বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

জয় বাংলা: ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

আপডেট: December 15, 2019, 12:58 am

আমীন আল রশীদ


বাঙালির জাতীয় জীবনে যে শব্দগুলো ‘সিলমোহর’ হয়ে আছে, ‘জয় বাংলা’ তার একটিই শুধু নয়, বরং বলা চলে প্রধানতম। ছোট্ট দুটি শব্দের একটি স্লোগান কীভাবে পুরো একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, কী করে একটি জাতিকে স্বাধিকারের পথে উদ্বুদ্ধ করে নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করে, কী করে দল-মত-ধর্ম ও বিশ্বাস নির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষকে একটি স্লোগানের নিচে নিয়ে আসতে পারে-‘জয় বাংলা’ শুধু তার একটি বড় নিদর্শনই নয়, বরং বিশ্বের রাজনৈতিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি ডিসকোর্সও বটে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছর পরে এসে যখন উচ্চ আদালত বললেন যে, ‘জয় বাংলা’কে বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহার কার উচিত-সেটি বিজয়ের এই মাসে পুরো দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্যই গর্বের। কিন্তু এই অবস্থায় পৌঁছানোটা, অর্থাৎ ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করার এই নির্দেশনাটি যে খোদ হাইকোর্ট থেকে আসবে, সেই পথপরিক্রমাটি খুব মসৃণ ছিল ।
একটি জাতির জীবনে যখন স্বাধিকার ও মুক্তির প্রসব বেদনা শুরু হয়, তখন সেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একজন নেতার। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়কাল থেকেই ধীরে ধীরে সেই নেতৃত্বের জায়গায় শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা) নিজের অবস্থানটি পোক্ত করছিলেন। জীবনের ৪০ শতাংশ সময় (আবুল বারকাত, বঙ্গবন্ধু-সমতা-সাম্রাজ্যবাদ, পৃষ্ঠা ৭৩) জেলখানায় কাটালেও যে সময়টুকু বাইরে ছিলেন, তার সবটুকুই বলা চলে তিনি ব্যয় করেছেন বাঙালি জাতির স্বাধিকার এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য (দেখুন ৭ মার্চের ভাষণ)। ড. বারকাতের হিসাবে, বঙ্গবন্ধু সারা জীবনে মাত্র ১২ শতাংশ সময় (গড়ে দৈনিক ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা) ঘুমিয়েছেন।
তবে এটা ঠিক, একটি জাতিকে তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু একজন নেতাই যথেষ্ট নয়, যদি সেই নেতা তার জাতির সামনে লড়াইয়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পরিষ্কার করতে না পারেন এবং তার রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনায় অস্পষ্টতা থাকে। এ কারণে যুগে যুগে সারা পৃথিবীর স্বাধিকার আন্দোলনে কোনও একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট স্লোগান সেই লড়াই-সংগ্রামে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকেই এই বাংলার পুরো জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করা তথা তাদের স্বাধিকারের পথে নিয়ে যেতে একটি অভিন্ন স্লোগানের খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
শুরুর দিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পক্ষে-বিপক্ষে ছাত্রলীগের দুটি অংশের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে সবাই ‘জয় বাংলা’র পক্ষে অবস্থান নেন। বইপত্র মারফত যতটুকু জানা যায়, ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা আফতাবউদ্দিন আহমদ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রথম উচ্চারণ করেন। সভা চলাকালীন সবাইকে আকস্মিকভাবে চমকে দিয়ে চিৎকার করে তিনি ‘জয় বাংলা’ বলতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে আরও সাত-আটজন কর্মী সমন্বরে এই স্লোগান দেন (আমি সিরাজুল আলম খান, একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য, পৃষ্ঠা ১০৯)।
এই ঘটনাটির বর্ণনা পাওয়া যায় মহিউদ্দিন আহমদের (জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ে রাজনীতি, পৃষ্ঠা ২৬) লেখাতেও: ‘ব্যাপারটা আকস্মিকভাবে ঘটে যায়। যেহেতু এটা একটা নতুন স্লোগান তাই সবাই একটু হকচকিত হয়ে চুপচাপ থাকেন। বিষয়টা এভাবেই চাপা পড়ে থাকে।’
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে এর তিন মাস পরে, ৪ জানুয়ারি ১৯৭০। ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সকালে রমনা বটমূলে আলোচনা ও র‌্যালি। আলোচনা সভার সভাপতি মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী এবং প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আইয়ুব খান প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার পরে এই প্রথম জনসম্মুখে শেখ মুজিব। মঞ্চে উপবিষ্ট বঙ্গবন্ধুর পেছনে দেবদারু পাতায় ছাওয়া ব্যানারে হলুদ গাঁদাফুল দিয়ে লেখা দুটি শব্দ: ‘জয় বাংলা’। খুব ছোট্ট দুটি শব্দ অতিদ্রুত সমাবেশে উপস্থিত জনতার মাঝে ছড়িয়ে যায়। আলোচনা শেষে ছাত্রলীগ ‘জয় বাংলা’ লেখা ওই ব্যানারটি নিয়ে র‌্যালি বের করে, যা শহিদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। পরদিন সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার পাশাপাশি ‘জয় বাংলা’ ব্যানারটির কথাও উল্লেখ করা হয়।
এর কয়েকদিন পরেই ১১ জানুয়ারি পল্টনে আওয়ামী লীগের জনসভায়ও এই স্লোগানটি ব্যবহৃত হয়। মহিউদ্দিন আহমদ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭) লিখেছেন, ধীরে ধীরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান জনপ্রিয় হতে থাকে। ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছিলো। সত্তরের ৬ মে ডাকসু ও হল সংসদগুলোর নির্বাচনের সময়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ছিল চেখে পড়ার মতো। মহিউদ্দিন আহমদ জানাচ্ছেন, ওই বছরের ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো তাঁর ভাষণে এই স্লোগানটি উচ্চারণ করেন। আর কে না জানেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণের মধ্য দিয়ে কার্যত স্বাধীনতার ডাক দেন, সেই ১৯ মিনিটের ভাষণের সবশেষ কথাটিই ছিল ‘জয় বাংলা’।
তবে মনিরুল ইসলাম (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সমাজতন্ত্র, পৃষ্ঠা ১০৭) লিখছেন, এই স্লোগানটি নিয়ে ছাত্রলীগের দুটি অংশের মধ্যে কিছুটা মতদ্বৈততা তৈরি হয়। বিশেষ করে পল্টনে আওয়ামী লীগের জনসভায় এই স্লোগান লেখা ব্যানার টানানো ইস্যুতে। বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি ব্যাপক কর্মীদের পক্ষে মত দেন এবং এরপর থেকে জয় বাংলা স্লোগানটি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সব কর্মকাণ্ডের প্রধান স্লোগানে পরিণত হয়। শুধু তা-ই নয়, এই স্লোগানটি এত দ্রুত সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, নেতাকর্মীরা পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েও জয় বাংলা উচ্চারণ করেন। দেখা যাচ্ছে, একটি স্লোগান কী করে পুরো একটি আন্দোলনের নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে, ‘জয় বাংলা’ তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
তবে এটা ঠিক, স্বাধীন বাংলাদেশে বছরের পর বছর এই স্লোগানটি প্রায় নিষিদ্ধই ছিল। যে স্লোগানের বলে ১৯৭১ সালে একটি নিরস্ত্র জাতি সশস্ত্র জাতিতে পরিণত হলো, বাঙালি তার কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক স্বাধীনতা তথা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেলো, সেই স্লোগানটিই হয়ে গেলো উচ্চারণ নিষিদ্ধ বাক্য। যে মানুষটির নেতৃত্বে এই দেশটি স্বাধীন হলো, রাষ্ট্র গঠনের ৪ বছরের মাথায় সেই মানুষটিকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। যে দলের নেতৃত্বে একটি পরাধীন জাতি মাথা তুলে দাঁড়ালো, সেই দলটি হয়ে গেলো প্রান্তিক। এর পেছনে ঐতিহাসিক যত কারণই থাকুক না কেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস তথা পলিটিক্যাল সায়েন্সে এটি একটি বড় আলোচনার বিষয়।
কিন্তু সেই ট্র্যাজেডির পথ বেয়েই এ দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বড় অংশের বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে বিজয়ের মাসেই হাইকোর্ট বলেছেন, এখন থেকে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় যে তরুণরা মধুর ক্যান্টিনে, যারা রমনা বটমূলে, যারা পল্টন ময়দানে এবং যারা রেসকোর্স ময়দানে এই স্লোগান উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের পরিবারের নিশ্চয়ই এটি একটি আনন্দের সংবাদ, গর্বিত হওয়ার মতো বিষয়।
একটু পেছনে ফেরা যাক। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. বশির আহমেদের একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান ও মোটো হিসেবে কেন ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন। এর দুই বছর পরে গত ১০ ডিসেম্বর এবারের বিজয় দিবস থেকে সর্বস্তরে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা উচিত বলে অভিমত দেন উচ্চ আদালত। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান এবং বিচারপতি এ এম কামরুল কাদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই অভিমত দেন।
এখন প্রশ্ন হলো, হাইকোর্টের এই অভিমত বা নির্দেশনার পরে জয় বাংলা জাতীয় স্লোগান হলে যারা বছরের পর বছর এই স্লোগানটিকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল, যারা বঙ্গবন্ধু শব্দটি উচ্চারণ করতে দেয়নি, তারা বা তাদের উত্তরসূরি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কি জয়বাংলা উচ্চারণ করে মিছিল শুরু বা বক্তৃতা শেষ করবেন? নাকি তাদের অনুসারী ও অনুগামীরা হাইকোর্টের এই নির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আপিল করবেন? সম্ভবত সেটি তারা করবেন না বা সেই নৈতিক সাহস হয়তো তাদের হবে না।
তবে হাইকোর্টের এই নির্দেশনার মধ্য দিয়ে সবচেয় বড় যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হলো তা হচ্ছে, এখন থেকে ‘জয় বাংলা’ কোনও একটি দলের স্লোগান নয়; এটি সবার এবং এই স্লোগান দেওয়ার অধিকার সবার। যেমন জাতির পিতা কোনও একটি দলের নয় বরং তিনি সবার; তাঁর অবস্থান সবার মাথার উপরে। ফলে আজকের এই দিনে ‘জয় বাংলা’ আর বঙ্গবন্ধু এক ও একাকার।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।
(বাংলা ট্রিবিউন এর সৌজন্যে)