ঢাকায় জঙ্গি মাহফুজকে কলকাতা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, এনআই আসছে সোমবার

আপডেট: জুলাই ১৬, ২০১৭, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড বাংলাদেশি জঙ্গি আব্দুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ ওরফে জয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কলকাতা পুলিশের একটি দল। এরপর শনিবার দিনব্যাপী পুলিশ সদর দফতরে তারা বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জঙ্গি বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান করেছেন। একই বিষয়ে আলোচনা করতে আগামী সোমবার ঢাকায় আসছে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআই)।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্তঃদেশীয় জঙ্গিবাদের বিষয়ে কলকাতার পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। ভারতের যেসব জঙ্গি আমাদের দেশের জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত বা বাংলাদেশের যেসব জঙ্গি ভারতে তৎপর, তাদের বিষয়ে আমরা তথ্য আদান-প্রদান করার বিষয়ে আলোচনা কর হয়েছে। এছাড়া জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কৌশলগত কিছু বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’
পুলিশ জানায়, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল আব্দুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ ওরফে জয়। ২০০২ সালে পাবনা জেলা স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে সে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিল। জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার পরপরই সোহেল মাহফুজ বোমা ও গ্রেনেড তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়। ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারির হামলার অস্ত্রের সরবরাহকারী সে। গত ৮ জুলাই ভোররাতে চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার পুস্কনিপাড় এলাকার একটি আমবাগানের টং ঘর থেকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয় তাকে। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি), পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি শাখা, বগুড়া ও চাপাইনবাবগঞ্জ থানা পুলিশ যৌথভাবে এই অভিযান চালায়।
সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সোহেল মাহফুজ বাংলাদেশে অবস্থানকালে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিলেও আগে কখনও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েনি। সে খুব বেশি মুভ করতো না। তাই তাকে শনাক্ত করা সহজ ছিল, বোমা বানাতে গিয়ে তার একটি হাত উড়ে গেছে। এ কারণে সে আস্তানায়ই থাকতো। নব্য জেএমবির কেন্দ্রীয় নেতারা তার আস্তানায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে আসতো।’
পুলিশ জানায়, ২০০২ সালে এক চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে জেএমবিতে যোগ দেয়। পড়াশোনা বাদ দিয়ে সে চলে যায় রাজশাহী। সেখানে সে বেশ কয়েক বছর জেএমবির শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের সঙ্গে থাকে। ২০০৪ বা ২০০৫ সালে বাংলা ভাইয়ের হয়ে এক আস্তানায় বোমা বানাতে গিয়ে ডান হাত উড়ে যায় তার। মাহফুজ গ্রেফতার হওয়ার খবর প্রকাশ হওয়ার পরপরই ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় তদন্ত সংস্থা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কারণ সোহেল মাহফুজ ২০০৬ সালে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সে জেএমবির ভারতীয় শাখার আমির ছিল। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়া গড় বিস্ফোরণের পর ভারতীয় সরকার সোহেল মাহফুজকে ধরতে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করে। ওই মামলায় মাহফুজ এজাহারভুক্ত আসামি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সে ফের বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর সে পুরনো জেএমবি ছেড়ে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়।
পুলিশ সদর দফতরের গোপনীয় শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কলকাতা পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সোহেলের বিষয়ে আরও কিছু নতুন তথ্য পেয়েছি। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। খাগড়ায় বিস্ফোরণ মামলায় সে এজাহার নামীয় আসামি। এছাড়া ভারতের আরও কয়েকটি হামলায় তাকে সন্দেহজনক মনে করা হচ্ছে। সে সব মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানো হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘শনিবার কলকাতার পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। রবিবার আবার জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এরপর সোমবার এনআই আসবে বাংলাদেশে। তারাও সোহেল মাহফুজ ও সামগ্রিক জঙ্গিবাদ নিয়েই আলোচনা করবে। তথ্য আদান-প্রদান করবে।’
সিটিটিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও ভারতীয় পুলিশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। গুলশান হলি আর্টিজান ও ভারত থেকে আসা অস্ত্রের চালান নিয়েও তাদের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তারা জানান, একেবারে অল্প বয়সেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘ দিন ধরে আত্মগোপনে থাকা এই শীর্ষ জঙ্গি।
বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) মো. মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কলাকাতা পুলিশের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছে। তারা সোহেল মাহফুজকে প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এরপর দুপুর ১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত পুলিশ সদর দফতে আমার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বৈঠকে জঙ্গিবাদ নিয়েই আলোচনা হয়েছে। আমরাও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের কাছে সুযোগ চেয়েছি। তারাও আমাদের দেশে আটক-গ্রেফতার জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে একমত হয়েছেন। আমরা যেসব তথ্য আন্তঃদেশীয় জঙ্গিবাদের বিষয়ে পাচ্ছি, সেগুলো ভারতের পুলিশকে দেব, তারা যা পাবেন, তা আমাদের দেবেন। তাদের অংশটা তারা তদন্ত করবেন, আমাদের অংশটা আমরা করব।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তাদের কাছ থেকে সোহেল মাহফুজের বিষয়ে নতুন কিছু তথ্য পেয়েছি। কিছু নাম পেয়েছি। সেগুলো আমরা এখন চেক করব। তাদেরও আমরা কিছু তথ্য দিয়েছি, সেগুলো তারা চেক করবেন।’
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন