টাইগারদের ব্যর্থতা আর হতাশার দিন

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


তার ওপরই ছিল সবচেয়ে বড় আশা। কিন্তু দিনের শুরুতেই আউট। তারপর পাখি হয়ে উড়ে দারুণ ক্যাচ নেয়া। চোখ জুড়ানো। মন ভুলানো। আবার সেই মানুষটাই ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে দ্বিতীয় সুযোগ করে দেন! আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ানো যে ব্যাটার ৫২ রানে প্রথম জীবনটা পেয়েছেন। প্রতিপক্ষ অধিনায়কের সামনে ‘টাফ’ সুযোগটা দিয়েও স্টাম্পিং থেকে বেঁচেছেন ৭৩ রানে দাঁড়িয়ে। মান বাঁচানোর লড়াইয়ে আবার শীর্ষ চারের তিন ব্যাটসম্যানেরই ফিফটি এশিয়ায়! এতো সব ঘটনার ঘনঘটার আলোচনা টেনে এনে চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিনটির নাম এক শব্দে দেওয়া যায় ‘হতাশা’।
হ্যাঁ, যে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ঐতিহাসিক হোয়াইটওয়াশ করার পণ নিয়ে নেমেছে বাংলাদেশ। সেটির দ্বিতীয় দিনে খুব দাপটের সাথেই রুখে দাঁড়িয়েছে স্টিভেন স্মিথের দল। সেই রুখে দাঁড়ানোর গল্পটা তারা লিখতে শুরু করেছে প্রথম দিন থেকে। যদিও প্রবল ধাক্কা সামলে আগের দিনটা বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ২৫৩ রান নিয়ে শেষ করতে পেরেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার কিছুই যে আর টাইগারদের পক্ষে যাচ্ছে না! না পিচ, না বোলিং। এর সাথে নিশ্চিত বা হাফ চান্স মিস হলে আর কি থাকে!
প্রথম ইনিংসটা বাংলাদেশের শেষ হলো ৩০৫ রানে। আগের দিনের সাথে ২৩.২ ওভারে আর ৫২ রান যোগ করে। এরপর এই সেদিনের বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়ানরা দিনটা শেষ করেছে ২০০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দিয়ে। এই জহুর আহমেদের দ্বিতীয় টেস্টের স্মৃতিটা চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলে। সেবার প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে অল্পতে গুটিয়ে দিয়ে ৪ উইকেটে ৫৮১ রানে ইনিংস ঘোষণা করার পর আর ব্যাট না করেই বড় জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল। আর এখন প্রথম চারের তিন ব্যাটসম্যানের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে শেষ টেস্টের দ্বিতীয় দিনের শেষে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৮০ রানে পিছিয়ে তারা। ২ উইকেটে ২২৫ রান। ৬৪ ওভারে। ডেভিড ওয়ার্নার দুটি জীবন নিয়ে ২০তম সেঞ্চুরির সুগন্ধ নিয়ে অপরাজিত ৮৮ রানে। পিটার হ্যান্ডসকম্ব ৬৯ রান নিয়ে তার সাথে। ১২৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি তাদের। অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ দিয়ে গেছেন ৫৮ রান। স্বাগতিক স্পিনাররা যে উইকেটে টার্নের খোঁজ পাচ্ছেন না সেখানে চালকের আসনটা প্রতিপক্ষেরই।
বলতে পারেন ২০০৬ সাল আর ২০১৭ তো এক নয় মোটেও। তবে মনে আছে নিশ্চয়ই সেবার ফতুল্লায় জয়ের সুবাস পেয়েই হেরেছিল টাইগাররা। আরো পরিণত সেই বাঘের দল ঢাকা টেস্ট জিতে ইতিহাস গড়ে ১-০ তে এগিয়ে। দ্বিতীয় টেস্টটা জিততে পারলে প্রথম বারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর ঐতিহ্যবাহী দলটাকে প্রথম বারের মতোই হোয়াইটওয়াশ করার অবিশ্বাস্য গৌরবের হাতছানি। কিন্তু সাগরিকার এই দিনের পুরোটাই নিজেদের করে নিয়ে অসিরা নিজেদের সম্মান রক্ষার শক্ত দেয়াল তৈরি করে ফেলেছে। ওয়ার্নার ও হ্যান্ডসকম্ব তো আছেনই, পরের দিন না বাকিরা চীনের প্রাচীর হয়ে ওঠেন!
যদিও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইন আপে মাত্র ৫ স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান। কিন্তু এখানেই তো সেই ২০০৬ সালে ফাস্ট বোলার জেসন গিলেস্পি করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি! আর অস্ট্রেলিয়ার অ্যাস্টন অ্যাগারের মতো মূলত বোলারের টেস্টে আছে ৯৮ রানের স্কোরও। ১১ নম্বরে যেটি বিশ্ব রেকর্ড! সব মিলিয়ে খুবই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হয়তো অনেকটাই নির্ঘুম রাখবে টাইগার দল এবং সমর্থকদের রাতটাকে।
মুশফিকের শুরুটা ছিল ৬২ রানে। নাসির ছিলেন ১৯ রানে। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম। এমনিতে ৮ ব্যাটসম্যান। সুতরাং, বাংলাদেশ দিনটা শুরু করেছিল অধিনায়কের কাঁধে ভর করে। বড় নির্ভরতা আর আশা নিয়ে। নিচের দিকে নেমেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু রান দিতে জানা নাসির হোসেন ঠিকই তা দিলেন। কিন্তু আগের দিন ৫ উইকেট শিকার করা ন্যাথান লায়ন ক্ষমাহীন নিষ্ঠুর! লায়ন দিনে নিজের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই ফিরিয়ে দিলেন মুশফিককে। ৬৮ রান নিয়ে কি যে হতাশা নিয়ে ফেরা ক্যাপ্টেনের! বলটা ঠেকাতেই পারেননি মিস্টার ডিপেন্ডেবল! এভাবে বোল্ড হবেন!
নাসির ৩৭ রানে একটা প্রাণ পেয়ে শেষে ৪৫ রান করে নেন বিদায়। ১২ রানের মধ্যে শেষ ৩ উইকেটের পতনে হতাশার গ্রাস। তবু কিছুটা স্বস্তি তখন ৩০০ পেরিয়েছে টাইগাররা। যেখানে আগের দিন ১১৭ রানেই পড়েছিল ৫ উইকেট। দারুণ লড়াইয়ে এই পর্যন্ত আসাটাও গর্বের বটে! তবে প্রথম টেস্টে ৯ উইকেট নেয়া লায়ন এখানে যে এক ইনিংসেই নিয়ে নিলেন ৯৪ রানে ৭ উইকেট! ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেরা। অ্যাগার দুটি উইকেট পেলেও এই ম্যাচ দিয়ে হঠাৎ ফেরা স্টিভেন ও’কিফি উইকেটই পেলেন না!
নিজেদের ইচ্ছে মতো বানানো উইকেটে দ্বিতীয় দিনের লাঞ্চের আগে যে সময়টা মিললো তাতেই ১টা উইকেট তুলে নিয়ে মেতে ওঠে বাংলাদেশ। কারণও আছে। কাটার মাস্টার আগের ম্যাচে একটাও উইকেট পাননি। এবার পেলেন দারুণ স্টাইলে। অবশ্য কৃতিত্বের বেশিরভাগটা মুশফিকের। মোস্তাফিজুর রহমানের বলে তুলে দেওয়া ম্যাট রেনশ’র (৪) ক্যাচটা যেভাবে ডানা মেলে উড়ে গিয়ে ধরে ফেললেন মুশফিক সেটা দলের সাহস আরো বাড়িয়ে দেওয়ার মতো।
ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট! কিন্তু এরপর বাংলাদেশের উৎসবটাকে পানসে করে দিতে থাকেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ও তার ডেপুটি। ৯৩ রানের জুটি গড়ে ফেলেন দারুণ খেলতে থেকে। স্মিথ কিছুদিন আগে ভারতের ৪ ম্যাচে ৩ সেঞ্চুরি করে এলেও ঢাকায় সফল নন। স্পিনে সবচেয়ে ভালো খেলা ব্যাটসম্যান প্রতিপক্ষ অধিনায়কের একটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের শিকার। সাকিব আল হাসানের এন্ডে ২৯তম ওভারে তাইজুল ইসলাম এলেন। প্রথম বলেই সাফল্য। স্পিন করবে ভেবে খেলতে গিয়ে বোকা হলেন স্মিথ। তাইজুলের আর্ম বলটা ধারালো অস্ত্র হয়ে স্মিথকে বোল্ড করে কেটে দিলো।
নতুন বলে শুরু করা মিরাজ বল করে যান। লাভ হয় না। সাকিবেও না। তাইজুলের ধারের চেয়ে ওয়ার্নার-হ্যান্ডসকম্বের ব্যাটের ধার ও ভার তখন আরো বেশি হয়ে উঠতে থাকে। শেষ সেশনটা তাই দারুণ যায় অস্ট্রেলিয়ার। কিন্তু ওয়ার্নার তো ৫২ রানের সময় সুযোগ দিয়েছিলেন। দলের রান তখন ২ উইকেটে ১৩১। শর্ট লেগে মুমিনুল হকের হাতে জমতে গিয়ে জমে না বল। দ্বিতীয় চেষ্টায়ও ধরতে পারেন না। হ্যান্ডসকম্ব এগিয়ে চলেন। বাড়ে জুটি।
শেষটায় এসে ব্যক্তিগত ৭৩ রানে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি আক্ষেপের নাম হয়ে থাকেন ওয়ার্নার। নাকি মুশফিক? মিরাজকে খেলতে গিয়ে সামনে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বল মিস করেছেন। মুশফিকের প্যাডে লেগে স্টাম্পে লাগবে কি ফিরে এসে? নাকি মুশফিক চেষ্টা করলে তখনো সময় ছিল ওয়ার্নারকে স্টাম্পিংয়ের শিকার করে দিনের শেষে কিছুটা স্বস্তির?
ক্রিকেট তো আসলে এমনই। বিপদ কখন কার সামনে এসে দাঁড়ায় আগে থেকে কে জানে! এখন যেমন বাংলাদেশ বড় বিপদের সামনে। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, হিল্টন কার্টরাইট, ম্যাথু ওয়েড এরপর। দ্বিতীয় দিনের শুরু থেকে আঘাতের পর আঘাত হানতে না পারলে অস্ট্রেলিয়া যে পরিকল্পনার দিকে এগুচ্ছে সেটাতে তাদের সাফল্য অনিবার্য। চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট না করতে পারলে ভালো এই উইকেটে। আর যদি করতেই হয় তাহলে যেন টার্গেটটা থাকে নিজেদের নাগালের মধ্যেই। লজ্জায় যেন ডুবতে না হয়।

তাহলে বাংলাদেশের স্বপ্নমাখা টেস্টের দ্বিতীয় দিনের শেষের ইঙ্গিতটা কি? ব্যর্থতা ও হতাশার দিন ঠিকই। কিন্তু এও তো সত্য, এই টাইগাররাই টেস্টে একটা সেশনেই কি কা-টাই না করে ফেলছে আজকাল! তৃতীয় দিনে নিশ্চয়ই ষোল কোটি মানুষের প্রার্থনায় তেমনই একটা সেশন এবং সেটি অবশ্যই সকালেরটাই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
(দ্বিতীয় দিন শেষে)
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসঃ  ৩০৫/১০  (মুশফিক ৬৮, সাব্বির ৬৬, নাসির ৪৫, মিরাজ ১১, তাইজুল ৯, মোস্তাফিজ ০* ; লায়ন ৭/৯৪, অ্যাগার ২/৫২)
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসঃ   ২২৫/২ (স্মিথ ৫৮, ওয়ার্নার ৮৮*,  হ্যান্ডসকম্ব ৬৯*, মোস্তাফিজ ১/৪৫, তাইজুল ১/৫০, সাকিব ০/৫২, মিরাজ ০/৫৩)