টানা ১৮ মাস দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ অনলাইন শিক্ষা যেন কোন বৈষম্য তৈরি না করে

আপডেট: মে ৭, ২০২১, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

টানা ১৮ মাস দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ক্লাস সংসদ টেলিভিশনে প্রচার শুরু হয়। যদিও সেসব ক্লাস শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত এডুকেশন ওয়াচ রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে দূরশিক্ষণে (সংসদ টিভি, অনলাইন, রেডিও ও মোবাইল ফোন) ৩১.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ৬৯.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো ধরনের অনলাইন শিক্ষার আওতায় আসেনি। যেসব শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে, তাদের মধ্যে ৫৭.৯ শতাংশ ডিভাইসের অভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। আর গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৬৮.৯ শতাংশ।
করোনার এই পরিস্থিতিতে আমাদের কারও বাস্তবতার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া দেশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যেভাবে অনলাইন ক্লাস করছে, সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এ শিক্ষায় নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে শহর ও গ্রামে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে অনলাইনে যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে তা সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না। গ্রামপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ অনলাইন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে শহরের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
এই মুহূর্তে করোনার যে পরিস্থিতি তাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা খুবই কঠিন। এজন্য অনলাইন ক্লাসকেই আরও আধুনিক ও সবার অংশগ্রহণ উপযোগী করতে হবে। ভাবতে হবে, আমাদের কতজন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে আর কত জন বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিতদের শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং সময়মতো সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় গ্রামের যেসব শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-সংযোগ, ডিভাইস ও কম মূল্যের ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের আইসিটি বিষয়ে অভিজ্ঞ করে তুলতে হবে। সেইসাথে অনলাইন ক্লাসকে আরও জোরদার ও কার্যকরী করতে বিশেষায়িত অ্যাপ তৈরি এবং সফটওয়্যারের উন্নতি করা প্রয়োজন। এছাড়া অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের অর্থ সহায়তা, বিনামূল্যে বা অল্পমূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ, ইলেকট্রনিক ডিভাইস প্রদান করে তাদেরকে ঝরে পড়া থেকে ঠেকাতে হবে। ব্যবহারিক বিষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে বিশ্লেষণধর্মী এবং সৃজনশীল প্রতিফলনের প্রতি জোর দিতে হবে। গৎবাঁধা ক্লাসের মত আত্মস্থ না করে মুখস্থ করে পড়া জমা দেয়ার বিষয়টি যেন মূল লক্ষ্য হয়ে না হয়ে ওঠে, সেজন্য শিক্ষকদের আন্তরিক হতে হবে। পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আমাদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে, যেন আমরা পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রশাসন, সকলের জন্য প্রক্রিয়াটি নতুন। তাই পারস্পরিক দোষারোপহীন সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে অনলাইন শিক্ষাকে সফল করতে হবে।
শিক্ষাজীবন শেষে যেহেতু পরবর্তী সময়ে চাকরি, আয় এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে, তাই শিক্ষার বঞ্চনা সারা জীবন ভোগ করতে হবে অগণিত প্রজন্মকে। এই বঞ্চনা সারানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ