ঝাড়খন্ডের মুসলিমরা যৌতুক ফেরৎ দিচ্ছে || এই মূল্যবোধের তাড়না আমাদেরও

আপডেট: মার্চ ৫, ২০১৭, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

মানুষের মধ্যে জাগরণ তৈরি করে সমাজের বিদ্যমান কুসংস্কার বা কুপ্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার সমাধান করা যায় এমনই এক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডের পালামৌতে। ব্যক্তি বিশেষ মুসলিম সমাজে যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের মধ্যে যে জাগরণ তৈরি করেছেন তা হিন্দু সমাজকেও স্পর্শ করেছে।
যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতন- এমনকি খুনের মত ঘটনা উপমহাদেশের দেশগুলোর একটি বাস্তব চিত্র। এই একটি ব্যবস্থা যা, নারীর আত্মমর্যাদা ও সম্ভ্রমবোধকে ভীষণভাবে ভূলুণ্ঠিত করে। অভিভাবকদেরও এই কুপ্রথার কুপ্রভাব মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের আরো দরিদ্র-হীন করে তোলে। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই যৌতুক নেয়া ও দেয়া আইনতঃ অপরাধ কিন্তু সমাজে তার বিস্তার এতই ঘনিষ্ট যে, আইনের ব্যত্যয় খুবই সাধারণ একটি ধারণা। মানবতার পরিপন্থী যৌতুকের মত কুপ্রথাকে সমাজের বড় একটি অংশ নিরবে ও প্রকাশ্যে মেনে নিয়েছে। ফলে জঘন্য এই অপরাধটি সমাজে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।
ঝাড়খন্ড রাজ্যের পোখারিটোলা গ্রামের বাসিন্দা হাজি মুমতাজ আনসারি মানবতার মুক্তির সেই সুরটিই মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পেরেছেনÑ যার ফলশ্রুতিতে সেখানের মানুষ সচেতন হয়েছে। পিছিয়ে থাকা রাজ্য বলে পরিচিত ঝাড়খন্ডের ওই গ্রামে বিয়ের সময়ে যৌতুক হিসাবে যে অর্থ নিয়েছিল পাত্রপক্ষ, এখন সেই টাকাই তারা ফিরিয়ে দিচ্ছে কনে পক্ষকে। মানবতার জাগরণের এই খবর সংবাদ মাধ্যমে ঝড় তুলেছে।
ঝাড়খন্ড রাজ্যের পালামৌতে এই প্রক্রিয়া বছরখানেক ধরে চলছে, এর মধ্যেই প্রায় আটশো মুসলমান পরিবার ছেলের বিয়ের সময়ে নেয়া বরপণ ফিরিয়ে দিয়েছে পুত্রবধূর পরিবারকে। যার পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি রুপি। মুসলমান পরিবারগুলিকে দেখে ওই অঞ্চলের অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও যৌতুক ফেরানো শুরু হয়েছে।
পোখারিটোলার এই পণ বিরোধী অভিযান এতটাই সমর্থন পেয়েছে পালামৌ অঞ্চলে যে এখন আর মুসলিম পরিবারগুলিতে কেউ বরপণ চাইতেই সাহস পাচ্ছেন না। আর যদি বা পাত্র পক্ষ এবং কন্যা পক্ষ নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে পণের ব্যবস্থা করেও ফেলে, তাহলে সমাজের মাথারা গিয়ে সেটা আটকিয়ে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হয়। এসব বিয়ের সাথে যৌতুকের প্রভাব ব্যাপকভাবে আছে। বাল্যবিয়ের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত টেকে না। এর সাথে ভয়ঙ্কর নির্যাতনের চিত্রটি তো আছেই। বাংলাদেশে যৌতুকের কারণে নারী হত্যাও নেহাতই কম নয়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় তৈরি বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ সমীক্ষা বলছে, স্বামীর হাতে নির্যাতিত হলেও ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ স্ত্রী তাঁদের উপর নির্যাতনের কথা কখনওই অন্য কাউকে জানান না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫’ শীর্ষক দ্বিতীয় সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে যথারীতি যৌতুক নিরোধ আইনও রয়েছে কিন্তু তদুপরি যৌতুকের অভিশাপ থেকে দেশের নারী সমাজকে মুক্ত করা যায় নি। শুধু আইনের প্রয়োগ ঘটিয়েই যে সমাজের একটি প্রথাকে প্রতিরোধ করা যায়, তা বোধ হয় সঠিক নয়। এর জন্য সামজিক মূল্যবোধের উত্তরণ এবং সামাজিক জাগরণের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঝাড়খন্ডের যে মূল্যবোধ যৌতুকের মত কুপ্রথাকে তিরোহিত করতে অবদান রাখছে তা আমাদের করণীয় সম্পর্কে পথ দেখাচ্ছে। ঝাড়খন্ডের অভিজ্ঞতা আমাদের পথ দেখাতে পারেÑ যা বাংলাদেশের নারীদের মর্যাদা, সম্ভ্রম ও মানবাধিকার সুরক্ষার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ