ড. আবদুল খালেক : একজন সফল মানুষের প্রতিরূপ

আপডেট: জানুয়ারি ১৭, ২০২০, ১:২১ পূর্বাহ্ণ

হামিদুর রহমান


আশিকে অতিক্রম করলেই অশীতিপর। অশীতিপর বৃদ্ধ। বৃদ্ধ? নাÑ তা তিনি নন। শুদ্ধতায়- স্নিগ্ধতায় শুভ্রতায়, এমনকি শ্রমে-সম্ভ্রমে-সফলতায় এক অফুরান যৌবন জীবনব্যাপিযাপন করছেন তিনি। বয়সের বেড়াজাল-বিস্বাদ- বিবশতা কিংবা বায়সিক বন্দিত্ব সবকিছুকে দু’পায়ে মাড়িয়ে তিনি চলমান। তাঁর গন্তব্য এক স্বাপ্নিক অগ্রযাত্রার অভিমুখে। স্যার। খালেক স্যার। স্যার তো তিনি বটেই! কিন্তু সত্য স্বীকারোক্তিতে বলছিÑ ‘স্যার’ শব্দমাত্র দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করাটা স্বল্পতার দোষযুক্ত পদবাচ্য হয়ে ওঠে। অন্তত আমার ক্ষেত্রে। কেননা আমার সরাসরি স্যারের স্যারের স্যারের স্যারের স্যার তিনি। অর্থাৎ তিনি আমার পঞ্চম বা ষষ্ঠ প্রজন্মের বয়সসমান স্যার। সেজন্যেই তাঁকে ‘স্যার’ শব্দসৌকর্যে সম্মানিত করতে আমার শ্রদ্ধাবোধের স্বল্পতা ও দুঃসাহসের নামান্তর মনে হয়। মনে হয় ‘কম হয়ে গেল না তো!’ বর্তমান পৃথিবীতে ‘অনুভূতি’ শব্দটাই যেখানে নিখোঁজ, সেখানে ‘সহানুভূতি’ শব্দটাকে স্যার তাঁর জীবনদর্শনের সাথে সুচারুরূপে লালন করে যাচ্ছেন। এ এক অনন্য কিছু। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষায়নিক পরিকাঠামোয় এই উত্তরবঙ্গের পাফাটা গাফাটা কৃষকসন্তানদেরকে যূথবদ্ধ করে সুশিক্ষিত করার জন্য স্যারের সৎ মানসিকতা ও সাহসিকতাÑআমাদেরকে কৃতজ্ঞ করে তোলে। স্যারের সরলতা-সততা-ভব্যতা সত্যিই তুলনারহিত। যে ক্লান্তিহীন নিরলস পরিশ্রম এখনাবধি তিনি করে চলেছেন, তা অবিকল্পভাবে অনুসরণীয় ও অনুপ্রেরণার। ব্যক্তিগত নিরীক্ষায় মনে হয় স্যার প্রতিদিন এখনও ন্যূনতম ৮-১০ ঘণ্টা লেখাপড়ার সাথে সরাসরি নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। নতুবা কিভাবে কী হয়? ২০১৬ থেকে তাঁর প্রায় প্রতিটি পাণ্ডুলিপির প্রথম পাঠক আমি। দেখেছি একরাতে বা একবেলায় কি অবলীলায় তিনি লেখা দাঁড় করিয়ে ফেলেন! এবং আরও আশ্চর্য, তা ঘটে একের পর এক, অবিরত। ক্লান্তি তাঁকে ক্লান্ত করতে পারে না কোন কালেই কোন কারণেই। অনেকবার তাঁর সফরসঙ্গী হওয়া আমার জীবনের এক বিরলতম অভিজ্ঞতা ও সুযোগ। তা বিস্মৃত হবার নয়! হবোও না! এরকম কত মুগ্ধতার কথা যে রয়েছে! লেখার পরিধির খাতিরে তা অনুক্ত রাখতে বাধ্য হচ্ছি। সুদীর্ঘকালের শিক্ষকজীবনের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে খালেক স্যারের খ্যাতি সর্বজনস্বীকৃত ও সর্বব্যাপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হতে শুরু করে উপাচার্যÑ সকল পদকেই অলঙ্কৃত করেছেন স্বমহিমায়। জাতীয়বেতন কমিশন, বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি, শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিশন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতি, মহানগর কমিউনিটি পুলিশিং, সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বিভিন্ন সাহিত্য পরিষদ, ফোকলোর গবেষণা সংসদ, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিসহ সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বদান তাঁকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও খুবই সম্মানের ও গৌরবের। ২০০৩ হতে শুরু করে অদ্যাবধি তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সদ্য সমাপ্ত ২১তম আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনেও ৬ষ্ঠ বারের মতো উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম দিকে স্যারের নামের অবস্থান, আমাদেরকে গৌরবদীপ্ত করে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে তাঁর একাগ্রতা ও অনলস
কর্মনিষ্ঠা সর্বজনবিদিত। এতোকিছুর মধ্যেও ফোক ও ইতিহাসনির্ভর তাঁর ২৫-এর অধিক মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশ আমাদেরকে আশ্চর্য করে তোলে অবধারিতভাবেই। কতটা কর্মনিষ্ঠ-অধ্যবসায়ী ও বিদগ্ধ হলে একা এক হাতে এভাবে সামলানো সম্ভব যাপিত সময়কে। তাঁর Ñ মধ্যযুগের বাংলাকাব্যে লোক-উপাদান (১৯৯৪), মযহারুল ইসলাম: জীবন ও সাহিত্য (২০১০), শহীদ ড. জোহা ও আমি (২০০৯), শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৫), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও বধ্যভূমি (২০১৬),
বিব্রত সংলাপ (২০১৭) গ্রন্থসমূহ আলাদাভাবে উল্লেখের যোগ্যতা রাখে। কী আর এমন বয়স হয়েছে স্যারের! তাঁকে দেখলে কে বলবে যে তিনি বিরাশি স্পর্শ করেছেন! তারুণ্য তাঁর কাজে, যৌবন তাঁর লেখায়, তেজ তার বক্তৃতায়… বায়সিক বন্ধ্যাত্বের বিপরীতে তিনি। সায়াহ্নের শিষ্য তিনি নন, তিনি শুরুর গুরু। কী এক অমিয় আনন্দধ্বনির ঝংকারে তাঁর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কোষগুলো সদা অনুরণিত-স্পন্দিত-জাগ্রত। তাঁর যে ধীশক্তি আর তিনি যে পরিমাণ স্থিতধী তা তাঁর নিকটমানুষ মাত্রই অবগত ও যারপরনাই বিস্মিত। এই বয়সেও একা একজন মানুষের পক্ষে এত বেশি সূক্ষè হওয়া, দূরদর্শী হওয়া, স্মরণসুষমায় জারিত থাকা সম্ভব কিভাবে তা একপ্রকার সকলেরই জিজ্ঞাসা! স্যার তাঁর বয়সের সাথে এভাবেই লুকোচুরি খেলে চলুক সুকৌশলে। গেল বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্যার ৮২ পর করে গেছেন। আমি নিশ্চিত নার্ভাস নাইনটিতেও এমনই অবিচল, দৃঢ়চেতা ও সুঠাম মানসিকতায় উজ্জীবিত থাকবেন স্যার। শুধু প্রার্থনা তিনি শতায়ু পান, পার করে যান বহুদূর! জয়তু ড. আবদুল খালেক স্যার
…যে জন
মনে রাখবার মতোন…