ড. জোহা হত্যা: আমার স্মৃতিকথা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২২, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক*


১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে ড. জোহাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তখন আমি তাঁর খুব কাছাকাছি ছিলাম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমি ছিলাম তাঁর সহকারী প্রক্টর। সে কারণে তাঁর সাথে আমার আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমরা একে অপরের বাসায় ঘন ঘন যাতায়াত করতাম। মিসেস নীলুফার জোহার ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয় এবং মধুর।

ড. জোহা এবং মিসেস জোহার হাসি-খুশি দাম্পত্য জীবন নিয়ে আমরা মাঝে মাঝে রসিকতা করতাম। ড. জোহা আমাকে গভীরভাবে ¯েœহ করতেন, আমি তাঁকে অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা করতাম। আমার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ¯েœহ ১৮ই ফেব্রুয়ারির করুণ ঘটনার অন্যতম কারণ কিনা, তা আমার কাছে এখনও এক বড় প্রশ্ন। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘটনাস্থল থেকে আহত আমাদেরকে উদ্ধার করতে না গেলে ড. জোহা হয়তো বেঁচে যেতেন। কিন্তু যাঁর রক্ত দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেবে, যাঁর মহান আত্মদান একটি দেশকে স্বাধীন করবে, ঘটনাস্থলে তাঁকে যেতেই হবে, নিয়তির এ ছিল অমোঘ বিধান।

১৯৬৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারির যে করুণ স্মৃতি আমার বুকের মধ্যে জমাট হয়ে আছে। সে স্মৃতি কখনও ভুলবার নয়। সকালে শীত যেমন থাকবার কথা, সে বছর শীত তেমন ছিল না। সে কারণে সকালে সোয়েটার গায়ে দেয়ার প্রয়োজন হয়নি। শার্ট গায়ে বাংলা বিভাগে চলে আসি। ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় সার্জেন্ট জহুরুল হকের নির্মম হত্যার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ মিছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শহরের দিকে এগিয়ে যাবে, এমন কথা আমাদের কানে এসেছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ এত বেশি বিক্ষুদ্ধ এবং উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল যে, সেখানে প্রক্টর বা সহকারী প্রক্টর হিসেবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবার কিছু ছিল না।

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে বাংলা বিভাগ আয়োজিত পুস্তক প্রদর্শনীর কাজে আমি ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে খুব ব্যস্ত ছিলাম। বর্তমান শহীদুল্লাহ কলা ভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে বাংলা একাডেমীর দেয়া বই- পুস্তকগুলো সাজিয়ে-গুছিয়ে নেয়া হচ্ছিল, এমন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাণের ভয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছে। বেলা তখন আনুমানিক সাড়ে নয়টা।

ছাত্র-ছাত্রীদের বিপদের কথা ভেবে সব কাজ ফেলে রেখে এগিয়ে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয় গেটের দিকে। নাটোর রোডে পা দিয়েই বুঝতে পারলাম সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা ছাত্রদেরকে গুলি করার জন্য রাইফেল তাক করে বসে আছে। ড. জোহা এবং তাঁর সাথে বেশ কয়েকজন শিক্ষক যেমন-ড. মযহারুল ইসলাম, ড. এম.আর সরকার, অধ্যাপক হবিবুর রহমান (পরবর্তীতে শহীদ) ড. কাজী আবদুল মান্নান, ড. কছিম উদ্দিন মোল্লা, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদেরকে নাটোর রোড থেকে সরিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচেছন। ড. জোহা কর্মরত সামরিক অফিসারকে বলছিলেন ‘প্লিজ ডোন্ট ফায়ার, আমার ছেলেরা এখনই চলে যাবে ক্যাম্পাসের মধ্যে।’

কিন্তু সামরিক অফিসারটি কোন কথা শুনতে রাজি নন। তিনি সামরিক বাহিনীর জওয়ানদেরকে গুলি করার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় গেটে সামরিক বাহিনীর জওয়ানদের উপস্থিতি আমাদের ছাত্রদেরকে উত্তেজিত করে তুলছিল। সামরিক বাহিনীর সাথে মেজিস্ট্রেট হিসাবে কর্মরত ছিলেন জনাব মো. নাছিম।

আমরা তখন ঘটনাস্থলে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেট নাছিম সাহেবকে অনুরোধ জানিয়ে বললাম বিশ্ববিদ্যালয় গেটে সেনাবাহিনীর লোকজনের উপস্থিতি আমাদের ছাত্রদেরকে উত্তেজিত করে তুলছে, জওয়ানদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেট থেকে সরিয়ে নিলেই আমরা ছাত্রদেরকে ক্যাম্পাসের ভিতরে সরিয়ে নিতে পারবো। আমাদের কথায় ম্যাজিস্ট্রেট নাছিম সাহেব জওয়ানদেরকে রেডিওর গেটের দিকে সরিয়ে নিতে সম্মত হন এবং সেই মোতাবেক নাছিম সাহেব একটা জিপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেট ছেড়ে বেশ খানিকটা পূর্বে রেডিওর গেটের দিকে এগিয়ে যান। জওয়ানেরাও ধীর পায়ে রেডিওর গেটের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

এই ব্যবস্থায় পরিস্থিতি অনেকটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সমবেত শিক্ষকগণ তখন দু’দলে বিভক্ত। একদল শিক্ষক ছাত্রদেরকে নাটোর রোড থেকে মেইন গেট দিয়ে ক্যাম্পাসের ভিতরে নিয়ে আসবার কাজে ব্যস্ত। এই দলে ছিলেন ড. জোহা এবং আরো অনেক শিক্ষক। আমি, ড. মান্নান এবং ড. মোল্লা জওয়ানদের পিছে পিছে রেডিওর গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

আমাদের অবস্থান ছিল ছাত্র এবং জওয়ানদের মাঝামাঝি। উদ্দেশ্য, যাতে জওয়ানেরা আমাদেরকে মাঝখানে রেখে ছাত্রদেরকে গুলি করতে না পারে। ছাত্ররা নাটোর রোড ছেড়ে ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢুকে পড়ছে দেখে আমরা স্বস্তি অনুভব করতে থাকি। পায়ে পায়ে আমরা যখন নাটোর রোড পার হয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ পাশে চলে এসেছি, এমন সময় আকস্মিকভাবে আমাদের উপর গুলি বর্ষিত হয়। গুলির আঘাতে আমরা ছিটকে পড়ে যাই নাটোর রোড সংলগ্ন দক্ষিণ দিকের খাদে। একই সাথে ছিটকে পড়ে যান শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. কাজী আবদুল মান্নান এবং বন্ধু ড. কছিম উদ্দিন মোল্লা। খড়ের গাদার মধ্যে পড়ে বুঝতে পারলাম ড. মান্নান এবং আমি কাছাকাছি আছি। আমার মাথা এবং ড. মান্নানের মাথা পাশাপাশি। ফিস ফিস করে আমরা কথা বলতে পারছিলাম।

মুহূর্তের মধ্যে একটা গুলির আওয়াজ কানে এলো। তারপর একটি তীব্র আর্তনাদ। বুঝতে পারলাম হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পাশের করুণ আর্তনাদ আরও তীব্র হয়ে উঠলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, ড. মান্নানও আমার সাথে উঠে এলেন। দু’পা এগুতেই একজন সামরিক অফিসারের হাতে ধরা পড়লাম। রিভলবার দিয়ে গুলি করতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটনাস্থলে সদ্য আগত জনৈক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার আমাদেরকে ‘আন্ডার অ্য্যারেস্ট’ বলে ঘোষণা করলেন। আমরা বেঁচে গেলাম। আমাদেরকে ধাক্কা মেরে মিলিটারি ভ্যানের কাছে নেওয়া হলো।

মাটিতে লুটিয়ে পড়া দেহটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ড. জোহার সাদা জামা রক্তে ভিজে লাল হয়ে উঠেছে, তিনি তখন গোঙাচেছন। আহত ড. জোহার কাছে আমরা যেতে চাইলাম, কিন্তু যেতে দেয়া হলো না। জওয়ানদের হাতে ড. মান্নান, ড. মোল্লা এবং আমি তখন বন্দি। জওয়ানেরা আমাদেরকে হিড়হিড় করে টেনে খোলা মিলিটারি ভ্যানে তুলে নিল। ম্যাজিস্ট্রেট ‘নাসিম’ সাহেবকে ডেকে আমরা চিৎকার করে বললাম, “ড. জোহা মরে যাচেছন, তাঁকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক” কিন্তু আমাদের কথাকে তারা কানে তোলেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতিপয় শিক্ষককে বন্দি করে খোলা মিলিটারি ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হচেছ। এ খবর শহরে রটে গিয়েছিল, ফলে পথের মোড়ে মোড়ে বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতার হাতে মিলেটারি ভ্যান বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। সেনাবাহিনীর লোকজনকে লক্ষ্য করে ছাত্ররা আড়াল থেকে ইট-পাটকেল ছুড়ে মারছিল। রাজশাহী শহরের সোনাদিঘির মোড়ে টাউন লন্ড্রির পাশ থেকে এক দল ছাত্র আমাদের মুক্তির দাবিতে জওয়ানদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষেই সিটি কলেজের ছাত্র ‘নূরুল ইসলাম’ সাহাদৎ বরণ করেন। মিলিটারি ভ্যানটি আমাদেরকে নিয়ে সোনাদিঘির পশ্চিম পারে অবস্থিত মিউনিসিপ্যাল অফিসের সামনে গিয়ে থামে।

পাশেই রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল। দেয়ালের ওপার থেকে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্ররা মিলিটারি ভ্যান লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল মারতে থাকে। এই সময় ড. মোল্লা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। তাঁকে একটি স্ট্রেচারে করে মিউনিসিপ্যাল অফিসে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে আমরা সেবাযতœ করতে থাকি। এক পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য ড. মোল্লাকে মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

মিউনিসিপ্যাল অফিসের একটি ঘরের মেঝেতে আমরা অনেকগুলো আহত মানুষের আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলাম। আহত লোকজনকে একটি ঘরে আটকিয়ে রাখা হয়েছিল। শুনেছি আহতদের মধ্যে ড. জোহাও ছিলেন। কিন্তু আমাদেরকে দেখতে দেয়া হয়নি। বেলা ১২ টার দিকে মিউনিসিপ্যাল অফিসের উপর তলায় আমাদেরকে একটি ছোট কুঠুরিতে (সাময়িক হাজত ঘর) আটকিয়ে রাখা হয়। প্রায় ঘণ্টা তিনেক হাজত ঘরে কাটানোর পর দেখা গেল মেডিকেল কলেজের একদল ছাত্র বেলা ৩ টার দিকে আমাদের খবরাখবর জানতে এসেছে। ড. মান্নান এর মধ্যে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন, আমিও ক্ষুধায় খুব ক্লান্ত।

মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে অবিলম্বে হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি নয়। কর্তৃপক্ষের সাথে ডাক্তারদের তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে যায়, এমন সময় আকস্মিক একটি খবরে সবাই বিচলিত হয়ে ওঠে। জানা যায় বুলেট এবং বেওনেটের প্রচ- আঘাতে জর্জরিত ড. জোহা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ড. জোহার মৃত্যুর খবর জানবার সাথে সাথে তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানও প্রমাদ গুণতে থাকে। আমাদেরকে জেল হাজত থেকে অমিলম্বে মুক্ত করে দেয়ার নির্দেশ আসে। ড. জোহার মৃত্যু শুধু আমাদেরকেই জেল হাজত থেকে মুক্ত করেনি। তাঁর মৃত্যু সমগ্র বাংলাদেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছে।

ড. জোহা নিজে সক্রিয় রাজনীতি করেননি, এ কথা হয়তো সত্য; কিন্তু ড. জোহা হত্যা অবশ্যই দেশের রাজনৈতিক ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। সব হত্যার প্রতিক্রিয়া একই রকম হয় না। ড. জোহার আগে বাংলাদেশের কোনো বুদ্ধিজীবী অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধ্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, তেমন উদাহরণ নেই। যে কারণে তুলনামূলকভাবে ড. জোহা হত্যার প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক। ড. জোহা ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অতি প্রিয় শিক্ষক। সমগ্র দেশ জুড়ে ছিল তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহী ছাত্র-ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে, এ খবর প্রচারিত হবার সাথে সাথে সমগ্র দেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। কারফিউ ভঙ্গ করে হাজার হাজার মানুষ পথে নেমে আসে।

সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। দেশে একটি ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থান ঘটে যায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পান শেখ মুজিব। জেল থেকে মুক্ত হবার পরপরই ‘বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন শেখ মুজিব। আন্দোলনেব মুখে একে একে পতন ঘটে জেনারেল আইউব এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খানের। বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কাজেই এ কথা আজ ঐতিহাসিকভাবে সত্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং ড. জোহা হত্যা কোনো বিচিছন্ন ঘটনা নয়। ১৯৬৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে ড. জোহাকে হত্যার সাথে সাথে দেশে যে গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তারই শেষ পরিণতি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা। শহীদ ড. জোহার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: উপাচার্য