টাঙ্গাইলে নিহত জঙ্গি শুভ গোদাগাড়ীতে পুলিশকে গুলি করেছিল

আপডেট: অক্টোবর ১৪, ২০১৬, ৬:৫১ অপরাহ্ণ

Militant
নিজস্ব প্রতিবেদক ও নওগাঁ অফিস
টাঙ্গাইলে র‌্যাবের অভিযানে নিহত দুই জঙ্গির মধ্যে একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। তার নাম আহসান হাবিব ওরফে শুভ (২৪)। শুভ ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে আকাশ আলী নামে এক পুলিশ সদস্যকে গুলি করেছিল। অবশ্য ওই দিন শুভসহ হাসান আলী (২৭) নামে এক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডারকে আটক করে পুলিশ।
ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন গোদাগাড়ী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদি হাসান। তিনি জানান, ওই দিন বিকেলে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কে উপজেলার কসাইপাড়া নামক স্থানে তিনি দু’জন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলের কাগজপত্র দেখছিলেন। সন্ধ্যার একটু আগে জঙ্গি শুভ ও হাসান আলী একটি মোটরসাইকেলে চড়ে রাজশাহীর দিকে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল শুভ। আর পেছনে বসেছিল হাসান। তাদের থামাতে সংকেত দেয় পুলিশ। কিন্তু তারা সংকেত অমান্য করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় কয়েক হাত সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্য আকাশ আলী তাদের মোটরসাইকেলের ওপর থেকেই ধরে ফেলার চেষ্টা করেন।
এ সময় শুভ তার কোমর থেকে পিস্তল বের করে আকাশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। গুলিটি আকাশের পায়ের কিছু অংশ ভেদ করে চলে যায়। এ সময় পেছন থেকে আরেক পুলিশ সদস্য তাকে জাপটে ধরে। এ অভিযানে তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, ৭ রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়। পরে আহত পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এসআই মেহেদি আরও জানান, মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা হাসানের পায়ে  অস্ত্রোপচার করা ছিল। এ কারণে সে পালাতে পারেনি। তাদের দু’জনকে আটক করে থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা করা হয়। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
হাসান আলী চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার গোলাপবাজার গ্রামের নাসির উদ্দীনের ছেলে। আর শুভ নওগাঁর রানীনগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের আলতাফ হোসেনের ছেলে। এই শুভসহ আরেক জঙ্গি গত শনিবার টাঙ্গাইলের কাগমারা মির্জামাঠ এলাকায় র‌্যাবের অভিযানে নিহত হয়।
এই দুই জঙ্গি নিহত হওয়ার পর তাদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে র‌্যাব-১২ জানিয়েছিল, তাদের দু’জনের বাড়িই রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায়। কিন্তু চারঘাটে তাদের কোনো ঠিকানা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে র‌্যাব জানায়, জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দুটি ভুয়া। তারপর অনুসন্ধান করে র‌্যাব জানতে পারে এই দুই জঙ্গির আসল ঠিকানা।
নিহত জঙ্গি আহসান হাবিব শুভ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করতো। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে অস্ত্রসহ আটক হওয়া সময় সে ¯œাতক তৃতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলো। আটক হওয়ার পর ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিল। কিন্তু জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৭ জুলাই তার বাবা আলতাফ হোসেন রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। যার ক্রমিক নম্বর ৩৬৫।
এ ব্যাপারে বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহাদত হোসেন খান বলেন, শুভকে খুঁজে পেতে বিভিন্ন স্থানে তার ছবিসহ বার্তা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তার কোনো হদিস মেলে নি।
রাবির ইংরেজি বিভাগের সভাপতি মাসুদ আখতার বলেন, গণমাধ্যমে শুভর ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এই শুভই তাদের নিখোঁজ শিক্ষার্থী। অস্ত্রসহ আটক হওয়ার পর শুভ জামিন পেলেও আর ক্যাম্পাসে আসতো না। তার পরিবারের লোকজন অনেক খুঁজেও তাকে পান নি।
নওগাঁর রানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান মুঠোফোনে জানান, শুভর বাবা একজন দলিল লেখক। শুভ নওগাঁ কে.ডি স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ইংরেজি বিভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। রাজশাহী যাওয়ার পরই সে জঙ্গি কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে। তার ব্যাপারে এলাকার কোনো মানুষ কিছু জানেন না।
রাজশাহী নগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম বলেন, শুভ নিখোঁজ থাকায় সে জঙ্গি কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েছে, এমন আশঙ্কা পুলিশেরও ছিল। তার ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল। কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
গত শনিবার টাঙ্গাইলে শুভ ও অপর একটি জঙ্গি র‌্যাবের অভিযানে নিহত হওয়ার পর তাদের আস্তানা থেকে একটি রিভলবার, একটি পিস্তল, ১২ রাউন্ড গুলি, ১০টি চাপাতি, দুটি ল্যাপটপ এবং ৬৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের মর্গে শুভর বাবা আলতাফ হোসেন ছেলের লাশ শনাক্ত করেন।
এদিকে নওগাঁ অফিস জানায়, আহসান হাবিব শুভর লাশ তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার  দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের পারিপারিক গোরস্থানে  দাফন করা হয়েছে। শুভ ওই গ্রামের আলতাফ হোসেন   ছেলে। গত মঙ্গলবার রাতে আলতাফ হোসেন টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল মর্গে শুভর লাশ শনাক্ত করেন। এরপর বুধবার বিকেলে নিহত শুভর বাবা  টাঙ্গাইল  পুলিশের কাছ থেকে লাশ গ্রহণ  করেন। রাত সেয়া ৭টার দিকে শুভ লাশ গ্রামের এসে পৌঁছালে উৎসুক নারী পুরুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় করেন। লাশের নামাজে জানাযা শেষে বাদ এশা তার লাশ পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।