টিআইবিকে প্রশ্ন এবং প্রাসঙ্গিক বক্তব্য

আপডেট: মার্চ ১৪, ২০১৭, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


গত ১ ফেব্রুয়ারি দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের কার্যালয়ে এক সভায় ‘দক্ষ’ ও ‘নিরপেক্ষ’ ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। পত্রিকান্তরে আরো জানা গেছে, টিআইবি’র সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৩৫ জন সদস্য ওই সভায় অংশ গ্রহণ করেন। পরিবেশিত সংবাদে বলা হয়, ‘দক্ষ’ ও ‘নিরপেক্ষ’ ব্যক্তিদের নিয়ে ইসি গঠনসহ এতদ্বিষয়ে সংবিধানের আলোকে আইন প্রণীত না হওয়ায় অংশগ্রহণকারীরা উদ্বিগ্ন। সভায় উপস্থিত ব্যক্তিগণ মনে করেন, ‘সরকার প্রণীত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের অন্তর্ভুক্ত অন্যতম প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতার ওপর দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে অগ্রগতি নির্ভরশীল।’ এ ছাড়া তারা সার্চ কমিটি কর্তৃক বাছাইকৃতদের নামের তালিকা (মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে যা পেশ করা হবে) জনসম্মুখে প্রকাশেরও আহ্বান জানান। এতো সব দাবির পরও গত ৮ তারিখ নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। তারা আন্তরিকভাবে বলেছেন, রাজনীতিকদলগুলোর সহযোগিতা পেলে তারা সুষ্ঠু আইনানুগভাবে আগামী নির্বাচন পরিচালনা করবেন। তারপরও বিএনপির সুরে সুর মিলিয়ে টিআইবি বলবে, এই কমিশন দলনিরপেক্ষ নয়, দল বিশেষের। তারা এখন বিএনপি’র দাবির প্রতিও বেশ সচেতন। বিএনপি দাবি তুলেছে, বিরোধী দলের সঙ্গে বৈঠক করে লেবেল প্লেন পলিটিক্যাল ফিল্ড আর তত্ত্বাবধায়কের পরিবর্তে বলছেন, ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার’। এমন বিভ্রান্তি এবং সিদ্ধান্তহীনতার নজির কেবল বিএনপিই সৃষ্টি করতে পারঙ্গম। তারা যেখানেই ব্যর্থ সেখানেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান। ষড়যন্ত্রকারীদের এমন মনোবৃত্তি কারণ তারা নিজেরাই নানা ষড়যন্ত্রে এবং সন্ত্রাসে যুক্ত। তাদের দল ইতোমধ্যেই বিদেশের আদালতেও ‘সন্ত্রাসী দল’ হিসেবে স্বীকৃতি ও খ্যাতি অর্জনে সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে দেশবাসী বলছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সম্প্রতি গয়েশ্বর রায় ‘গণজাগরণের মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি নাকি আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাহলে টিআইবি কি বলবেন, বিএনপি’র কে? নিশ্চয়ই নাম জমাদানকারী দলগুলো কেউ বলবেন কে কোন্ দলের সমর্থক? আসলে টিআইবি আর বিএনপির এক কথা, এক সিদ্ধান্ত ‘সালিশ মানি তবে তালগাছটা আমার’। এরা কিছুতেই সন্তুষ্ট নয়। আরেকবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে তারা রাজনীতিক দল হিসেবে আর বিবেচিত হবে না, তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে বলেই আগামী জাতীয় নির্বাচনে তারা প্রতিযোগিতা করবে। তখন পরাজিত হলে বলবে কি? এখনই বলছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী থাকলে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। অর্থাৎ তাদের আচরণের অভিযোগে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে জেনেই আগামী নির্বাচন কেনো সুষ্ঠু হবে না তার অগ্রিম ব্যাখ্যা খোদ ম্যাডাম দিয়েছেন। তার দলের নেতা-কর্মীরাও সে বক্তব্য অগ্রিম শাণিয়ে নিচ্ছেন।
আপাতঃ দৃষ্টিতে ওপরের কথাগুলো জনমনে বেশ চমক সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণ মানুষ এ সব নিয়ে কতোটা সচেতন সেটা তর্কসাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু তারা ব্যস্ত জীবনে এ সব নিয়ে চিন্তার অবকাশ খুব কমই পান। কিন্তু নির্বাচনে তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়। যেমন-এ দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কে বেশি জনজীবনকে উন্নত এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, কারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রাখছে? কারা ভারতের সন্ত্রাসী আমদানি করে? কারা ১০ ট্রাক অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের কাছে পাঠাতে গিয়ে ধরা খেয়েছে? এ সব নিয়ে খুব কমই মূল্যায়নের সুযোগ মেলে সাধারণ মানুষ। তবে চেষ্টা তারা করে যখন সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজে লাগে। কিন্তু অবমূল্যায়নের বেলায় আমরা যারা যে মতে ও দলে আস্থাশীল, তার আলোকে বলতে গিয়ে ভাবি, পাছে কারো রক্তচক্ষু দেখতে না হয়। একবারও মনে করি না, প্রতিটা চিন্তা ও কাজের ভালো ও মন্দ দিক যেমন রয়েছে। তেমনি রয়েছে কোন্টা বেশি কার্যকর ও জনগণের স্বার্থে বিবেচিত হবে। যেমন গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র রাজনীতির সবচেয়ে শুদ্ধতম পদ্ধতি তা বলার অর্থ নিরপেক্ষহীনতারই দৃষ্টান্ত। লোকে কথায় বলে, ‘সংসারে পাগল আর শিশু ছাড়া কেউই নিরপেক্ষ নয়’। যদি মানুষের এই মূল্যায়নকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ‘পাগল’ কিংবা ‘শিশু’ কি রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষম অথবা উপযুক্ত? তা না হলে আমরা কেনো বার বার রাজনীতিতে ‘দক্ষ’ ও ‘নিরপেক্ষতা’র দাবি করি? তাহলে তো সবাই এক দলভুক্ত হয়ে যেতো। কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকতো না। যারা ক্ষমতাসীন তারা সব সময়ই বিরোধীদের থেকে বেশি গুরুত্ব পান। সুযোগ-সুবিধাও। সেটা কী ‘দক্ষতা’ আর ‘নিরপেক্ষতা’র দৃষ্টান্ত? টিআইবি এই যে ‘দক্ষ’ আর ‘নিরপেক্ষ’ ইসি দাবি করেছে, সেটার মানে কিন্তু বিভ্রান্তিকর। সরকার চেষ্টা করবে তাদের পক্ষের মানুষকে প্রমোট করতে। বিরোধী দল শক্তিশালী আর ঐক্যবদ্ধ হলে তাদের তালিকার ব্যক্তিরা ইসির সদস্যভুক্ত হতে পারতো। আর এই মুহুর্তে বিএনপি মোটেই বিরোধী দলের কেউ না। কারণ তারা সংসদ নির্বাচন করে সে কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি। সংসদে যাদের প্রতিনিধিত্বই নেই তারা কী করে সে দাবি করতে পারে? তারপরও বর্তমান সরকার যখন জামাত ব্যতীত দেশের বিদ্যমান প্রায় সকল দলের মতামতের আলোকে ইসি গঠন করতে চান, তখন ইসি গঠনের আগেই কেনো এমন দাবি? তার মানে কি ‘খাটের তলে কে রে?’ জবাবে কলাচোর বলছে ‘আমি তো কলা খাইনি’Ñঅনেকটা এ রকম নয় কি? জামাত-বিএনপি জোটের সময় ইসি গঠনের পূর্বে টিআইবি এমন দাবি তোলেনি। তখনও কিন্তু এ দেশে তাদের কার্যক্রম বেশ জোরতালে চলেছে। তখন কেনো এমন দাবি জানানো হয়নি? হয়নি এ জন্যে যে, তারা জামাত-বিএনপি’র তল্পিবাহক। দেশবাসীর নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১১ সালের ৫ মার্চ মতিঝিল গোল চত্ত্বর থেকে হেফাজতিদের প্রচারিত বক্তব্যের সঙ্গে এই টিআইবি অভিন্ন মত পোষণ করে সে রাতের পুলিশ কর্তৃক হত্যার অভিযোগ যারা তুলেছিলো তাদের সঙ্গে সংখ্যা এবং ঘটনা নিয়ে সহমত পোষণ করেছিলো। পুলিশ তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থার তালিকা নিয়ে তদন্ত করে প্রমাণ করে, যাদের নামে তালিকা দেয়া হয়েছিলো, তারা সকলেই স্ব স্ব ঠিকানায় জীবিত এবং কর্মরত। তাহলে টিআইবি কী করে সে তালিকা সমর্থন করেছিলো? এটা কী তাদের নিরপেক্ষতার চিত্র? করেছিলো তারাও একটি রাজনীতিক দল-মতের সমর্থক, তাই। কারণ তাদের পূর্ব-পুরুষদের রাজনীতিক ও সামাজিক কর্মকা-ের ইতিহাস সে তথ্যই দেয়। টিআইবি’র প্রধান ড. ফকরুলের পিতা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ছিলো বলে জানা যায়। সে কারণে আওয়ামী লীগ এবং চোদ্দ দলের যে কোনো ভালো কার্যক্রমেই তাদের গাত্র দাহের সৃষ্টি হয়। ২০১৫ সালের তিন মাসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যাহত করার লক্ষ্যে যে ভাবে পেট্রোলবোমা মেরে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেছে, তখন তো টিআইবি তাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করেনি! ২০০১-এ জাতীয় নির্বাচন পর দেশময় একাত্তরের কায়দায় যে ভাবে হত্যা-ধর্ষণ-নিপীড়ন বিএনপি-জামাত জোটের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা চালিয়েছে, তখন টিআইবি, ড. ইউনূস, ‘সুজনে’র বদরুল আলম মজুমদার, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য-এরা কেউই বিপন্ন মানুষের পাশে অবস্থান নেননি। কিন্তু কথায় তারা ফুলঝুড়ি ছুটিয়েছেন। অক্ষমের আস্ফালন বেশি। দেখা গেলো প্রভাবশালী ক্লিনটন পরিবারের প্রিয়ভাজন হওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংক শান্তিতে নোবেল পেয়ে গেলো। অথচ শান্তির জন্যে ওই প্রতিষ্ঠান একটিও কাজ করেনি। উল্টো তাদের কিস্তির টাকা সপ্তাহ-অন্তে পরিশোধ ব্যর্থ হওয়াদের বাড়ির টিন কিংবা গোরু-ছাগল নিয়ে যাচ্ছে। তাদের সুদের হার দেশের অন্যান্য ব্যাংক থেকে দশ গুণ বেশি। দশ গুণ বেশি সুদ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে যে পরিবার পারছে না, তাদের পক্ষে তো টিআইবি’র প্রতিবাদী কণ্ঠ দেশবাসী শোনেনি। শোনেনি বদরুল মজুমদার আর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের দাবির সুর। কারণ তারা এদেরই অনুচর, এদেরই তোষক-পোষক। এরা এই অনির্বাচিতদের দ্বারা গঠিত দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেই তাদের পোয়া বারো। সে সুযোগ যদি মহাজোট সরকার তাদের দিতো, তাহলে তারাও চুপ করে যেতো। তারা কি প্রতি বছর তাদের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসেব দেন? যদি দিয়ে থাকেন তাহলে সে হিসেবের খতিয়ানও জনসম্মুখে তুলে ধরার জন্যে দেশের সংবাদপত্র এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি। অন্যের শরীরের উঁকুন বাছবেন তারা, নিজেদেরটা কেনো রাখবেন? সেটা কি সংক্রামক করার বদ্-উদ্দেশ্যে? হয়তো সে রকমই তারা চান। না হলে যে সংস্থাটি বিদেশি অর্থে পরিচালতি হয়, সে কী করে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় নাক গলায়? তারা যদি এতোটা স্বচ্ছতা এবং যথার্থতার কথা ভাবেন, তাহলে আইএস যে সব নিরস্ত্র মানুষকে তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়ণ করেছে, তাদের যখন জার্মানসহ ইউরোপের অনেক দেশ আশ্রয় দিতে কার্পণ্য করছে, কোনো কোনো দেশ তো ঢুকতে দিতেই ইচ্ছুক নয়, তাদের বিরুদ্ধে কখনো টিআইবি একটি কথা বলেছে, এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের সংবাদপত্রে নেই। তারা যে জার্মানের অর্থে পরিচালিত হয়, সেখানে উদ্বাস্তুদের সরকারি পৃষ্ঠাপোষকতায় নির্যাতন করা হচ্ছে, তার মানবতাবিরোধী অপরাধ-অন্যায়ের প্রতিবাদ টিআইবি করেনি। ‘সুজনে’র বদরুল আলম মজুমদার কিংবা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কেউই করেননি। কেনো? কারণ ওই দেশগুলো আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দালালি করার জন্যে এই সংস্থাগুলোকে অর্থায়ন করে। আর তাই তারা নো কমেন্ট। কেনো? কমেন্ট করলে, তাদের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কোটি টাকার গাড়িতে চেপে দেশময় সভা-মতবিনিময় করাসহ বিলাস-বিত্তের জীবনে নেমে আসবে অন্ধকার। ওদের অর্থেই এরা লম্প-ঝম্প করেন। আমাদের দেশের ইসি কী ভাবে গঠিত হবে সে চিন্তা রাজনীতিকদের করতে দেয়াটাই সমীচীন। এনজিওদের সে সুযোগ আছে কি না সরকার বলবেন। এনজিও কখনোই রাজনৈতিক দলগুলোর সমান্তরাল হতে পারে বলে আমার মতো মূর্খের অন্তত জানা নেই। কারো সে বিষয়ে আইনানুগ কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। তাহলে ভারত-ইংল্যান্ড কিংবা আফ্রিকা-আমেরিকা সরাসরি এসে আমাদের রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে। করে না কেনো? সেটা অনাচার, অপকর্ম, অভদ্রতা, অসভ্যতা, ইতরামি এবং আরো তার অধম কিছু, তাই করে না। এদের নিরক্ষেতা কী কেবল বাংলাদেশ বিরোধীদের পুনর্বাসন প্রকল্পের খতিয়ান হবে, না দেশের উন্নয়নে তারা আন্তরিক হবে?