টাকা নয় হাড়ের ব্যাংক

আপডেট: জুন ২৯, ২০১৭, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


দেশে শুধু টাকার রাখার ব্যাংকই নয়, রয়েছে হাড় সংগ্রহের ব্যাংকও। কাগজপত্রে এই ব্যাংকের নাম হচ্ছে টিস্যু ব্যাংক। এই ব্যাংকে পাওয়া যায় টিস্যু তথা হাড়, হাড়ের টুকরা, মাথার খুলি ইত্যাদি। দুর্ঘটনায় কারও হাত-পা বা শরীরের অন্য কোনও অংশের হাড় ভেঙে গেলে বা কোনও রোগের ফলে হাড় নষ্ট হয়ে গেলে ‘হাড় ব্যাংক’ থেকে শল্য চিকিৎসকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহকৃত হাড় ভাঙা বা নষ্ট হাড়ের জায়গায় জোড়া দিয়ে (গ্রাফটিং) করে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হচ্ছে।
পায়ের উরু থেকে হাঁটুর ওপরের হাড় টিউমারের (জায়ান্ট সেল টিউমার) কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং তা কেটে ফেলার পর হাড় ব্যাংক থেকে সংগৃহীত হাড় নিয়ে ওই জায়গায় গ্রাফটিং (অ্যালোগ্রাফট) করে রোগী সুস্থ হওয়ার শত শত সফল উদাহরণ রয়েছে হাড় ব্যাংকের। এছাড়া হাত-পা ভেঙে পঙ্গু হওয়ার পথে রোগীও হাড় ব্যাংকের সহযোগিতায় সুস্থ হয়ে নিজ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে গেছে। এমন সব রোগীর সংখ্যাও কম নয় বলে জানা গেছে হাড় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।
দেশে এই হাড় ব্যাংক (টিস্যু ব্যাংক) গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ইনস্টিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়াল রিসার্চ। দেশের বড় বড় হাসপাতালের সার্জনরা সংশ্লিষ্টদের অপারেশন করার সময় রোগীর শরীর থেকে কেটে ফেলা (পরিত্যক্ত বা অব্যবহৃত কিন্তু নিরাপদ) অংশ থেকে হাড় সংগ্রহ করে এই ব্যাংক। এই ইন্সটিটিউট দেশের রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোর বড় বড় হাসপাতাল থেকে উপযুক্ত ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় হাড় সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, জীবাণুমুক্তকরণ ও মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করে এবং চিকিৎসকদের চাহিদাপত্র অনুযায়ী ইনস্টিটিউট তা সরবরাহ করে থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইন্সটিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়াল রিসার্চের পরিচালক ড. এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর বড় বড় হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত টিস্যু (হাড়) সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করে টিস্যু ব্যাংকে সংরক্ষণ করছি এবং শল্য (সার্জন) চিকিৎসকদের চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করছি। কোনও অবস্থাতেই আমরা চিকিৎসকের চাহিদার বাইরে কোনও টিস্যু (হাড়) দিই না। এ কারণে আমরা নিশ্চিত হয়ে নেই যে, কোনও দালাল হাড় নিচ্ছে না। তিনি জানান, অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে হাড় ব্যাংক থেকে রোগীদের জন্য হাড় বা হাড়ের টুকরা সরবরাহ করা হয়। সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে বলেই কম খরচে প্রান্তিক পর্যায়ের রোগীদের টিস্যু দেওয়া সম্ভব হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
ড. এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, হেপাটাইটিস বি, এইডস এবং যেকোনও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে টিস্যু (হাড়) সংগ্রহ করা হয় না। ফলে এ ক্ষেত্রে হাড় ব্যাংকের সংগৃহীত হাড় যে শতভাগ নিরাপদ তা নিশ্চিত করা হয়। তিনি আরও জানান, যেসব রোগীর মাথায় অপারেশনের সময় মাথার খুলি (স্কাল) খুলে রাখতে হয় বা কোনও টুকরো অংশ আলাদা করে রাখা হয় তা আবার মাথায় প্রতিস্থাপনের সময় সম্পূর্ণরূপে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হয়। তা না হলে সংক্রমণের ভয় থাকে। আমরা মাথার খুলি (অটোগ্র্যাফট) জীবাণুমুক্ত করে তা মাথায় বসানোর জন্য প্রস্তুত করে দেই।
ইন্সটিটিউটের পরিচালক আরও জানান, মানবদেহে টিস্যু গ্রাফটিংয়ের সফলতা শতভাগ। ব্যর্থ হওয়ার কোনও রেকর্ড নেই। পঙ্গু হাসপাতালসহ যেসব জায়গায় হাড়ের টিউমার বা ট্রমাটিক ইনজুরির অপারেশন হয় সেসব জায়গায় টিস্যু ব্যাংকের ব্যবহারের সফলতা ঈর্ষণীয়।
জানা গেছে, সাভারের গণকবাড়িতে পরমাণু শক্তি কমিশনের কার্যালয়ে এই টিস্যু ব্যাংক গড়ে তুলতে গবেষণার কাজ শুরু হয়। সেবাদান কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯০ সালের পরে। ২০০৩ সালে এটিকে টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়াল রিসার্চ ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হয় যা চলতি বছর ইন্সটিটিউটে রূপ পায়। চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার রোগী হাড় ব্যাংক থেকে সেবা নিয়েছেন। বছর তিনেক আগে সেবা গ্রহণকারী রোগীর সংখ্যা ছিল সাড়ে ছয় হাজারের বেশি। গত তিন বছরে টিস্যু ব্যাংক থেকে রোগীদের সেবা গ্রহণের হার বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
আরও জানা গেল, এই ব্যাংক থেকে প্রতিদিন রোগীদের জন্য হাড় দেওয়া হয় না। প্রতি সপ্তাহে ব্যাচ আকারে চিকিৎসকদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে রোগীর স্বজনদের হাতে হাড় (বোন চিপস) দেওয়া হয়। সে হিসেবে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২০০-৩০০ পিস বোন চিপস দেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের জরুরি চাহিদাপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য সময়ও বোন চিপস দেওয়া হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মহা-পরিচালক মাহবুবুল হক জানালেন, টিস্যু ব্যাংক বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে এখনও সেভাবে প্রচার-প্রচারণা পায়নি। এটা করা গেলে মানুষ আরও ব্যাপকভাবে জানতে পারত এবং সেবাভোগীর সংখ্যা আরও বাড়ত। তিনি উল্লেখ করেন, এই টিস্যু ব্যাংকের কথা জানাতে বিভিন্ন পর্যায় সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সরকার টিস্যু ব্যাংক সম্প্রসারণের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দও দিয়েছে।
টিস্যু ব্যাংকে সাধারণত দুই ধরনের কাজ হয়। অটোগ্রাফট (নিজের শরীরের হাড় বা মাথার খুলি ব্যবহার) এবং অ্যালোগ্রাফট (মানবেদেহ থেকে সংগৃহীত টিস্যু বা হাড়)। জেনোগ্রাফট (বিভিন্ন স্পেসিজ থেকে সংগৃহীত টিস্যু) নামের একটি কাজও টিস্যু ব্যাংকে হতো কিন্তু বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধির কথা চিন্তা করে জেনোগ্রাফটিংয়ের জন্য টিস্যু সংগ্রহের কাজ টিস্যু ব্যাংক বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানা গেছে। ম্যাডকাউ, জলাতঙ্কের মতো রোগব্যাধি কোনওভাবে যাতে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেকারণে এই ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন। টিস্যু ব্যাংকের শুরুর দিকে এটি চালু থাকলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরে তা বন্ধ করে দিয়েছেন। যদিও সারাবিশ্বেই এখন এটি (জেনোগ্রাফট) বন্ধ রয়েছে।-বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ