ড. সুজিত সরকার : একজন বিরল দেশপ্রেমিক

আপডেট: নভেম্বর ১২, ২০২২, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

মো. সফিকুল ইসলাম:


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. সুজিত সরকার গত মঙ্গলবার (৮ নভেম্বর) ভোর পাঁচটায় তিনি চট্টগ্রামে একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। সুজিত সরকারের মৃত্যুতে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় শোককাতর আমরা। বুধবার (৮ নভেম্বর) পরম শ্রদ্ধা-ভালবাসায় রাজশাহীবাসী তাঁকে বিদায় দিয়েছি। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সামনে সকাল ৯টা ও শহরে ভুবনমোহন পার্কে ১০টায় বিভিন্ন সংগঠন ও সর্বস্তরের নাগরিক তাঁকে শেষবারের মত দেখেন, এ সময় ফুলে ফুলে ভরে ওঠে কফিন।
মৃত্যুর আগের দিন সোমবার (৭ নভেম্বর) দুপুর আড়াইটায় তাঁর সাথে আমার শেষ কথা হয়। ওনাকে ফোনে জানাই যে, রাজশাহী ইতিহাস পরিষদের সভা আজ বিকেল সাড়ে ছয়টায়, আপনি সম্মানিত সদস্য হিসেবে অংশ নিবেন নিশ্চয়ই। বললেন, পরীক্ষা নিতে চট্টগ্রামে এসেছি, ফিরতে দু’একদিন দেরি হবে। ওনার কণ্ঠস্বরে চমকে যাই। বলি, আপনি তো কথা বলতেই পারছেন না। জবাবে বললেন, আমি খুব অসুস্থবোধ করছি, শরীরটা চলছে না।
রাত পোহাল। সকাল আটটায় রাজশাহী থিয়েটারের বন্ধুবর কামার উল্ল্যাহ সরকার কামা আমাকে মৃত্যু সংবাদটি জানালেন ফোনে। এরপর অনেককেই ফোনে জানাই, যাকে জানাই সেই বিশ্বাস করতে চাইছেন না। সৃষ্টির অমোঘ নিয়মেই অনন্তযাত্রা করলেন আমাদের প্রিয় সুজিত দাদা, যে যাত্রা থেকে আর কেউ ফিরে আসেন না।
প্রফেসর ড. সুজিত সরকারকে আমি মানুষের সামনে ‘স্যার’ বলতাম, একা হলে প্রাণভরে ‘দাদা’ ডাকতাম। দাদা বললে বেশি খুশি হতেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুজিত দাদার সাথে আমার চলা তিন দশক। একসাথে আমরা বহু বুদ্ধিভিত্তিক কাজ করেছি, ওনার পরামর্শ নিয়েছি। শেষ কাজটিও চূড়ান্ত পরিণতির দিকেই যাচ্ছিল। সেটি হলো ইতিহাস-ঐতিহ্য ভিত্তিক একটি পত্রিকা প্রকাশ করা।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শে ১৮৯৯ সালে ৫ জানুয়ারি রাজশাহী শহর থেকে ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন বাংলার সুবিখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। এটি বাংলার প্রথম ইতিহাসভিত্তিক পত্রিকা। বন্ধুপ্রতীম ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমারের অনুরোধে কবিগুরু ঐতিহাসিক চিত্রের প্রথম সংখ্যার ভূমিকা লিখেন ‘সূচনা’ নামে।
আমরা নতুন করে পত্রিকাটি প্রকাশে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। দেড়বছর ধরে সংগোপনে আমরা নানা শলাপরামর্শ করে আসছি। প্রফেসর কবি রুহুল আমিন প্রমাণিক স্যার ঐতিহাসিক চিত্রের সম্পাদকম-লীর সভাপতি, ড. সুজিত সরকার প্রধান সম্পাদক ও আমি সম্পাদক, কামা ভাই নির্বাহী সম্পাদক—এই ছিল পরিকল্পনা। আমাদের অভিপ্রায় ছিল ঐতিহাসিক চিত্রকে ঘিরে ইতিহাস অনুরাগী প্রজন্ম গড়ে তোলা। সুজিত স্যার বলতেন, ‘যদি তরুণ-তরুণীদের মাতৃভূমির ইতিহাস-সংস্কৃতির প্রতি জীবনঘনিষ্ঠ করতে পারি, তাহলে এঁরা সত্যব্রতী হবে—গভীর দেশপ্রেমে বেড়ে ওঠবে। ঐতিহাসিক চিত্রকে ঘিরে ‘ইতিহাস-ঐতিহ্যপ্রেমি গোষ্ঠী গড়ে তুলতে আমরা প্রয়াস চালাবো।’
বৃহত্তর রাজশাহী, বরেন্দ্রভূমি ও বাংলার ইতিহাসচর্চার মহান ব্রত নিয়ে গত ২৯ অক্টোবর রাজশাহী মহানগরীতে গঠিত হয়েছে ‘রাজশাহী ইতিহাস পরিষদ’। এই পরিষদ গঠনে আমাদের চেতনা যুগিয়েছেন সুজিত স্যারও। পরিষদ গঠনের এক সপ্তাহ আগে বন্ধু কামার উল্লাহ সরকারকে নিয়ে ওনার বাসার সামনে গিয়ে একদিন রাতে ফোন দিলে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থাতেই নিচে নেমে এসে গেটে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ আমাদের সাথে কথা বলেন এবং ২৯ তারিখের সভার তারিখটি ওনারই দেয়া। পরে আমাদেরে এই কাজের প্রধান নেতা প্রিয় মানুষ কবি রুহুল আমিন প্রামাণিক স্যার তারিখটি ঠিক রেখে সভা সম্পন্ন করে সকলের সম্মতিতে রাজশাহী ইতিহাস পরিষদ গঠন করেন।
সুজিত স্যারের ও আমার বহু লেখা এক সাথে পত্রিকায় ছাপা হয়ে আসছে দুইযুগ ধরে। অনুজের প্রতি তাঁর অকৃত্তিম ভালবাসা। লেখা প্রকাশ হলেই আমাকে উৎসাহিত করতেন। ফোনে বলতেন, ‘পড়েছি, খুব ভাল’। পড়াশোনা ও গবেষণায় ছিল ওনার গভীর অনুরাগ। নিয়মিত পড়তেন-লিখতেন—জ্ঞান অন্বেষণ করতেন। শিখতেন—শেখাতেন। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ব। তিনি শিক্ষার্থী বান্ধব শিক্ষক ছিলেন।
ড. সুজিত সরকার একজন নিষ্ঠাবান লেখক ও গবেষক। তাঁর বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ গবেষণা জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। নিয়মিত পত্রিকায় কলাম লিখতেন। অসিম সাহসিকতায় ২০০৯ সালে সুজিত স্যার রচনা করেন ‘নাটোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’। দীর্ঘ গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফসল এই গ্রন্থটি, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের অসামান্য দলিল। এই গ্রন্থে যেমনি রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা-পরিচয়, তেমনি রয়েছে রাজাকার-আলবদর-আলশামস তালিকা-পরিচয়। নাটোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখিত এক রাজাকার পুত্র সুজিত সরকারকে প্রাণ নাশের হুমকী দিলে তিনি ২০২১ সালে ২৯ জুলাই রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় জিডি করেন। এরপর মামলাসহ নানাভাবে তাঁকে হয়রানি করা হয়। সুজিত সরকারের আরও গ্রন্থ : ‘যুদ্ধদিনের কথা’, ‘কবিতা কেন কবিতা’, ‘নাটোর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য’, ‘সাতিহ্য ভাবনা’, সাহিত্য ধর্ম চরিত্র ও ভাষা’।
সুজিত সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকালীন প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ বর্তমানঅবধি রাজশাহীর সকল সামাজিক আন্দোলনে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন। বলা যায়, রাজশাহীর প্রগতিশীল আন্দোলনের তিনি অন্যতম পুরোধা। বঙ্গবন্ধু পরিষদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কবিকুঞ্জু, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার, রোটারি ক্লাব, রাজশাহী ইতিহাস পরিষদ-সহ বিভিন্ন সামাজিক ও বুদ্ধিভিত্তিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃস্থানীয় ছিলেন। তিনি পরোপকারী ছিলেন, অন্যর বিপদ-আপদে সহায় হতেন। নিজের দেহটিও রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা শিক্ষার জন্য দান করে গেছেন।
প্রফেসর সুজিত সরকার তিনি ১৯৫৭ সালে নাটোরের সিংড়া কুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা- নলিনীকান্ত সরকার, মাতা- প্রভাবতী সরকার। নাটোর বড়াইগ্রমের বর্ণির সেইন্ট লুইস উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি-এইচ. ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় গত ২৯ জুন থেকে পিআরএল (অবসর পরবর্তী ছুটি) ভোগ করছেন। সুজিত সরকারের জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে রাজশাহীতে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুজিত সরকারের নাম গৌরবের সাথে উচ্চারিত হয়। ক্যাম্পাসে সকলেই তাঁকে চিনতেন একজন আপোসহীন কট্টর সৎ ও সাহসী মানুষ হিসেবে। মুখের ওপর সত্য উচ্চারণ করতে দ্বিধা করতেন না। এই সততা ও সাহসিতার জন্য আমরা তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ ছিলাম।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে তিনি নিবেদিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতার জীবনদর্শের প্রতি সুজিত স্যারের গভীর অনুরাগ ছিল। ওনার লেখার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মুক্তিযুদ্ধ। ‘জয় বাংলা’ দিয়ে লেখা শেষ করতেন, বিশেষ করে ফেসবুকে। এটা আমাদের খুব আকর্ষণ করতো। তাঁরকে অনুসরণ করে আমরা অনেকেই ‘জয় বাংলা’ লিখি। ড. সুজিত সরকার একজন সাদা মনের মানুষ—বিরল দেশপ্রেমিক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ যেদিকে তাকিয়েছি সেদিকেই যেন শুন্য মনে হয়েছে। খুব কষ্ট লাগছে। ভাই হারানোর বেদনায় আমি শোক বিহ্বল। রাজশাহী শহরে সুজিত দাদার নিবাস আলুপট্টি। ওনার বাসা থেকে সামান্য দূরে ঘোড়ামারায় ছিল বাংলার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের বাড়ি। ১৯৩০ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের প্রয়াণের পর তাঁরই বাল্যবন্ধু ভারতবর্ষ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেন ‘শোক-সংবাদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’ শিরোনামে লিখেন (ভারতবর্ষ, চৈত্র ১৩৩৬), এই সুদীর্ঘ কাল দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রে যে কত লোকের পরলোক-গমনের সংবাদ লিখিত হইয়াছে, তাহার সংখ্য নির্ণয় করিতে পারি না ; আর এ যে কি মর্ম্মান্তিক কর্ত্তব্য, সে কথা অনেক সময়ই ভাবিয়াছি। আজ আবার সেই কাজ সাশ্রুনয়নে করিতে বসিয়াছি,—আজ লিখিতে হইবে আমার আজম্ম-সুহৃদ, সখা, সুখ-দুঃখের সঙ্গী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের পরলোক-যাত্রার সংবাদ! ২৭শে মাঘ (১৩৩৬) সোমবার অক্ষয়কুমার এই অনিত্য সংসার, এই কয়দিনের খেলার ঘর ভাঙ্গিয়া সাধনোচিত নিত্যধামে চলিয়া গিয়াছে,—সেই কথা লিখিবার জন্য বাঁচিয়া রহিলাম আমি। অদৃষ্টের কি নিদারুণ, নিষ্করুণ, পরিহাস! নিয়তির কি নিষ্ঠুর বিধান! বিধাতার কঠোর বিধান পূর্ণ হইয়াছে—অক্ষয়কুমার সাধনোচিত ধামে চলিয়া গিয়াছেন, শুধু মনে হইতেছে অক্ষয়কুমার আরও কিছুদিন থাকিল না কেন ?’ ড. সুজিত সরকারের মুত্যুর পর হতে আমারও মনে ভাসছে, আহারে! দাদা যদি আর ক’বছর বাঁচত!
লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।