগুলো ভিতরে ১২ থেকে ২০ কেজি পরিমান তামার তার রয়েছে। প্রতি কেজি তামার মূল্য ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এই মূল্যবান তামার জন্যই মূলত ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারগুলো প্রতিস্থাপন করতে প্রথম বার চুরি হলে সরকারি মূল্যের শতকরা ৫০ ভাগ বা এক লক্ষ টাকা অর্থ জমা দিলে পুনরায় তাদের ট্রান্সফরমার দেওয়া হয়। তবে দ্বিতীয় বার চুরি হলে সেচ পাম্প মালিকদের ট্রান্সফরমারের দুই লক্ষ টাকা বা ১০০ ভাগ অর্থ জমা দিয়ে ট্রান্সফরমার নিতে হয় বলেও জানান ভূক্তভোগী সেচ পম্প মালিকরা। সে হিসেবে সেচ পাম্প মালিকদের পকেট থেকে গেছে প্রায় কোটি টাকা আর চোরদের পকেটে ঢুকেছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা।

তারা আরও বলেন, প্রতিটি ট্রান্সফরমার চুরি হলে থানায় সাধারণ ডায়েরী বা অভিযোগ করার পর সেই সাধারণ ডায়েরী বা অভিযোগ পত্রের ১ কপিসহ নির্ধরিত অর্থ জমা দিয়ে অনেক দূর্ভোগ শেষে নতুন ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন করা যায়। এর কোন প্রতিকারই পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ট্রান্সফরমার চোরদের ধরতে পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করেন জেলার সেচ পাম্প মালিকরা। এ দিকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবস্থায় এত উপরে বৈদুতিক খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার চুরির বিষয়টি যেমন সহজ নয়, আবার বৈদ্যুতিক বিষয় অনভিজ্ঞ কোন সাধারণ চোরের পক্ষে ট্রান্সফরমার চুরি করাও তেমনই অসম্ভব বলে জানান সেচ পাম্প মালিকসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

বিদ্যুৎ বিভাগের মাত্র কিছু সংখ্যক অসাধু কর্মচারী এর সাথে জড়িত থাকতে পারেন বলেও তারা জানান। জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি’র সিনিয়ার জেনারেল ম্যানেজার এনামূল হক প্রামানিক ও বিএমডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তাদের পক্ষে চোর ধরা সহজ কাজ নয়। তাই প্রতিটি সেচ পাম্প মালিক ও কৃষকদের সমন্বয়ে পাহাড়া দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জয়পুরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম জানান, ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর মামলা হলে তদন্তের জন্য বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। কিন্ত শুধু এ ক্ষেত্রে মাত্র সাধারণ ডায়েরী বা অভিযোগ দেওয়া হয় বলে এসব বিষয়ে স্বাভাবিক কারণে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে অপরাধীরাও পার পেয়ে যাচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ