জয়ের নায়ক যারা

আপডেট: মার্চ ২০, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাট থেকে উইনিং শট। ব্যাট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে দৌড় দিলেন মুশফিকুর রহিম। শ্রীলঙ্কাকে ৪ উইকেটে হারিয়ে শততম টেস্টটা স্মরণীয় করে রাখল বাংলাদেশ। সীমানা থেকে ছুটে আসছেন সতীর্থরা, জয়ের আলিঙ্গনে বাঁধতে হবে না মিরাজ-মুশফিককে!
১৬ তারিখ সন্ধ্যাবেলায়ও কী এমন দৃশ্য দেখার চিন্তা মাথায় আনতে পেরেছিলেন কেউ? ৬ রানের মধ্যে ড্রেসিংরুমে ফিরেছেন তিনজন। দিনের আলো ফুরিয়ে আসার আগে সাকিব আল হাসানের পাগলাটে ব্যাটিংটা তো ভয়ই ধরিয়ে দিয়েছিল। লিড নেওয়া তো দূরের কথা তৃতীয় দিনের সকালে কতক্ষণ টিকতে পারে বাংলাদেশ, সেটা নিয়েই বরং বাজি ধরতে চেয়েছেন অনেকে। সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে মুশফিকের দল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ পেয়ে গেছে টেস্টে প্রথম জয়। যে জয় সবার মিলিত পারফরম্যান্সেরই ফল। তবে আলাদা করে কয়েকজনের কথা তো বলতেই হয়-
তামিম ইকবাল (১৩১ রান) : প্রথম ইনিংসে ভাগ্যের সহায়তায় ৪৯ করেছিলেন। চোখ জুড়ানো ইনিংস না হলেও দল একটা ভিত্তি পেয়েছিল সে ইনিংসে। তবে গতকাল শেষ দিনে দলের বড্ড প্রয়োজনের মুহূর্তে ঠিকই তামিম ইকবাল দেখা দিলেন নিজের রূপে। লক্ষ্যটা ছোট হলে খোলসে না ঢুকে ইতিবাচক খেলার কথা শুনিয়েছেন অনেকেই। সেটাই করেছেন, প্রথম থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছেন রঙ্গনা হেরাথ কিংবা দিলরুয়ান পেরেরার স্পিন জুজুতে সিঁটিয়ে থাকবেন না। তাই বলে অযথা ঝুঁকিও নেন নি, নিজের প্রথম চার মারতে হেরাথের প্রথম বাজে বল পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন। ততক্ষণে ইনিংসের ১৩ ওভার পেরিয়ে গেছে, গত কিছুদিনের দুই ওপেনিং সঙ্গীকেও হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু অপর প্রান্তে সাহসী সাব্বির রহমানকে পেয়েই ওসব ভুলেছেন। চমৎকার দুটি ঘণ্টা উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। পেরেরাকে অযথা মারতে গিয়ে ওভাবে আউট না হলে সেঞ্চুরিটা পেয়েই যেতেন তামিম!
সাকিব আল হাসান (১৩১ রান ও ৬ উইকেট) : তামিম হতে পারেন দ্বিতীয় ইনিংসের নায়ক। তবে ম্যাচের মূল চরিত্র বলুন কিংবা আলোচিত চরিত্র-সব জায়গাতেই এগিয়ে সাকিব। দ্বিতীয় দিনের শেষ আধা ঘণ্টার ওই ব্যাটিংয়ের কোনো যুক্তি খুঁজতে যাওয়ার মানে হয় না। সিরিজ সেরা হওয়ার পরও সে প্রশ্নের উত্তরটা দিতে পারেন নি সাকিব নিজেই। কিন্তু তৃতীয় দিনেই সাকিব দেখিয়ে দিয়েছেন কেন তিনি সাকিব! প্রথমে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দেখে নিজেকে সামলে নিয়েছেন, ইনিংস গড়ায় মন দিয়েছেন। মুশফিকের বিদায়ের পরও হাল ছাড়েন নি, অভিষিক্ত মোসাদ্দেক হোসেনকে সাহস জুগিয়েছেন, চিনিয়েছেন ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণের নানা দিক। মাত্র অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে দেশের ১০০তম টেস্টে সেঞ্চুরি করেই দায়িত্ব ভুলে যান নি। দ্বিতীয় ইনিংসেও শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানদের কাঁপিয়ে দিয়ে তুলে নিয়েছেন ৪ উইকেট।
এখানেও গল্পটা শেষ হয় নি। ৮ উইকেট হাতে রেখে মাত্র ৬০ রান দরকার এমন অবস্থায় হঠাৎ ঝড়, ১২ রানের মধ্যে চলে গেলেন তামিম-সাব্বির। দুর্ভাগ্যের চরম সীমায় থাকা এক অদ্ভুতড়ে আউট হয়ে ফেরার আগে অন্তত কালকের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ১৫ রান করে গেছেন।
সাব্বির রহমান (৮৩ রান) : দ্বিতীয় দিন বিকেলে সৌম্য সরকার আউট হওয়ার পরই চমকে উঠলেন সবাই। সাব্বির নামছেন কেন? টেস্টে চার নম্বরে নামেন দলের সেরা ব্যাটসম্যান। যিনি দলের সব ভার নিজের কাঁধে নিয়ে দলকে টেনে নিতে পারেন ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েও। মুশফিক কিংবা সাকিবের মতো ব্যাটসম্যান থাকা সত্ত্বেও সাব্বিরের তাই এমন মুহূর্তে নামার কারণটা বোঝা যাচ্ছিল না। কলম্বো টেস্টের পর সেটা এখন সবারই বুঝে ফেলার কথা-সাহস! প্রথম ইনিংসে ৪২ রান করেছেন, কিন্তু গতকাল এক রান কম করেও সে ইনিংসকে ছাড়িয়ে গেছেন। ১৯১ রানের লক্ষ্যে ২২ রানে পরপর দুই বলে আউট সৌম্য-ইমরুল। শ্রীলঙ্কার মাঠে চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের আগের সব ধসের কথা মনে পড়ছিল তখন। তখনই চরিত্র, সাহস আর ক্ষমতার সর্বোচ্চটা দেখিয়ে দিয়েছেন। তামিমের সঙ্গে তাঁর ১০৯ রানের তৃতীয় উইকেট জুটিতেই মাঝের ওই ধসটা সামলে নিতে পারল বাংলাদেশ।
মোস্তাফিজুর রহমান (৫ উইকেট) : গত ছয় মাসে বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে। টেস্টগুলো খারাপ খেলে নি বাংলাদেশ, তবু একটা অস্বস্তি ছিলই। মোস্তাফিজ যে খেলতে পারছেন না! শ্রীলঙ্কা সফরেই দুঃখটা ঘুচল। প্রথম ইনিংসে ২ উইকেট পেলেও, সবার প্রিয় মোস্তাফিজকে পাওয়া গেল পরশু। দুর্দান্ত এক ৭ ওভারের স্পেলে ৩ উইকেট নিয়ে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ের মেরুদ- গুঁড়িয়ে দিলেন। তাতেই বড় লিড নেওয়ার স্বপ্নটা শেষ হয়েছে স্বাগতিক দলের, বাংলাদেশও দেখতে শুরু করেছে জয়ের স্বপ্ন।
মুশফিকুর রহিম (৭৪ রান ও ৫ ডিসমিসাল) ও মোসাদ্দেক হোসেন (৮৮ রান) : তৃতীয় দিনটা বাংলাদেশ শঙ্কা নিয়ে শুরু করেছিল। সাকিবকে নিয়ে স্থিতি এনে দিয়েছিলেন অধিনায়ক মুশফিকুরই। ফিফটি করে আউট হলেও ওই ইনিংসের গুরুত্ব তাই কমছে না। দ্বিতীয় ইনিংসে সেটাও পান নি, তবু এ ইনিংসের গুরুত্বটা বোধ হয় এর চেয়েও বেশি। হঠাৎ এক ঝটকায় বিপাকে পড়েছে দল, এমন অবস্থায় মাথা ঠান্ডা রেখে ঠিকই দলকে জয় এনে দিয়ে তবেই মাঠ ছেড়েছেন।
অভিষেক ইনিংসেই ৭৫ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৩। কিন্তু নিক্তির দুই দিকে দুটি ইনিংসকে রাখুন। ধারে-ভারে পিছিয়ে থাকবে না কোনোটাই। ভাগ্যের পরিহাসে সাকিবের বিদায়ের পর দুশ্চিন্তার কালো মেঘ উড়া উড়ি করছিল আকাশে। কিন্তু অধিনায়কের সঙ্গী হয়ে দলের জয় নিশ্চিত করে এসেছেন। শুধু আউটের শটেই বোঝা গেছে, এটা তাঁর অভিষেক টেস্ট। জয় থেকে ২ রান দূরে, এমন অবস্থায় আউট হয়েছেন মোসাদ্দেক। তাতেও খুব একটা অসুবিধা হয়নি, অভিষেক টেস্টের সবচেয়ে উপহার তো পেয়ে গেছেন, জয়!-প্রথম আলো অনলাইন