ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটালি হয়রানি

আপডেট: মে ১১, ২০১৭, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

ফিকসন ইসলাম


এপ্রিল মাসের ২ তারিখে বিকেল ৬টার দিকে ইজঞঅ থেকে আমার মোবাইল ফোনে (নং- ০১৭১২৭৮২০২১) একটি ক্ষুদে বার্তা বা ঝগঝ আসে। এতে ইংরেজিতে লেখা ছিলো-
ণড়ঁৎ ড়হিবৎংযরঢ় উজঈ ভড়ৎ জধলংযধযর গঊঞজঙ-ঞঐঅ-১১-০০৫১ রং ৎবধফু. ইৎরহম ুড়ঁৎ ধষষ ৎবমরংঃৎধঃরড়হ উড়পঁসবহঃং ড়হ অঢ়ৎরষ ৬ ধঃ ২.৩০ চগ ঃড় ৪.০০চগ, ইজঞঅ জঅঔঝঐঅঐও.
বিআরটিএ’র এই প্রেরণকৃত এই ক্ষুদে বার্তাটি দেখে আমি রীতিমত অবাক হলাম দুটো কারণে। প্রথমতঃ এই বার্তায় যে গাড়ির নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে আমার গাড়ির বেশ কিছু অক্ষর ও শব্দের মিল আছে। যেমন মিল আছে জধলংযধযর সবঃৎড়, সিরিজের ১১ এবং নম্বরের ক্ষেত্রে ৪ এর বদলে পাঁচ, তবে ‘ক’ এর পরিবর্তে লেখা হয়েছে ‘ঠ’। দ্বিতীয়ত এই ডিজিটাল যুগে নিশ্চয় ইজঞঅ ’র কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কোথাও কোন ভুল হয়েছে। এমন হতে পারে, ক্ষুদে বার্তাটি টাইপ করার সময় ভুল হয়েছে কোন শব্দ চয়ন করার সময়, তবে এটা নিশ্চিত আমার মোবাইল নম্বর অবশ্যই ঠিক আছে তানা হলে এই “ডিজিটাল বাংলাদেশের” যুগে ডিজিটাল কার্যক্রমতো ভুল হবার নয়। আবার উজঈ এর পূর্ণরূপ কি অজ্ঞতাবশত সেটাও আমার জানা নেই।
যেহেতু আমি একজন সরকারি কর্মচারী তাই সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে এখন থেকে ৯ বছর আগে ২০০৮ সালে ওঋওঈ ব্যাংক রাজশাহী শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ পূর্বক উত্তরা মোটরস লি. এর শো রুম থেকে ৮০০ সিসির একটি ঝুঁড়শর গধৎঁঃর গাড়ি ক্রয় করি। উক্ত গাড়ির ফিটনেশ, ঞধী ঃড়শবহ আয়কর প্রদান এমনকি জীবন বিমা সময় সময়ে বা যথাসময়ে নবায়ন করা হয়েছে। গাড়ির যখন ডিজিটাল নম্বর প্লেট প্রদান করা হয়েছিলো তখনও ইজঞঅ থেকে এ ধরনের ক্ষুদে বার্তা বা ঝগঝ প্রদান করা হয়েছিলো, এবং যথারীতি নির্ধারিত সময়ে নওদাপাড়াস্থ বিআরটিএ কার্যালয় থেকে তা লাগিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রতিবছরের নির্ধারিত সময়ে গাড়ির ব্লুবুক, ফিটনেস ও ঞধী টোকেন গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত ইজঞঅ দপ্তরের পক্ষ থেকে যতবার ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে ডাক পড়েছে ততবারই নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়েছি এবং প্রত্যাশিত কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি। কিন্তু সর্বশেষ গত ২.৪.২০১৭ তারিখে প্রাপ্ত ক্ষুদে বার্তাটি পেয়ে বেশ অবাক হলাম। আমাকে ৬ এপ্রিল বিআরটিএ কার্যালয় রাজশাহীতে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এর কাগজপত্র নিয়ে হাজির হতে হবে। হাতে সময় মাত্র ৩ দিন। সরকারি দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের জন্য আমাকে সুদুর রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করতে হয়। ফলে ইচ্ছেমাফিক রাজশাহী আসা সম্ভব হয় না, ছুটিছাটার ব্যাপার আছে। এছাড়া ক্ষুদে বার্তায় গাড়ির যে নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে সেটিও আমার গাড়ির রেজিঃ নম্বর নয়, তবে সেটা না হোক আমার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনেই তো বার্তাটি এসেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে তো এতো বড় ভুল বা এটি হবার কথা নয়। যাহোক ক্ষুদে বার্তা, প্রেরকের নাম ও ঠিকানায় কেবল উল্লেখ করা আছে ইজঞঅ জঅঔঝঐঅঐও। এতে কোন ল্যান্ডফোন নম্বর বা মোবাইল ফোন নম্বর দেয়া নেই। ফলে মহাবিপদে পড়া গেলো, ওই বার্তার ওপর নির্ভর করে আমাকে ঢাকা থেকে রাজশাহী যেতে হবে এবং যথারীতি ফিরতে হবে। সবকিছু বাদসাধ দিলেও কেবলমাত্র যাতায়াত করতেই কমপক্ষে তিন হাজার টাকার ধাক্কা সামলাতে হবে।
সাত পাঁচ ভেবে অনেক কষ্ট করে শেষে বিআরটিএ রাজশাহী কার্যালয়ের ল্যান্ড ফোন নম্বর যোগাড় করে ফোন করলাম। প্রথম দিকে কেউ ফোন রিসিভই করলো না এবং ফোনটি ফ্যাক্সমেশিন এর সাথে যুক্ত থাকায় কয়েকটি রিং হয়ে ঋঅঢ নম্বরে চলে যায়। যাহোক, দুদিন চেষ্টা করার পর তৃতীয় দিনে অর্থাৎ ৫ এপ্রিল তারিখে আমার ফোনটি এক ভদ্রলোক রিসিভ করলেন। তাঁর কাছে প্রথমে জানতে চাইলাম উজঈ-এর অর্থ কী,? তিনি উত্তরে জানালেন, ‘উজঈ-মানে উরমরঃধষ জবমরংঃৎধঃরড়হ ঈবৎঃরভরপধঃব।’ এরপর তাঁকে বিনীতভাবে জানালাম-‘আমার মোবাইলে আপনার দপ্তর থেকে একটি ক্ষুদে বার্তা বা ঝগঝ এসেছে। তাতে গাড়ির যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে সম্ভবত সে নম্বরটি ভুল হয়ে থাকতে পারে, অনুগ্রহ করে আপনি কি বিষয়টি চেক করে নিশ্চিত হয়ে আমাকে জানাতে পারেন?’ এর উত্তরে তিনি জানালেন, ‘এটা আমরা করি না, ডিজিটাল সেকশন করে এবং আপনাকে সশরীরে আসতেই হবে।’ এর প্রতিউÍত্তরে আমি জানালাম- ‘ভাই আমি ঢাকায় থাকি, ফলে ইচ্ছে করলেও আসা সম্ভব নয়।’ আমার প্রতি কোনরকম সহানুভুতি না দেখিয়ে তিনি জানালেন, ‘আপনি আসবেন কী আসবেন না সেটা আপনার ব্যাপার, তবে যা কিছু করার বা বলার সেটা এখানে (রাজশাহী) এসে বলুন।’ বলেই কোনরকম সৌজন্যতা না দেখিয়ে ফোনটা রেখে দিলেন। হয়ত বা ব্যস্ততার কারণে। যাহোক, অগত্যা আমি উপায়ন্তর না দেখে একদিন ছুটি নিয়ে রাজশাহী রওনা হলাম।
অতঃপর এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। যে সময়ে ইজঞঅ কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমাকে বলা হয়েছিলো। ঠিক সময়েই উপস্থিত হলাম এবং ডিজিটাল সেকশনে গিয়ে আমার মোবাইল ফোনে প্রাপ্ত ক্ষুদে বার্তা ঝগঝ টি দায়িত্বরত ব্যক্তিকে প্রদর্শন করলাম। তিনি আমার ম্যাসেজটি দেখলেন এবং আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে কম্পিউটারে সার্চ করে জানালেন-“হ্যাঁ আপনার মোবাইল নম্বরটি ঠিক আছে কিন্তু যে গাড়ির নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে সেটি ইগউঅ বা বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গাড়ি, যার মালিক বা যার নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে- তিনি নির্বাহী পরিচালক। দায়িত্বরত কর্মচারীর একথা শুনে আমিতো রীতিমত আকাশ থেকে পড়লাম। এটা কি করে সম্ভব? কারণ আমার মোবাইল ফোনটি ২০০৩ সালে কেনা হয়েছে সরাসরি গ্রামীণ ফোনের এজেন্ট এর কাছ থেকে। কারো ব্যক্তিগত ব্যবহার করার পর কেনা হয়নি এবং দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই একটি নম্বরই আমি ব্যবহার করছি ব্যক্তিগতভাবে। কোনদিন কাউকে ব্যবহারও করতে দেয়নি। তাহলে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ইগউঅ) শিরোনামে আমার নম্বরটি লেখা হলো কীভাবে? আমার ক্ষোভের কথা বিবেচনায় নিয়ে ইজঞঅ দপ্তরে ডিজিটাল শাখার কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট শাখায় ওই গাড়ির (রাজমেট্রো-ঠ-০০৫১) মূল নথি তলব করে অনুসন্ধানে নেমে পড়লো। এবং দেখা গেলো ইগউঅ ’র পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রেশন এর জন্য যে মোবাইল নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি আমার ব্যক্তিগত নম্বর এবং কীভাবে এতবড় ভুল দুইটি সরকারি প্রতিষ্ঠান (ইজঞঅও ইগউঅ) এর পক্ষ থেকে করা হলো সে রহস্য হয়তো আর কোনকালেই উদঘাটন করা সম্ভব হবে না। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশে আমি ডিজিটালি হয়রানির শিকার হলাম। ঢাকা-রাজশাহী যাতায়াত করতে আমার তিন হাজার টাকা গচ্চা হয়ে গেলো। একদিনের ছুটি নষ্ট হলো আর কায়িক বা শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের যে অভূতপূর্ব ক্ষতি হয়ে গেলো- সর্বোপরি যেভাবে হয়রানি হলাম-এর কোন সদুত্তর পাওয়া যাবে না কোনদিনও।
২০০৮ সালে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” স্লোগান নিয়ে আওয়ামীলীগসহ ১৪ দল তথা মহাজোট নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলো এবং ভূমিধস (ষধহফংষরফব) বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় সর্বত্র আধুনিকায়নের নামে ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতি চালু করা হতে থাকে। সত্যি বলতে কি জনগণ এতে দারুণভাবে সুবিধা পেয়ে আসছে। বিশেষত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল প্রকাশ, ভর্তি কার্যক্রম থেকে শুরু করে কর আদায় কার্য সমূহে জনগণের দ্বারপ্রান্তে সেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ফলে কম খরচে বেশি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনেও যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া সম্ভব হচ্ছে-সত্যি বলতে কি এই ডিজিটাল পদ্ধতি জনগণের যে কি উপকারে এসেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে পদ্ধতির ত্রুটি নয় এই পদ্ধতি যারা পরিচালনা করছে তাঁদের ব্যক্তিগত ত্রুটির কারণে জনগণ যেন হয়রানি ও হেনস্থার শিকার না হয়- সে বিষয়েও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে নজর দিতে হবে। যেমনটি আমার ক্ষেত্রে এটি ঘটেছে। এর দায়ভার কে নেবে???
লেখক: প্রকৌশলী