টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস

আপডেট: অক্টোবর ২৩, ২০১৬, ৯:৫৩ অপরাহ্ণ

মো. আবুল হাসান, খনরঞ্জন রায়
মানুষ এই সুন্দর পৃথিবীকে সুন্দরতর করার জন্যই আবহমানকাল ধরে মানুষ সংগ্রাম করে যাচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার হচ্ছে মঙ্গলময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। সভ্যতার ক্রমবিকাশে মানুষ এককেন্দ্রিক চিন্তা পরিহার করছে। বহুমুখি চিন্তা দ্বারা অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসছে। পৃথিবীর সমস্ত দেশ আজ এ অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। বিশ্ব শান্তি এবং দারিদ্র্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে  কাজ করার ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের ফসল স্বাধীন দেশসমূহের সংস্থা জাতিসংঘ।
ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধের বিভীষিকাকে ধারণ করে ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে জন্ম নিয়েছিল এই সংস্থা। পৃথিবীর জাতিতে জাতিতে সন্দেহ, বিদ্বেষ, অনাস্থা, অবিশ্বাস, অসহিষ্ণুতা, অসহমর্মিতা যখন তছনছ করে দিচ্ছিল মানবসভ্যতাকে-মানবতাকে, তখন অত্যন্ত সুদূরপ্রসারি চেতনার সংঘবদ্ধ ধারণা নিয়ে জাতিসংঘের জন্মলাভ। ক্ষুধার্ত পৃথিবীর ক্ষুধা নিবারণে, যুদ্ধবাজ জাতিসমূহে অশান্তি ও অস্থিরতাকে অবদমন করতে, আঞ্চলিক বিরোধ নিষ্পত্তি করতে, নিরলসভাবে কাজ করেছে গত শতাব্দীজুড়ে জাতিসংঘ। সত্তর বছরের জাতিসংঘ পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অনন্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
উত্তর থেকে দক্ষিণে-পূর্ব থেকে পশ্চিমে, পৃথিবীর যেখানে সংকট ঘনীভূত হয়েছে, জাতিসংঘ এগিয়ে এসেছে, কথা বলেছে, নিন্দা বা প্রতিবাদ করেছে, নাড়া দিয়েছে, তাড়না দিয়েছে, সংকটের সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। যেখানে জাতিসংঘকে অসহায়ের ভূমিকায় দেখা গেছে সেখানে মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়েছে। মানুষ কথা বলেছে। নিপীড়কদের নিন্দা জানিয়েছে। এখানেও জাতিসংঘ প্রকারান্তরে সার্থক হয়েছে।
সময়ের সাথে পৃথিবীতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় এবং রাষ্ট্র রাজনীতির পরিবর্তন হয়েছে। এখানে অভিযোজন, ভূ-রাজনৈতিক সামাজিক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বে জনসংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন সূচকে পৃথিবীর দেশে দেশে পরিবর্তন এসেছে। পৃথিবীর মেরুদ-ে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পৃথিবীর দেশ ও সমাজ মনে করে শক্তিশালী জাতিসংঘ পারে উৎকৃষ্ট পৃথিবী উপহার দিতে। এজন্যই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান ইউএন চার্টারে। এই চার্টার তৈরি করেন বিশ্বের ৪৯ জন খ্যাতিমান রোটারিয়ান। জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশে

রাষ্ট্র/সরকার প্রধানেরা ‘ট্রান্সফরমিং আওয়ার ওয়ার্ল্ড: দ্য ২০৩০ এজেন্ডা ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শিরোনামের একটি কর্মসূচি অনুমোদন করেন। এই এজেন্ডায় কতগুলো ‘বিস্তারিত, সুদূরপ্রসারী ও গণকেন্দ্রিক, বিশ্বজনিন ও রূপান্তর সৃষ্টিকারী লক্ষ্য ও টার্গেট অন্তর্ভুক্ত’, যা ‘গ্লোবাল গোলস’ বা ‘২০৩০ এজেন্ডা’ হিসেবে অবহিত। এজেন্ডাটির উদ্দেশ্য হলো বিশ্বমানতার সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, যা বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্বাধীনতা ও কার্যকর অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত করবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে মানুষ এবং অর্জিত হবে পরিবেশের ভারসাম্য
২০৩০ সালের এজেন্ডায় সবার ও সব দেশের জন্য প্রযোজ্য ১৭টি লক্ষ্য অর্ন্তভুক্ত: ১) সব ধরনের দারিদ্র্য দূর করা ২) ক্ষুধা দূর করা ৩) সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা ৪) সবার জন্য অর্ন্তভুক্তিমূলক ও মানসম্মত এবং জীবনব্যাপি শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা ৫) নারীদের সম-অধিকার এবং তাঁদের ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা ৬) সবার জন্য টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পায়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা ৭) সবার জন্য সুলভ; নির্ভরযোগ্য টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা ৮) সবার জন্য স্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক কার্যক্রম কর্মের নিশ্চয়তা প্রদান করা ৯) স্থিতিশীল অবকাঠামো তৈরি, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করা ১০) অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা ১১) নগর ও জনবসতিগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই করা ১২) টেকসই উৎপাদন ও ভোগ নিশ্চিত করা ১৩) জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা ১৪) পরিবেশ উন্নয়নে সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা ১৫) স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও টেকসই ব্যবহার উৎসাহিত, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, মরুকরণ প্রতিহত এবং ভূমির মানে অবনতি রোধ ও জীববৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা ১৬) টেকসই উন্নয়নে শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ এবং সর্বস্তরে কার্যকর, দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ১৭) টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতিগুলো শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক অংশিদারিত্ব জোরদার করা। এই ১৭টি লক্ষ্যের অধীনে রয়েছে সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট, সময়াবদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য ১৬৯টি টার্গেট।
নতুন এজেন্ডার একটি বিশেষত্ব হলো, এটি সংশ্লিষ্ট সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে, যদিও এমডিজি প্রণয়ন করেছিলেন একদল বিশেষজ্ঞ। ২০৩০ এজেন্ডার ভিত্তি হলো জাতিসংঘের ইতিহাসের সর্বাধিক অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ, যাতে বহু দেশের অসংখ্য নাগরিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সদস্যরাষ্ট্রসমূহ অংশ নিয়েছে। বস্তুত, এটি জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য ও জনগণের এজেন্ডা এবং এর বাস্তবায়নও নির্ভর করবে মূলত জনগণের ওপর।
জনগণ বলতে বেশিরভাগ হচ্ছে কর্মক্ষম যুবগোষ্ঠির কথা বর্তমানে বিশ্বে ১.৮ বিলিয়ন তরুণ-যুবা জনগোষ্ঠি রয়েছে। জাতিসংঘের মতে, ১৫-২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠি যুবক। বিশ্বায়নের এ সময়ে এ যুব জনগোষ্ঠি সবচেয়ে বেশি পরস্পরে সঙ্গে সংযুক্ত, স্পষ্টবাদী ও উন্মুক্তমনা। এ বিশাল জনগোষ্ঠি আমাদের জন্য শুধু ভবিষ্যৎই নয়, বর্তমানও বটে। তারা ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিশালী বাহক। এক্ষেত্রে আমাদের বিশাল যুব জনগোষ্ঠি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও সময়পোযোগী কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার। তাদের কর্মক্ষম করার জন্য দরকার প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার ধারা বিচূর্ণ করা। প্রতিষ্ঠা করা প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা শিক্ষা। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ তরুণ প্রজন্ম। এদের শিক্ষা সুস্বাস্থ্য ও কর্মদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ভবিষ্যতের কা-ারি হিসেবে তাই এই তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ, সুশিক্ষিত ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। কিশোরকাল হচ্ছে জীবন গঠনের সঠিক ও উপযুক্ত সময়। কিশোর-কিশোরীরা যাতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সে জন্য তাদের শৈশব থেকেই দেশপ্রেমের মহান শিক্ষাসহ সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে। তাদের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। তরুণ সম্প্রদায়ের ডিপ্লোমা শিক্ষায় জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
কন্যাশিশু ও নারীরা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। তাঁরা ভোক্তা, চাকরিজীবী ও উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার মতো প্রযুক্তিগত শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। কন্যাশিশু ও নারীদের ক্ষমতায়ন শুধু যে সঠিক কাজ তা নয়, এটি টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ, যার প্রভাব নারীদের ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যখন অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কন্যাশিশু ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণ করে তখন একটি দেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। যখন নারীরা তাঁদের কাজের ন্যায্য মজুরি পান, তখন তাঁদের উপার্জনের একটি বড় অংশ সন্তানের স্বাস্থ্য, লেখাপড়া ও পরিবারের উন্নতির কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পরিবারের পুরুষেরা প্রায়ই অন্যান্য বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে সমর্থন জোগানো এবং সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের পথ নয়, এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লাভ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে সামাজিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৪ সালে প্রথমবারের মত ‘ডিপ্লোমা শিক্ষা উন্নয়ন দেশ ও জাতির উন্নয়ন’ স্লোগান নিয়ে ২৫ নভেম্বর জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা হয়।
২০১৫ সালের জাতিসংঘের ভিশন ২০৩০ অনুসারে ‘টেকসই উন্নয়নে ডিপ্লোমা শিক্ষা’ (ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং ভড়ৎ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ) সেøাগান নিয়ে ২য় বারের মতো জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ২০১৫ উদযাপিত হয়। ব্যাপক আলোচনা, পর্যালোচনা, প্রচারণার ফলে বাংলাদেশে ডিপ্লোমা শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রসারে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেছে।
ভারত সরকার বাংলাদেশের ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অতিরিক্ত এক লাখ শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষে প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য ২ হাজার ৩৮১ কোটি ১৬ লাখ টাকা আর্থিক সহযোগিতা প্রদানে সম্মত হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সরকার ও ভারত সরকারের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের নাম ‘ক্রিয়েটিং ফ্যাসিলিটি ফর এডিশনাল ওয়ান লাখ স্টুডেন্টস এনরোলমেন্ট ইন ৪৯ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটস’। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৪৯টি পলিটেকনিকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা বৃদ্ধি, প্রচলিত ট্রেডসমূহের পাশাপাশি আরো নতুন ১৮টি ইমার্জিং টেকনোলজি চালু করে অতিরিক্ত এক লাখ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হবে। এতে দেশিয় ও বিশ্ব জব মার্কেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। নতুন ১৮টি ইমার্জিং টেকনোলজি হলো: এনিমেশন অ্যান্ড ফিল্ম মেকিং, ডাটা কমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং, ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিসার্ভেশন, ফুটওয়ার অ্যান্ড লেদার প্রডাক্টস, কিন অ্যান্ড ফার্নেস, ল্যান্ডস্কেপ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড আর্কিট্রাক্টচার, মিডিয়া অ্যান্ড জার্নালিজাম, মোশন গ্রাফিক্স অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং, মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন, কমিউনিকেশন, ওশেনোগ্রাফিক, পক্ষাষ্টিক অ্যান্ড পোলিমার শিমুলেশন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সোলার, স্ট্রাকচারাল সিরামিক, টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ট্রান্সপোটেশন ও ওয়েব ডিজাইন।
বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন কোর্স চালু করে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় উন্মুক্ত নীতির কারণে বেসরকারিভাবে কৃষি, শিল্প, টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যখাতে সহাস্রাধিক ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডিপ্লোমা শিক্ষার গুরুত্ব যে অপরিসীম তা আমরা অনেক আগে থেকে অনুভব করতে সক্ষম হই। এ প্রেক্ষাপটে অতি সম্প্রতি শিক্ষার মানোন্নয়নে এক হাজার ৪০ কোটি টাকার  একটি প্রকল্প সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করে, যেখানে ১০০টি উপজেলায় একটি করে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। গত সাত বছরে ডিপ্লোমা শিক্ষার হার ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, এর আগে এ হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ। আমাদের দেশে কারিগরি  ও ডিপ্লোমা শিক্ষার হার ও এ শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।
একারণেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করেছে। এক্ষেত্রে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ফলাফল অর্জনের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশে এবং বিশ্বব্যাপি উন্নয়ন সুদূরপ্রসারি ও টেকসই করতে হলে এই অগ্রযাত্রায় কন্যাশিশু ও নারীদের সহ যুবদের ডিপ্লোমা শিক্ষার মাধ্যমে কর্মক্ষম করে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী ২৫ নভেম্বর ২০১৬ বাংলাদেশে ৩য় বারের মতো নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা দিবস’ (ঘধঃরড়হধষ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ উধু) এবং ১ম বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস (ডড়ৎষফ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ উধু ২০১৬) আন্তর্জাতিকভাবে সাড়ম্বরে উদ্যাপন করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
২০১৬ এর সেøাগান ‘গ্রাম উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ (জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়হ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ ইড়ধৎফ) নির্ধারণ করে প্রচারণা শুরু করা হয়েছে। ১ম বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ২০১৬ এবং ৩য় জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস উদযাপন পরিষদ ২০১৬ এর মাধ্যমে ‘গ্রাম উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ নামে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ/বই প্রকাশ করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ পরিণত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। প্রতিবছর গড়ে ১৪ লক্ষ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর অর্ধেক তরুণকে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে ১০টি সরকারি/বেসরকারিভাবে কৃষি, ভেটেরিনারি, লেদার, পলিটেকনিক, টেক্সটাইল, মেডিক্যাল টেকনোলজি, নার্সিং, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, মেডিকেল ও ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাবার, মোবাইল ব্যাংকিং, এয়ারহোস্টেজ, পর্যটন, সাংবাদিকতা, বিমান পরিচালনা, সাবমেরিন, মহাকাশযান, নিউক্লিয়াস ইত্যাদি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্সসহ সকল পণ্য ও পেশায় কমপক্ষে ৫০০ (পাঁচশত) নতুন ডিপ্লোমা কোর্স চালু করতে হবে।
ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর জাতীয়ভাবে ‘জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস’ পালনের  নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। আর তা হলে জাতিসংঘ ঘোষিত বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষরিত এসডিজিএস কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। এই অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করতে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রশাসনিক ৮টি বিভাগে ৮টি ‘ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠার আইন পবিত্র জাতীয় সংসদে পাশ করতে হবে।
বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ জাতিসংঘের সদর দপ্তরে গউএঝ ঃড় ঝউএঝ অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছেন  ইধহমষধফবংয খবধফ নু বীধসঢ়ষব রহ ঝউএঝ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা যদি ২০১৬ সাল থেকে বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস (ডড়ৎষফ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ উধু) পালনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, সত্যিকার অর্থেই এসডিজিএস (ঝউএঝ) পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। ২০১৬ সাল থেকে বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ডড়ৎষফ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ উধু উদ্যাপিত হলো। বিশ্বব্যাপী এক ও অভিন্ন ডিপ্লোমা কোর্স চালু হবে। নতুন নতুন বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স ও তৃণমূলে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হবে। পথহারা দিকনির্দেশনাহীন  তরুণরা এইসব ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা শিক্ষা অর্জন করে স্বউদ্যোগে শিল্প কারখানা, হাসপাতাল, খামার প্রতিষ্ঠা করে স্বাবলম্বী হবে। বাংলাদেশ এই দায়িত্ব নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের মাধ্যমে ২৫ নভেম্বরকে বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ডড়ৎষফ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ উধু ঘোষণা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এই কামনা আমাদের রইল। আর তা সম্ভব হলেই প্রতি বছর ক্ষুধা, দারিদ্র, সংঘাত সংঘর্ষমুক্ত মানবমুক্তির সংগঠনের দিবস হিসেবে দৃঢ় হবে জাতিসংঘ।
লেখক : সভাপতি ও মহাসচিব , ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ
কযধহধৎধহলধহৎড়ু@মসধরষ.পড়স