ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের আত্মোপলব্ধি : চিকিৎসকের নৈতিকতা প্রসঙ্গ

আপডেট: নভেম্বর ১১, ২০১৬, ১১:৫১ অপরাহ্ণ

ফিকসন ইসলাম
বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার অন্যতম শীর্ষ শিক্ষায়তন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (ভূতপূর্ব পিজি হাসপাতাল) এর সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত চিকিৎসক ডা. ও রোগী সম্পর্ক বিষয়ক এক সেমিনারে বক্তব্য করেছেন যে, চিকিৎসকরা যদি ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন নেয়া বন্ধ করেন তাহলে এ দেশে চিকিৎসা প্রত্যাশী রোগিদের চিকিৎসা ব্যয় ৪০ শতাংশ কমে আসবে- বিলম্বে হলেও এই সৎ ও সাহসী সত্য উচ্চারণের জন্য ডা. প্রাণ গোপাল আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন পাবার যোগ্য। কিন্তু তিনি যখন চিকিৎসকদের নৈতিকতা, আদর্শের দিকে আঙ্গুলি তাক করলেন তখন অনেক সময় পার হয়ে গেছে। এখন তিনি পতিত উপাচার্য, তাঁর কথা বা ভালো উপদেশ শোনার কেউ নেই। কথায় বলে চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। উপাচার্য পদ থেকে অবসর নেবার আগে যদি তিনি এখন কথা বলতেন সৎসাহস নিয়ে সরকারের সাথে আলোচনা করে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন (?) খাওয়া বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতেন তাহলে বেচারা রোগিদের উপকার হতো। এখন তাঁর কথা, হিতোপদেশ কে শুনবে কেইবা মান্য করবে? অত্যন্ত সাহস করে তিনি একথাও বলেছেন, কমিশন বিজনেসের জন্য চিকিৎসকদের সম্মানের অবনমন ঘটেছে। চিকিৎসকদের উচিত হবে কমিশন খাওয়ার মত ম্যাল প্রাকটিস থেকে বেরিয়ে আসা, তাহলে চিকিৎসকরা হারানো সম্মান ফিরে পাবে। নীতি নৈতিকতা মেনে রোগিদের সাথে পেশাদারি সম্পর্ক গড়ে তোলারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর এই আহ্বান যাদের জন্য তারা অর্থাৎ চিকিৎসকদের বিবেক বুদ্ধিকে কি কোনভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছে? অর্থ উপার্জন বা অর্থ আদায় এর ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে ভদ্রতা যে চিকিৎসকদের মধ্যে আছে তার একটি বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য পর্যবেক্ষণ। চিকিৎসার মত মহান ও মহৎ পেশাও যে পেশাদারিত্বের অনুপস্থিতির কারণে নি¤œমুখি ধারণা মানুষের মধ্যে বিরাজিত হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চিকিৎসাসেবা নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা কিংবা কষ্টের কাহিনী নেই বা অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি এমন লোকের সংখ্যা আমাদের দেশে খুবই কম। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশের স্বাস্থ্য খাত এখন পর্যন্ত সেবামুখি হতে পারেনি। বরং তা একমাত্র অর্থের মাপকাঠিতেই রোগির চিকিৎসা মান কতটা উন্নত হবে সেটাই নির্ভর করে। অথচ দরিদ্র জনগোষ্ঠির চিকিৎসাসেবা নেয়াটা অত্যন্ত বিড়ম্বার জটিল ও প্রতারণামূলক। এক ধরনের শোষণ নিস্পেষণ তো আছেই। রোগিকে চিকিৎসার চেয়ে বরং তার কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে নিঃস্ব করে ফেলার একটা অসম ও নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা রয়েছে। দেশের স্বনামধন্য ও খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক হিসেবে সর্বোপরি দেশের মেডিক্যাল শীর্ষ বিদ্যাপিঠের সর্বোচ্চ পদে আসীন তার পেশার সহকর্মীদের সাথে এই বক্তব্য শুধুমাত্র নিষ্ঠুর নয়, বাস্তব বটে।
প্রকৃতপক্ষে যারা মানুষের সেবা করবে, চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলার জন্য শপথ নিয়েছে তারা যখন সকল নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কেবল অর্থের পুজায় নিজেকে ব্যাপ্ত রাখে তখন সীমাহীন কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর অন্য কোন উপায় থাকে না। নৈতিকতা বিসর্জনকারী এই মহান পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের আচার আচরণে একটা স্খলন সর্বদায় লক্ষ্য করা যায়।
প্রথমত ঃ যখন দেখা যায়, একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ির উইন্ডশিল্ড বা সামনে ও পেছনের কাঁচে আন্তর্জাতিক সেবার ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন তথা জঊউ ঈজঊঘঞ (আগে ছিলো জবফ ঈৎড়ংং ) এর মনোগ্রাম বা প্রতীক ব্যবহার করে তখন লজ্জায় নিজের মাথা এমনিতেই অবনত হয়ে পড়ে। আমাদের দেশের সেরা ছাত্ররাই মেডিকেল বা চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করে ডাক্তার ডিগ্রি অর্জন করে। আজকাল বেসরকারি মেডিকেল কলেজ সৃষ্টি হওয়ায় অর্থ বিত্তবানরাও ডাক্তার হয়ে বেরিয়ে আসছেন। এক কথায় এরা সবাই মেধাবী ছাত্র তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যখন দেখি এই কথিত মেধাবী ছাত্ররা কোনটি ডাক্তারের প্রতীক (ঝুসনড়ষ) মনোগ্রাম এবং কোনটি রেডক্রস বা রেডক্রিসেন্ট এর প্রতীক বা মনোগ্রাম তার পার্থক্য বুঝতে পারল না তখন নিজেকে শিক্ষিত বলে ভাবতে মনোকষ্ট হয় যথেষ্ট। আমার মাথায় এটা আসে না একজন চিকিৎসকের নিজস্ব মনোগ্রাম বা প্রতীক রয়েছে তার পরেও কেনইবা তারা রেডক্রস এর মনোগ্রাম ব্যক্তিগত গাড়ি, বাড়ির পর্দায় ব্যবহার করে। রেডক্রস এর মনোগ্রাম এর সাথে কি চিকিৎসককের কোন সম্পর্ক আছে। রেডক্রস একটি সাহায্যসেবা ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন এর নিজস্ব প্রতীক বা মনোগ্রাম আছে যা ব্যক্তিগত যানবাহনে ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় পত্রিকায় বড় বড় করে বিজ্ঞাপন দিয়ে রেডক্রস এর প্রতীক এর ব্যবহার সম্পর্কে সতর্কিকরণ করা হয়। আমার জানা মতে এই মনোগ্রাম বা প্রতীক ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়ে চিকিৎসকের বলা হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা, আর যখন চিকিৎসকরা কেবল অর্থের পেছনে দৌড়ান তখন এসব চিঠি পড়ার সময় কোথায়? শ্রদ্ধেয় প্রাণ গোপাল দত্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক থেকে কমিশন খাওয়ার কথা বলেছেন কিন্তু আরো একটি কমিশন নেবার কথা বলেন নি। এটি হলো ওষুধ কোম্পানিগুলো থেকে প্রতারণা ও কৌশলের মাধ্যমে অর্থ আদায়। এমন কোন ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি নেই যারা নিয়মিতভাবে চিকিৎসকদের মাসিক মাসোহারা দেন না। শুধু মাসিক মাসোহারাই নয়, ওইসব ওষুধ কোম্পানি চিকিৎসকদের বিদেশ ভ্রমণ প্রমোদ ভ্রমণের অর্থ জোগান দিয়ে থাকে। এমনকি মফস্বল শহর থেকে কোন চিকিৎসক ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় ভ্রমণ করেন তখন বাসস্ট্যান্ড বা এয়ারপোর্ট থেকে ভ্রমণ সমাপ্ত পর্যন্ত তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন। কোন চিকিৎসক যদি সেমিনার শিম্পোজিয়ামে বিদেশে যাবেন বলে মনোনয়ন লাভ করেন তখন ওই ওষুধ কোম্পানি তাদের টিকিট থেকে শুরু করে পাসপোর্ট এ ডলার এনডোরসমেন্টের ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়া যে কোম্পানির যত ওষুধ চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে (চৎবংপৎরঢ়ঃরড়হ) উল্লেখ করবেন সেই কোম্পানির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নগদ অর্থ কিংবা উপহার সামগ্রী বা উপঢোকন দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু ওষুধ কোম্পানিগুলো কেন এটা করে, তারা তো ব্যবসায়ী। ফলে চিকিৎসকদের পেছনে অনৈতিক ও নীতিহীনভাবে অর্থ ব্যয় করে থাকে- সেটা প্রস্তুতকৃত ওষুধ বিক্রি করে আদায় করে নেই। যার খারাপ ফল পোহাতে হয় এদেশের চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশী গরীব ও অসহায় রোগিদের। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, ওষুধ বা ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল এর উৎপাদন খরচ (ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ পড়ংঃ) ২ টাকা ৩০ পয়সা সে ওষুধটির খুচরা মূল্য ধরা ধরা হয় ২৯ টাকা। অর্থাৎ আয়ের ২৬.৭০ টাকার মধ্যে বড় ধরনের কমিশন পায় চিকিৎসকরা আর বাকিটা লভ্যাংশ। আর একারণেই ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো দিনে দিনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েই যাচেছ- যা ডা. প্রাণ গোপাল উল্লেখ করেননি। ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর কাছে চিকিৎসকদের অসহায় আত্মসমর্পণ, যা কেবল মাত্র অর্থের বিনিময়ে সেটা স্পষ্ট। ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা মেডিকের রিপ্রেজেনটিটিভদের মোটরসাইকেলে করে কর্মস্থলে আসা যাওয়া থেকে শুরু করে তাদের কাছ থেকে উপহার উপঢোকন হিসেবে টিস্যুপেপার, তোয়ালে, কলম খাতা থেকে শুরু করে খাদ্য দ্রব্য তথা চা. সেমাই গ্রহণ করার বিনিময়ে ওই কোম্পানিকে আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দিতে যে নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত কার্যক্রম চিকিৎসকরা করছে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সুতরাং, ওষুধ কোম্পানিগুলোকে ব্যবসা উন্নয়নের জন্য নীতিহীন কার্যক্রমে চিকিৎসকগ সহযোগিতা না করলে এখন চিকিৎসা প্রত্যাশী রোগির চিকিৎসা ব্যয় আরো ৩০ শতাংশ কমে যেতো। ফলে ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ক্লিনিক থেকে কমিশন গ্রহণ না করলে ওষুধ প্রস্তুতকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে নিলর্জ্জ আত্মসমর্পণ না করলে একজন রোগির চিকিৎসা ব্যয় নিঃসন্দেহে (৪০+৩০)=৭০ শতাংশ কমে যেতো এটা অনস্বীকার্য যা ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের বক্তব্যে অনুল্লেখ থেকে গেছে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বাস্তবতার নিরিখে সত্য কথাই বলেছেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন গ্রহণ, ওষুধ কোম্পানি থেকে অবৈধভাবে অনৈতিকভাবে সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করার ফলে চিকিৎসকদের সম্মানের অবনমন ঘটেছে এটা তিনি নিজে চিকিৎসক হিসেবে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আর এর একটা সমাধানও দিয়েছেন যাতে করে চিকিৎসকরা হৃত গৌরব ফেরাতে পারে।
ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন গ্রহণ ছাড়াও আজকাল ডাক্তাররা রিপোর্ট দেখানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে জোরপূর্বক। এটাতে সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকা– সেটা তারাও জানে, তার পরেও তথাকথিত স্টাটাস বজায় রাখতেই তাদের এই প্রচেষ্টা। একজন রোগি যখন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করতে যান তখন তাকে পাঠানো হয় প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় কিছু ঞবংঃ করতে। ওই টেস্ট এর রিপোর্ট দেখাতে গেলে পুনরায় ফি নেন, এমনটি আগে ছিলো না। ফলে আজকাল চিকিৎসকদের লাভের ওপর লাভ। প্রথম লাভ ডায়াগোনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন গ্রহণ, দ্বিতীয়ত ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ বা উপঢৌকন গ্রহণের বিনিময়ে ওষুধের নাম লেখা, তৃতীয়ত রিপোর্ট প্রদর্শনের সময় আবারও জোরপূর্বক অর্থ আদায়, এমন সব অনৈতিক ও অমানবিক কর্মকা- ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন (হয়তবা তিনিও করেন) বলেই জীবন সায়াহ্নে আত্মপক্ষ সমর্থনের মতই তিনি মানসিকভাবে উপলব্ধি করে চিকিৎসকদের ‘কমিশন’ গ্রহণের মত ম্যাল প্রাকটিস না করে রোগিদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন। এখন আমাদের দেখার বিষয়, তাঁর এই উদাস্ত আহ্বানে স্বগোত্রীয় চিকিৎসক শ্রেণি কীভাবে সাড়া দেয়, চিকিৎসাসেবা দিতে তাদের যে শপথ (ড়ধঃয) ও অঙ্গীকার তাই পেশাদারিত্বের মূল চালিকা শক্তি হওয়া উচিৎ। এর বাত্যয় মনে মহান পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণœ করা এবং এটি আমাদের দেশে ঘটছে নিরন্তর।
লেখক: প্রকৌশলী